ভোজনরসিক ও মস্তিষ্ক : পুষ্টিকর খাবারই কি সুস্থ মস্তিষ্কের চাবিকাঠি?

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
495 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

~ কলমে এলেবেলে দিশানী ~

——————————————–

দুপুরে লাঞ্চে আবার সেই ঘাসপাতা আর সেদ্ধ সবজিগুলো খেতে হবে ভেবেই কান্না চলে এলো আমার। কোথায় বিরিয়ানি, পাঁঠার মাংস, মাছের কালিয়া এসব খাবো, তা না ডায়েট ফলো করতে হবে। এই সবে মাত্র দু’ সপ্তাহ হলো, এখনো যে কতদিন এসব খেতে হবে কে জানে!

কি ভাবছেন? আপনাদের সাথেও মাঝে মাঝে একই ঘটনা ঘটে তাই না? স্পাইসি, ফাস্টফুডের গন্ধে মন উতাল আর ওদিকে ফিটনেস মেন্টেন করতে সেটাও খাওয়া যাবে না।

ইউ আর হোয়াট ইউ ইট

 

তো সে কথা বাদই দিলাম। আমাদের রোজকার খাদ্যাভাস কিভাবে আমাদের দেহের ওপর প্রভাব ফেলে তা তো মোটামুটি সকলেরই জানা। কিন্তু তা আমাদের মস্তিষ্ক, স্মৃতিশক্তি এসবের উপর কিভাবে প্রভাব ফেলে তা নিয়ে আজ আলোচনা করা যাক।

এক কথায় বলতে যা দাঁড়ায় তা হল “ইউ আর হোয়াট ইউ ইট” মানে আমরা রোজ যা খাবার খাই, তার উপরই নির্ভর করে আমাদের স্নায়ুকোষ বা নিউরনের (মস্তিষ্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কোষ) প্রকৃতি।

স্নায়ুকোষেরও আবার একটু অবলম্বনের দরকার হয়

 

মস্তিষ্ক হলো আমাদের অন্যতম জটিল অঙ্গ। শরীরের বাকি সমস্ত অঙ্গের সাথে এমনকি পেশীর সাথেও ইনিই যোগাযোগ স্থাপন করেন তার লক্ষ লক্ষ টেলিফোন অর্থাৎ স্নায়ুকোষের সাহায্যে। যেমন ধরুন, আপনি আপনার হাত নাড়াতে চাইছেন। সেই সংকেত সোজা চলে যাবে আপনার মস্তিষ্কে। সাথে সাথে মস্তিষ্কও হাতের পেশীকে সংকোচন প্রসারণের আদেশ পাঠিয়ে দেবে আর আপনি অনায়াসে হাতটা নাড়াতে পারবেন। তা এই স্নায়ুকোষেরও আবার একটু অবলম্বনের দরকার হয়। তাই এরা মস্তিষ্কের আর একধরনের কোষ, “গ্লিয়াল কোষ” এর সাথে সংযোগ স্থাপন করে। এই গ্লিয়াল কোষ আবার দু’রকমের হয় মাইক্রোগ্লিয়া এবং অ্যাস্ট্রোসাইট। মাইক্রোগ্লিয়া হলো মস্তিষ্কের অন্যতম প্রধান অনাক্রম্য কোষ। যে কোনো সংক্রমণ থেকে মস্তিষ্ককে রক্ষা করাই এর প্রধান কাজ। ওদিকে অ্যাস্ট্রোসাইট স্নায়ুকোষের দেখভাল করে, পুষ্টি যোগান দিয়ে তাদের সুস্থ সবল রাখে, এটিই তার মূল কাজ।

 

তা মস্তিষ্ক কিভাবে আমাদের পরিচালনা করে?

 

তা মস্তিষ্ক কিভাবে আমাদের পরিচালনা করে? মানে শারীরিকভাবে তা তো আমরা দেখতেই পাই। কিন্তু অদৃশ্য হয়েও মস্তিষ্ক আমাদের জ্ঞানীয় পরিচালনা করে। আচ্ছা বুঝিয়ে বলি। হাত, পা নাড়া, দৌড়ানো, তাকানো, লাফানো যাবতীয় কার্য আমরা সরাসরি উপলব্ধি করতে পারি। কিন্তু আমাদের চিন্তা ভাবনা, শেখার ক্ষমতা, স্মৃতিশক্তি, কল্পনা, মনোযোগ সবকিছুই মস্তিষ্ক পরিচালনা করে। তাই আমরা যদি সঠিক খাদ্যাভ্যাস না করি তা স্নায়ুকোষকেও অপুষ্ট করে তোলে। ফলস্বরূপ, আমাদের জ্ঞান সম্বন্ধীয় কার্যক্ষমতা (Cognitive functions) ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

কিভাবে পুষ্টিকর খাদ্যাভাস মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতাকে উন্নত করে তোলে?

