গুপ্ত বার্তা – পর্ব ১

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
504 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

~ কলমে এলেবেলে প্রত্যয় ~

—————————————————–

এনিগমা – নামটা সকলের খুব চেনা; অ্যালান টুরিং, ব্লেচলি পার্ক। একটা জটিল যন্ত্র; ব্যবহার গুপ্ত বার্তা বানানো, দ্বিতীয় বিশ্বয়ুদ্ধে ব্যবহার হয়। যাঁরা এই মুহূর্তে চিন্তিত হয়ে পড়লেন যে আমি বোধ হয় জটিল যন্ত্রের কর্মপদ্ধতি আলোচনা করবো, তাঁদের আগেই আশ্বস্ত করে দিই— না, আমি মোটেই তা করবো না। আমার আগ্রহ কেবল গুপ্ত বার্তায় এবং আমি যা আলোচনা করবো তা ঐ যন্ত্রের থেকে অনেক জটিল।

প্রথমত, গুপ্ত বার্তা ব্যাপারটা এই পৃথিবীতে প্রায় ৪০০০ বছরের পুরনো— সম্ভবত ইজিপ্টে শুরু। ইলিয়ডেও গুপ্ত বার্তার কথা লেখা আছে। এমনকি আমাদের কামসূত্রেও এক ধরনের গুপ্ত বার্তার খোঁজ মেলে। কারণটা আজকেও যা সেদিনও তাই ছিল, মূলত য়ুদ্ধ আর প্রেম সংক্রান্ত। গুপ্ত বার্তা মূলত দুই রকমের হয়ে থাকে। এক, এমন বার্তা যা কোথাও একটা লোকানো আছে। কোথায় লোকানো আছে সেটা না জানলে পড়া যাবে না। তবে সেটা জেনে গেলেই পড়তে আর কোন অসুবিধে থাকে না। ইলিয়ডে এধরনের গুপ্ত বার্তার কথাই আছে। আর দুই, এমন বার্তা যেটা পেয়ে গেলেও পড়া যাবে না। তার জন্যে একটা নির্দিষ্ট ‘চাবি’ লাগবে, সেই চাবি ছাড়া কোন ভাবেই লেখা পড়া যাবে না। এনিগমা এমনই একটা চাবি লাগাবার যন্ত্র। য়ুদ্ধের ইতিহাসের একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হোল এই চাবি লাগানো, আর চাবি খোলার ইতিহাস। একদল চাবি লাগায়, আরেকদল চাবি খোলে। যেমন, অ্যালান টুরিং, ব্লেচলি পার্ক। পরের দল আরও কঠিন চাবি লাগায়। আমাদের আজকের কথা এই নিয়েই।

বেশি পেছনে না গিয়ে প্রায় ৫০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দের স্পারটায় শুরু করা যাক। সেখানে গুপ্ত বার্তা বানানোর জন্যে খুব সোজা একটা রাস্তা নেওয়া হত বলে মনে করা হয়। একটা বেলনাকার দণ্ডের গায়ে একটা চামড়ার ফিতে জড়িয়ে তার ওপর আসল বার্তা লেখা হত। তার পর ফিতে খুলে দিলেই সেই লেখা তালগোল পাকিয়ে যেত। এর উদাহরণ দেখতে ছবিতে নজর দিন।

আমার মূল বার্তা— ELEBELE IS THE BEST। ফিতে বেলনে জড়িয়ে লিখে দিয়ে ফিতে খুলে দিলেই তা হয়ে গেলো— EESBLLTEEEEHSBIET, জট পাকানো বার্তা। এখানে ‘চাবি’ হোল হোল ঐ বেলনটা, অর্থাৎ তার ব্যাসার্ধ। যিনি বার্তা পড়বেন তাঁকে সেই ব্যাসার্ধটা জানতে হবে। সেটা জানলেই বার্তার জট ছেড়ে যাবে। বলাই বাহুল্য যে এমনভাবে বানানো গুপ্ত বার্তা এমন দুর্লঙ্ঘ্য কিছু নয়, কয়েকবার চেষ্টা করলেই পড়ে ফেলা যায়। যদিও এই উদাহরণটা দেওয়ার কারণ হোল এতে একটা গুপ্ত বার্তার সবকটি দিক বিদ্যমান— মূল বার্তা, জট পাকানো বার্তা, চাবি, এবং জট খোলার পরের বার্তা (মূল বার্তা এবং জট খোলার পরের বার্তা এক হওয়া অবশ্য কাম্য)।

