নোবেল প্রাইজ ২০২১: শারীরবিদ্যা ও ঔষধ

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
175 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

~ কলমে এলেবেলে দিশানী ~

———————————-

পরিবেশ ও আমাদের অনুভূতির মাঝের মিসিং লিঙ্কঃ 

২০২১ সালে শারীরবিদ্যা ও ঔষধে নোবেল প্রাইজ জিতে নিয়েছেন ডেভিড জুলিয়াস ও আরডেম প্যাটাপুটিয়ান।

এখন প্রশ্ন হলো তাদের গবেষণার বিষয়বস্তু কি ছিল? খুব জানতে ইচ্ছে করছে তো? চলুন আলোচনা করা যাক।

এই যেমন শীতকালে ঠান্ডা লাগে আবার গরম কালে গরম, আবার বাতাস বইলে অনুভব করতে পারি, সুস্বাদু খাবারের গন্ধে আপনার জিভে জল চলে আসে, কেউ এসে সপাটে চড় মারলে বা খপাত করে আপনার হাতটা ধরলে, আপনি বুঝতে পারেন। কিন্তু ভেবে দেখেছেন আমরা কিভাবে আমাদের আশেপাশের পরিবেশকে অনুভব করি? আমাদের তাপমাত্রা, চাপ এসব অনুভূত করানোর জন্য কিভাবে স্নায়ুস্পন্দন কাজ করে? আজ্ঞে হ্যাঁ এটাই আজকের নোবেল প্রাপকদের গবেষণা।

ডেভিড জুলিয়াস দেখেন যে ক্যাপসাইসিন, যা কিনা লঙ্কার ঝালের জন্য দায়ী, ত্বকের মধ্যে থাকা স্নায়ুর তাপগ্রাহক কোষকে উদ্দীপিত করে জ্বালা অনুভূতির সৃষ্টি করে; দেখেছেন তো লঙ্কা খেয়ে ঝাল লাগলে কিরকম নাক কান গরম হয় যায়!

আর ওদিকে আরডেম প্যাটাপুটিয়ান কিছু চাপ সংবেদী কোষকে কাজে লাগিয়ে এমন কিছু সংগ্রাহক আবিষ্কার করেন যারা অভ্যন্তরীণ অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ও কোষের যান্ত্রিক উদ্দীপনায় সাড়া দেয়।

তবে স্নায়ু কোষের এতো কান্ড কারখানা নিয়ে গবেষণা কিন্তু আজ থেকে নয়, ১৯৪৪ সালে জোসেফ আরলানগার এবং হার্বার্ট গা দুজন বিজ্ঞানী বিভিন্ন প্রকারের সংগ্রাহক স্নায়ুকোষের ওপর গবেষণা করে নোবেল প্রাপক হয়েছিলেন।

ডেভিড জুলিয়াস ও আরডেম প্যাটাপুটিয়ান-এর মূল লক্ষ্য ছিল যে কিভাবে পরিবেশের উষ্ণতা ও বাহ্যিক উদ্দীপনা আমাদের স্নায়ুতন্ত্রে বৈদ্যুতিক স্পন্দনে পরিণত হয়!

ডেভিড জুলিয়াস তখন ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটিতে গবেষণারত। তিনি ভাবেন আমরা তো জানি যে ক্যাপসাইসিন বেদনাগ্রাহক স্নায়ুকোষকে উদ্দীপিত করে, কিন্তু কিভাবে করে… তা তখনও জটিল ধাঁধা।

জুলিয়াস ও তার সহকারীরা কয়েক লক্ষ বেদনা, তাপ ও স্পর্শ সংবেদী স্নায়ুকোষের মধ্যে থাকা অসংখ্য জিন নিয়ে পরীক্ষা করেন। তাদের মনে হয়েছিল যে কোনো না কোনো জিনের DNA-এর মধ্যে লুকিয়ে থাকা প্রোটিন ক্যাপসাইসিনের প্রভাবেও সক্রিয় হচ্ছে ও হট অ্যান্ড স্পাইসি একটা অনুভূতির সৃষ্টি করছে। পরীক্ষাটি এরম ছিল যে, তারা কালচার কোষের মধ্যে তাদের সেই সংগৃহীত জিনগুলির ক্রিয়াকলাপ লক্ষ্য করেন, কিন্তু নাহ! কোনোটাই কোষগুলিকে ক্যাপসাইসিন সংবেদী করছেনা। তারপর এলো ইউরেকা! তারা দেখলেন একটি মাত্র জিন কোষগুলিকে ক্যাপসাইসিন সংবেদী করতে পারছে। আরো অনেক পরীক্ষা করে জানা গেল সেই জিনটিকে আবৃত করে থাকে এক আয়ন চ্যানেল প্রোটিন; নাম TRPV1, যা তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে, অর্থাৎ যে তাপমাত্রা আমাদের কাছে যন্ত্রণাদায়ক, তাতে সক্রিয় হয়ে ওঠে।