 

এবার নিশ্চই সবাই এটা ভাবছে, যে কিভাবে পুষ্টিকর খাদ্যাভাস মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতাকে উন্নত করে তোলে? পুষ্টিকর খাদ্য মস্তিষ্কে নতুন স্নায়ুকোষ গঠনকে ত্বরান্বিত করে, যাকে বলে নিউরোজেনেসিস। সাথে সাথে সাইন্যাপটিক প্লাস্টিসিটিকেও বাড়িয়ে দেয়। সাইন্যাপটিক প্লাস্টিসিটি হলো নিউরনের সাথে নিউরনের যোগাযোগ অর্থাৎ তারা যতোবেশি নিউরন একে অপরের সাথে যুক্ত থাকবে ততবেশি তারা যোগাযোগ স্থাপন করতে পারবে এবং তত তাড়াতাড়ি আমরা কোন নতুন জিনিস শিখতে পারবো, স্মৃতিশক্তি উন্নত হবে এবং সাথে সাথে সুন্দরভাবে ভাবনা চিন্তাও করতে পারব।

 

এই প্রোটিন এর মধ্যে একটি হলো Brain-derived neurotrophic factor (BDNF)

এবার আসি হিপোক্যাম্পাসের কথায়। এটিও মস্তিষ্কের অন্যতম একটি অংশ যা মূলত আমাদের স্মৃতিশক্তি ধারণ এবং নিউরোজেনেসিসের দায়িত্বে থাকে। এই হিপোক্যাম্পসের মধ্যে থাকা স্নায়ুকোষ সহ অন্যান্য স্নায়ুকোষ বেশ কিছু প্রোটিন পদার্থ তৈরি করে যা আমাদের যাবতীয় বার্তা আদান প্রদানের কাজ করে। এই প্রোটিন এর মধ্যে একটি হলো Brain-derived neurotrophic factor (BDNF) যা স্নায়ুকোষের মৃত্যুকে প্রতিহত করে, স্নায়ুকোষের উৎপাদন (নিউরোজেনেসিস) কে ত্বরান্বিত করে এবং আমাদের জ্ঞানীয় কার্যকলাপকে উন্নত করে তোলে। পুষ্টিকর খাদ্যাভাস BDNF এর মাত্রাকে বাড়িয়ে দেয় এবং হিপোক্যাম্পাস এর মধ্যে নিউরোজেনেসিসে সাহায্য করে, যা মানসিক দিক থেকেও আমাদের সুস্থ রাখে। কিন্তু বেশি ফ্যাট ও মিষ্টি জাতীয় খাবার খেলে স্নায়ুকোষের প্রদাহ হয় এবং সাথে সাথে নিউরোজেনেসিস প্রক্রিয়া বাধাপ্রাপ্ত হয়, যা আমাদেরকে অবসাদের দিকেও ঠেলে দিতে পারে।

আমরা কি অন্ত্র-মস্তিষ্ক সম্পর্কের (Gut-brain axis) কথা জানি?

 

এবার আসি, এই অপুষ্টিকর খাবার কি করে?

আমরা কি অন্ত্র-মস্তিষ্ক সম্পর্কের (Gut-brain axis) কথা জানি? সংক্ষেপে বলি তবে, এই অন্ত্র ও মস্তিষ্ক পরস্পরের সাথে স্নায়ুর মাধ্যমে সম্পর্কিত। আমরা যা খাবার খায় তার সংকেত অন্ত্রে থাকা বিভিন্ন নিউরন দ্বারা মস্তিষ্কে পৌঁছায়। এই যোগাযোগকে বলা হয় Gut-brain axis।

অপুষ্টিকর খাবার আমাদের দেহে অতিরিক্ত স্ট্রেস হরমোনের মাত্রাকে বাড়িয়ে দেয়, যা মস্তিষ্কের মাইক্রোগ্লিয়া ও অ্যাস্ট্রোসাইট কোষকে অতি সক্রিয় করে দেয়। ফলস্বরূপ হিপোক্যাম্পাস সহ মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশে প্রদাহ শুরু হয়, যা পরোক্ষভাবে আমাদের জ্ঞান সম্বন্ধীয় কার্যকলাপকে ব্যাহত করে আমাদেরকে অবসাদগ্রস্থ করে তোলে।

 

ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড যুক্ত খাবার অ্যালঝাইমারস, ডিপ্রেশন এইসব রোগকেও প্রতিহত করে

এবার প্রশ্ন হল, তাহলে ব্রেনকে সুস্থ রাখতে আমাদের কি খাওয়া উচিত?