এর পরেই যে জট পাকানোর পদ্ধতি বলতেই হয় সেটার সাথে জুলিয়াস সিজারের নাম যুক্ত। সিজার এধরনের গুপ্ত বার্তা ব্যবহার করতেন বলে মনে করা হয়। পদ্ধতিটি এরকম: প্রতিটি অক্ষরকে আরেকটি অক্ষর দিয়ে প্রতিস্থাপন করা। A হোল B, B হোল C, C হোল D, D হোল E, ইত্যাদি। আমি যদি বলতে চাই PLEASE LIKE AND SHARE, তাহলে জট পাকিয়ে তা দাঁড়াবে QMFBTF MJLF BOE TIBSF। এটা সরলতম উদাহরণ। এটাকে অনেক কঠিন করে তোলা যায়। হয়তো A হোল R, B হোল L, C হোল Z, D হোল A, ইত্যাদি। এই পদ্ধতিরই আরও একটা সুকৌশল ব্যবহার হত এনিগমা মেশিনে। সেখানে প্রথমবার A যদি R হয়, পরের বারেই A হয়তো হোল K, তবে সেটা এখন আলোচনা করবো না, আগেরটাতেই ফিরে যাই, যেখানে A হোল R, B হোল L, C হোল Z, D হোল A, ইত্যাদি, এবং সেটা পরিবর্তন হয় না। এক্ষেত্রে বুঝতেই পারছেন যে বার্তার চাবি ভাঙ্গা অতি দুষ্কর। কোন অক্ষর কি হয়েছে সেটা না জানলে পড়া যাবে না।

Nandhp, Public domain, via Wikimedia Commons

সত্যি কি তাই? না, মোটেই তা নয়। আরবরা এই চাবি ভাঙ্গার পদ্ধতি বহু আগে বের করেছে। ইংরিজি ভাষায় প্রত্যেক অক্ষরের ব্যবহারের সংখ্যার একটা বিন্যাস আছে। যেমন সব থেকে বেশি ব্যবহার হয় E, তারপর T, A, O; সব থেকে কম ব্যবহার হয়, Q আর Z। এরকম একটা বিন্যাস সব ভাষার ক্ষেত্রেই আছে। আর সেটা ব্যবহার করেই চাবি ভাঙ্গা যায়। যেমন QMFBTF MJLF BOE TIBSF, সবথেকে বেশি আছে F আছে তিনবার, B আছে তিনবার। অতএব, এই দুটোর E, T, বা A, হবার সম্ভবনা সব থেকে বেশি, আর বাস্তবটাও তাই। F হোল আসলে E, B হোল আসলে A। আমার বার্তা যত বড় হবে, এই পদ্ধতিতে তত সহজে তার জট ছাড়ানো যাবে। এই পদ্ধতিতে জট ছাড়ানো সম্ভব হলেও আজও এই পদ্ধতির বিপুল ব্যবহার হয়, তবে একটু অন্যভাবে। এখন প্রত্যেকটা অক্ষরকে একটা সংখ্যায় রূপান্তরিত করে দেওয়া হয়। খুব সহজে বোঝাবার জন্যে ধরে নিলাম, সেটা এরকম – A হোল 1, B হোল 2, C হোল 3, D হোল 4,…, Z হোল 26। আমার বার্তা ধরে নিলাম LIKE, ছোট নিলাম যাতে বোঝাতে সুবিধে হয়। এই ভাবে আমার বার্তা দাঁড়ালো 12 9 11 5। এটাও একধরনের জট পাকানো। তবে আমরা এটাকে জট বলে ধরছি না। নিতান্তই নিম্নমানের জট। বার্তাকে সংখ্যায় লেখার মূল কারণ হোল আমাদের পরের আলোচনার জটটা পাকাবে অঙ্ক। আর তার জন্যেই অক্ষরের বদলে আমাদের সংখ্যা লাগবে।

 

সেখানে যাবার আগে আমাদের একটা ছোট জিনিস জানতে হবে; তা হোল যে বার্তা পাঠাবে সে যে চাবি দিয়ে জট পাকাবে, আর যার জন্যে বার্তা পাঠানো তাকেও সেই একই চাবি দিয়ে বার্তা খুলতে হবে। কিন্তু সেই চাবিটা দেওয়া নেওয়াটা হবে কেমন করে? সাধারণ বুদ্ধিতে বলে নিশ্চয়ই খুব গোপনে হবে। হ্যাঁ, সেভাবেই চলতো। কিন্তু তাতে খানিক অসুবিধে আছে। যেমন কেউ হয়তো জুলিয়াস সিজারকে উত্তাল কেলিয়ে তার থেকে চাবিটা জেনে নিল, বা অন্য কোন ভাবে সেই চাবি অন্য কারুর হাতে পড়ে গেলো; চারিদিকে তো স্পাই ঘুরে বেড়াচ্ছে। এটারও সমাধান করবে অঙ্ক।