“ডেভিড জুলিয়াস লঙ্কার ক্যাপসাইসিনকে কাজে লাগিয়ে সন্ধান পান TRPV1-এর, এক ধরনের আয়ন চ্যানেল যা তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে, অর্থাৎ যে তাপমাত্রা আমাদের কাছে যন্ত্রণাদায়ক, তাতে সক্রিয় হয়ে ওঠে।”

এরপর তারা দুজনেই ভাবেন, হট অ্যান্ড স্পাইসি না হয় বোঝা গেল, কিন্তু মেন্থল সমৃদ্ধ ক্লোরমিন্ট বা ভিক্স লজেন্স খেলে ওরকম ঠান্ডা ঠান্ডা লাগে কেনো? তারা দেখেন যে TRPM8 আয়ন চ্যানেলটি ঠান্ডা অনুভূতি সৃষ্টির জন্য দায়ী। এছাড়াও আরো অনেক আয়ন চ্যানেলের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে যারা বিভিন্ন তাপমাত্রার হেরফেরে সক্রিয় হয়ে ওঠে।

এবার এলো তাহলে কিভাবে বাহ্যিক চাপ ও স্পর্শ অনুভূত হয়?

বিজ্ঞানীরা যদিও ব্যাক্টেরিয়ার মধ্যে বেশ কিছু যান্ত্রিক সংবেদক কোষের সন্ধান পেয়েছিলেন। কিন্তু মেরুদন্ডী প্রাণীদের ক্ষেত্রে তা ছিল অজানা।

তখন আরডেম প্যাটাপুটিয়ান দেখেন যে মেরুদন্ডী প্রাণীর কোষকে মাইক্রোপিপেট দিয়ে খোঁচা মারলে তারা বেশ ভালো মত বৈদ্যুতিক সংকেত দিচ্ছে। তারা মনে করলেন যে এই খোঁচা মারার ফলে অর্থাৎ বাহ্যিক উদ্দীপনায় একধরনের আয়ন চ্যানেল সক্রিয় হয়ে ওঠে। এবং দেখতে দেখতে ৭২টি জিনের সন্ধান পাওয়া গেলো যারা এই আয়ন চ্যানেলকে আবৃত করে থাকে। ব্যাস মাথায় হাত! এতো জিনের মধ্যে বাহ্যিক উদ্দীপনায় কোন বিশেষ জিনটি সাড়া দেয় কি করে জানবে? এক এক করে সব জিন নিষ্ক্রিয় করা হলো, এবং অবশেষে সেই বিশেষ জিনটি পাওয়া গেলো যারা ওরকম মাইক্রোপিপেট দিয়ে খোঁচা মারায় অর্থাৎ বাহ্যিক উদ্দীপনায় সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। এই আয়ন চ্যানেলটির নাম দেওয়া হয় Piezo1। গ্রীক ভাষায় Pressure= píesi। Piezo1 -এর মতই আর একটি জিন পাওয়া যায় যার নাম Piezo2। Piezo1 ও Piezo2 দুটি আয়ন চ্যানেলই কোষের ওপর কোনরকম চাপের প্রভাবে সক্রিয় হয়ে যায়। পরে আরও জানা যায় যে Piezo2 অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্পর্শ সংবেদক এবং প্রপ্রিওসেপশানে অর্থাৎ দেহের অবস্থান, চলন, গমন ইত্যাদিকে অনুভূত করতে সাহায্য করে। শুধু তাই নয়, Piezo1 ও Piezo2 রক্তচাপ, শ্বাস প্রশ্বাস ও মূত্রথলির নিয়ন্ত্রণেও সাহায্য করে।

“প্যাটাপুটিয়ান সন্ধান পান স্পর্শ সংবেদক আয়ন চ্যানেলটির, যার নাম দেওয়া হয় Piezo1”

তাহলে এই ছিল ২০২১ সালের শারীরবিদ্যা ও ঔষধে নোবেল প্রাপকদের গবেষণার বিষয়বস্তু। TRP আয়ন চ্যানেল (TRPV1, TRPM8) মূলত তাপমাত্রা উপলদ্ধি করতে এবং Piezo আয়ন চ্যানেল স্পর্শ, দেহের অবস্থান, চলন, গমনকে উপলদ্ধি করতে অন্যতম সহায়ক।

“TRP আয়ন চ্যানেল (TRPV1, TRPM8) মূলত তাপমাত্রা উপলদ্ধি করতে এবং Piezo আয়ন চ্যানেল স্পর্শ, দেহের অবস্থান, চলন, গমনকে উপলদ্ধি করতে অন্যতম সহায়ক।”

—————–

চিত্র: এলেবেলে দিশানী ও এলেবেলে অর্কব্রত 

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।