গবেষণায় দেখা গেছে, ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড যুক্ত খাবার মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতাকে অব্যাহত রাখতে পারে। ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড আমাদের দেহের একটি অত্যাবশ্যক নিউট্রিয়েন্ট। কিন্তু তা আমাদের দেহে নিজে থেকে সংশ্লেষিত হতে না পারায়, “বাইরে থেকে খাবারের মাধ্যমে” তা দেহে প্রবেশ করানো হয়।

আলফা লিনোলেনিক অ্যাসিড (এক প্রকার ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড) যা উদ্ভিদের (যেমন- আখরোট) মধ্যে বেশি পাওয়া যায়। ইকোসাপেন্টানোইক অ্যাসিড, ডোকোসাহেক্সানোইক অ্যাসিড (DHA) পাওয়া যায় বিভিন্ন মাছের তেলে।

ইঁদুরের মস্তিষ্কে পরীক্ষা করে জানা গেছে যে, DHA নিউরোজেনেসিস বৃদ্ধি করে, মস্তিষ্কের প্রদাহ কমায়। এমনকি অন্তঃসত্ত্বা মহিলাদের গর্ভে থাকা ভ্রূণের মস্তিষ্কেও নিউরনের বিকাশে ও বাচ্চাদের স্মৃতিশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। এই ধরনের ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ খাবার অ্যালঝাইমারস, ডিপ্রেশন এইসব রোগকেও প্রতিহত করে।

 ট্রান্স ফ্যাট জাতীয় খাবার মস্তিষ্কের পক্ষে ক্ষতিকারক

মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখতে কি কি খাবার এড়িয়ে যাওয়া উচিত?

অতিরিক্ত মিষ্টি জাতীয় খাবার (যেমন- কৃত্রিম মিষ্টিকারক, সোডা) সহ বিভিন্ন ট্রান্স ফ্যাট জাতীয় খাবার মস্তিষ্কের পক্ষে ক্ষতিকারক। অতিরিক্ত ফ্যাট জাতীয় খাবার মস্তিষ্কে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস প্রক্রিয়াকে বাড়িয়ে দেয়। যার ফলে স্নায়ু কোষের মধ্যে থাকা বিভিন্ন কোষঅঙ্গানু নষ্ট হতে শুরু করে। এছাড়াও গবেষণায় দেখা গেছে, ফ্যাট জাতীয় খাবার মস্তিষ্কের মাইক্রোগ্লিয়া কোষকে অতি সক্রিয় করে তুলে হিপোক্যাম্পাস ও হাইপোথ্যালামাসে প্রদাহ সৃষ্টি করে। আর এই হাইপোথ্যালামাস আমাদের দেহের ওজন নিয়ন্ত্রণ করে। অনেকসময় দেখা যায়, এই প্রদাহের কারণে ফাস্টফুড বা ভাজাভুজি খাবারের প্রতি মানুষটির আখাঙ্খা আরও বেড়ে যায়। ট্রান্স ফ্যাট জাতীয় খাবার BDNF এর মাত্রাকে কমিয়ে দিয়ে মস্তিষ্কের ক্ষতিসাধন করে।

 

তাহলে বোঝা গেলো তো, ফাস্টফুড, ভাজাভুজি খাবার, বিরিয়ানী, কোপ্তা এসব দেখলে জিভে জল তো আসবেই। কিন্তু একটু রয়ে সয়ে খেতে হবে আমাদের, কারণ ওই যে তুমি তাই, যা তুমি খাও- “ইউ আর হোয়াট ইউ ইট”।

 

তথ্যসূত্রঃ

  • Zainuddin, M. S., and Thuret, S. 2012. Nutrition, adult hippocampal neurogenesis and mental health. Br. Med. Bull. 103:89–114. doi: 10.1093/bmb/lds021
  • Spencer, S. J., Korosi, A., Layé, S., Shukitt-Hale, B., and Barrientos, R. M. 2017. Food for thought: how nutrition impacts cognition and emotion. NPJ Sci. Food 1:7. doi: 10.1038/s41538-017-0008-y
  • Tan, B. L., and Norhaizan, M. E. 2019. Effect of high-fat diets on oxidative stress, cellular inflammatory response and cognitive function. Nutrients 11:2579. doi: 10.3390/nu11112579

 

————————————–

 

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।