যেটা নিয়ে এবার আলোচনা করবো সেটার পোশাকি নাম Rivest–Shamir–Adleman (RSA) রীতি। ধরা যাক, অম্লান, বন্যাকে এলেবেলে LIKE করতে বলছে। মাঝে রয়েছে এলা, সে জানতে চায় অম্লান বন্যাকে কি বলছে। ত্রিকোণ প্রেমে অমন হয়েই থাকে। বন্যা সবার আগে যেটা করল সেটা হোল গোটা দুনিয়ার কাছে বলে দিল যে আমাদের কথা বলার চাবি হোল— (5, 14)। সেটা অম্লানও জানে, এলাও জানে। কোন গোপনীয়তা নেই। এবার অম্লান তার বার্তা LIKE কে কিভাবে জট পাকাচ্ছে দেখি।

  • প্রথমে সে  LIKE কে সংখ্যায় লিখে বানালো 12 9 11 5।
  • এরপর তার প্রত্যেকটা সংখ্যাকে নিয়ে তার পঞ্চম ঘাত, অর্থাৎ টু দি পাওয়ার 5 বের করে, তাকে 14 দিয়ে ভাগ করে তার ভাগশেষ বের করলো। উদাহরণ দিয়ে দেখানো যাক। প্রথমে 12⁵=248832, সেই সংখ্যাকে 14 দিয়ে ভাগ করলে ভাগশেষ দাঁড়ায় 10।
  • এরকম ভাবে জট পাকানো বার্তা হোল 10 11 9 3।
  • সেটাকে আবার অক্ষরে বানালে দাঁড়ায় JKIC।
  • অম্লান পাঠিয়ে দিল তার বার্তা।

মজার ব্যাপারটা লক্ষ্য করুন এবার। এই ভাগশেষগুলো লেখার কারণে কিন্তু (5, 14) জানার পরেও খুব সহজে আপনি আর চাবি খুলতে পারবেন না।

কিন্তু, তারপরেও বন্যাকে সেটা খুলতে হবে। বন্যার কাছে একটা লুকোনো চাবি আছে, সেটা আর পৃথিবীর কেউ জানে না, এমনকি অম্লানও জানে না। সেই চাবি একবার লাগালেই বার্তার সব জট ছাড়িয়ে যাবে। সেই চাবিটা হোল 11। বন্যা কি করবে দেখা যাক।

  • বন্যা প্রথমেই JKIC কে সংখ্যায় লিখে বানালো 10 11 9 3।
  • এবার সে একদম অম্লান যা করেছিল তাই করবে, শুধু পঞ্চম ঘাত না নিয়ে একাদশ ঘাত নেবে, টু দি পাওয়ার 11।
    • 10¹¹  কে 14 দিয়ে ভাগ করলে ভাগশেষ হয় 12।
    • 11¹¹  কে 14 দিয়ে ভাগ করলে ভাগশেষ হয় 9।
    • 9¹¹  কে 14 দিয়ে ভাগ করলে ভাগশেষ হয় 11।
    • 3¹¹  কে 14 দিয়ে ভাগ করলে ভাগশেষ হয় 5।
  •  অতএব জট ছাড়ানো বার্তা হোল 12 9 11 5, অর্থাৎ LIKE।

পুরো ব্যাপারটা কি ম্যাজিকের মত লাগলো? মোটেই নয়, পুরো অঙ্ক। বন্যা এক মুহূর্ত দেরী না করে এলেবেলে LIKE করে দিল। আপনিও করে ফেলুন, আমি পরের পর্ব লিখতে যাচ্ছি।

One thought on “গুপ্ত বার্তা – পর্ব ১

  • October 7, 2021 at 4:33 pm
    Permalink

    আজকেই প্রথম, সত্যি কথা বলতে কি…স্তম্ভিত
    একটু কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা কাটিয়ে কয়েকদিন পরে আসছি…তার মাঝে শারদীয়টা পড়ে নেব…

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।