গুপ্ত বার্তা – পর্ব ২

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
523 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

~ কলমে এলেবেলে প্রত্যয় ~ 

—————————————————– 

পর্ব ১ না পড়ে ভুলেও পর্ব ২-এর দিকে পা বাড়াবেন না। ভুলে গিয়ে থাকলে একবার ঝালিয়ে আসুন।  

5, 14, আর 11-এর ভেতর এমন কিছু একটা সম্পর্ক আছে যেটা এর জন্যে দায়ী। 

প্রথমেই দেখা যাক 14 কে। বন্যার এমন সংখ্যা নেওয়ার কারণ কি? 14 নেওয়ার আসল কারণ হোল ওটা দুটো মৌলিক সংখ্যার গুণফল, 2 আর 7। চাইলে সে যে কোন মৌলিক সংখ্যা নিতে পারতো, আমাদের অঙ্ক কষার সুবিধার জন্যে ছোট দেখে দুটো নিয়েছে। 

এর পর বন্যা যেটা বের করেছে সেটা হোল 14 সংখ্যাটার পরস্পর মৌলিক সংখ্যা কটা আছে। পরস্পর মৌলিক সংখ্যা হোল এমন দুটো সংখ্যা যাদের গসাগু 1, অর্থাৎ তাদের দুজনের 1 বাদে কোন সাধারণ গুণিতক নাই। 14র এমন আছে 6 টি – 1, 3, 5, 9, 11, 13। এটা 6 সংখ্যাটা যে সবসময় খুঁজে বের করতে হয় তা নয়, অয়েলার এসম্পর্কে অনেক আগেই কাজ করে গেছেন। উনি বের করেছেন যে এই সংখ্যাটা এক্ষেত্রে (2 – 1)ᳵ(7- 1) = 6, প্রয়োজনে 2 আর 7 এর জায়গায় যেকোন মৌলিক সংখ্যা বসানো যায়। 

এবার আসি বন্যা 5 কিভাবে নিলো তাতে। বন্যাকে একটা সংখ্যা নিতে হত, যা 6এর থেকে ছোট, এবং যা 14 এবং 6 দুজনের সাথেই পরস্পর মৌলিক। এমন সংখ্যা একটাই আছে, 5। ব্যাস, অম্লানের চাবি তৈরি।

এবার তার নিজের গোপন চাবি 11 তে আশা যাক। তার এমন একটা সংখ্যা লাগবে যাকে 5 দিয়ে গুন করে 6 দিয়ে ভাগ করলে 1 ভাগশেষ থাকবে। 11 ᳵ 5 = 55, তাকে 6 দিয়ে ভাগ করলে ভাগ করলে ভাগশেষ থাকে 1।

গাণিতিক প্রমাণ করে আমি লেখা ভারাক্রান্ত করলাম না। তবে একজনের কথা এখানে না বললেই নয়, ফার্মাট। ইনি ১৬৪০ সালে একটি সূত্র দেন, লোকে বলে ফার্মাটের ছোট্ট সূত্র। তার বক্তব্য এরকম, যে একটা যেকোনো সংখ্যা নিলাম a, আর একটা মৌলিক সংখ্যা নিলাম p, তাহলে aᵖ-p p দ্বারা বিভাজ্য। এই সূত্রের এহেন নামকরণের পেছনে বোধহয় একটা উপহাস কাজ করেছিল, লোকে হয়তো ভেবেছিল— বাঃ কি দুষ্টুমিষ্টি কিউট একটা সূত্র, কিন্তু কি বা এমন কাজে লাগবে। ওপরের অঙ্ক যা করলাম তার প্রমাণে এই সূত্র কিন্তু অপরিহার্য।   

এবার একবার এলার দৃষ্টিতে ব্যাপারটা ভাবা যাক। সে জানে অম্লানের চাবি (5, 14)। 14 কে মৌলিক উৎপাদকে বিশ্লেষণ করে বাকি ঠিক ঠাক অঙ্ক কষলে সেও কিন্তু 11 পাবে। কিন্তু, এই মৌলিক উৎপাদকে বিশ্লেষণটাই এই পদ্ধতির আসল মজা। বন্যা 14 (= 2 ᳵ 7) তো আমাদের যাতে অঙ্ক বুঝতে সুবিধে হয় তাই নিয়েছিল। কিন্তু, আসল দিনে সে হয়তো নিলো 41758540882408627201 বা 2888303761845069063000379588962127011009742352924147711999999। হ্যাঁ, এগুলোও দুটো মৌলিক সংখ্যার গুণফল। আপনি এলা হলে কিভাবে মৌলিক সংখ্যা গুলো বের করতেন? ঐ ২ দিয়ে, ৩ দিয়ে, ৫ দিয়ে, ৭ দিয়ে ভাগ যায় কিনা দেখতেন? এলার সমস্যাটা আশা করছি আপনি বুঝে গেছেন।

একদল পাঠক এতক্ষণে বুঝে গেছেন যে এ কাজ করতে কম্পিউটার ব্যবহার করাই ভালো। প্রথম সংখ্যাটা মৌলিক উৎপাদকে বিশ্লেষণ করতে আমার কম্পিউটারে লেগেছে প্রায় ত্রিশ সেকেন্ড। দ্বিতীয়টা করার ধৃষ্টতা আমি করিনি, আমার হিসেব বলছে ওটা করতে একটা কাম্পিউটারের প্রায় 3 ᳵ 10¹⁴ বছর সময় লাগবে। অথচ, যে সংখ্যাগুলো গুণ করে ওটা আমরা পেয়েছি সেগুলো জানা থাকলেই জানা গুপ্ত বার্তা পাঠানো আর তা খুলে পড়াতে কোন অসুবিধেই থাকে না। অনেকে হয়তো প্রশ্ন করবেন কম্পিউটারে এই যে টু দি পাওয়ার করছি সেগুলো করতে সময় লাগবে নিশ্চয়ই। হ্যাঁ, লাগবে। কিন্তু, তা নগণ্য। মাথায় রাখবেন দুটো সংখ্যার গুন করা কিন্তু সোজা, কঠিনটা হোল মৌলিক উৎপাদকে বিশ্লেষণ করা।   

ঠিক এই পদ্ধতিতেই আজকের সমস্ত গুপ্ত বার্তা, পাসওয়ার্ড সব আদান প্রদান হয়। এই যে আপনি ফেসবুক খোলার সময় পাসওয়ার্ড দেন, আপনি জানেন না কিন্তু আপনার কম্পিউটার জানে আপনার চাবি বা সংখ্যাটা কি? সে আপনার পাসওয়ার্ড পড়ে তাকে জট পাকিয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছে ফেসবুকের দপ্তরে, সেখানে আরেকটা কাম্পিউটার সেই জট খুলছে, মিলিয়ে দেখছে আপানর পাসওয়ার্ড, তবেই আপনি ঢুকতে পারছেন। কোন দুষ্টু লোক যদি আপনার জট পাকানো পাসওয়ার্ড পেয়েও যায়, ঐ মৌলিক উৎপাদকে বিশ্লেষণ করতেই তার জীবন পার হয়ে যাবে। ব্যাঙ্কেও ঠিক একই জিনিস করা হয়। অতএব, ফার্মাটের ছোট্ট সূত্র যে মোটেও ছোট্ট নয় সেটা নিশ্চয়ই টের পাচ্ছেন।    

তবে এবার নিশ্চিন্ত হওয়া গেলো। তাই তো? এতো সময় লেগে যাবে পাসওয়ার্ড ভাঙতে। 

বেশি নিশ্চিন্ত হবার কোন দরকার নেই। আগের পর্বে বলেছিলাম “য়ুদ্ধের ইতিহাসের একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হোল এই চাবি লাগানো, আর চাবি খোলার ইতিহাস। একদল চাবি লাগায়, আরেকদল চাবি খোলে।” এমন চাবি খোলার লোকও আছে। নাম তার কোয়ান্টাম কম্পিউটার। আর সেখানেও আছে আরেক অঙ্কের খেলা। তবে সেটা আমি এখন আর বলবো না। আর কোয়ান্টাম কম্পিউটারের সাথে লড়াই জিততে আছে কোয়ান্টাম চাবি। আর, সে নিয়ে তো আমাদের এখানে আগেই লেখা হয়েছে। পড়ে নিন।   

One thought on “গুপ্ত বার্তা – পর্ব ২

  • October 4, 2021 at 2:15 pm
    Permalink

    প্রথম পর্বটা অনেক দিন আগে পড়েছিলাম বলে আবার পড়লাম তারপর দ্বিতীয় পর্ব পড়লাম। সম্পুর্ণ একটা অন্য ধরনের লেখা ভীষণ ভালো লাগলো 👍🏻👍🏻

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।