নোবেল প্রাইজ ২০২১: পদার্থবিদ্যা

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
196 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

~ কলমে এলেবেলে ঋত্বিক ~

———————————-

২০২১ সালের পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল পুরস্কারপ্রাপকদের নাম ঘোষণা হয়েছে আজ, বিগত কিছু বছরে যে বিষয়গুলিতে নোবেল দেওয়া হয়েছিল, তার থেকে এবছরের বিষয় নির্বাচনটা অনেকটাই আলাদা। এবার নোবেল পেয়েছেন, সুকুরো মানাবে, ক্লাউস হাসলম্যান এবং জর্জিও পারিসি। তিনজনের গবেষণার মূল বিষয় হল Complex System বা জটিল বস্তু। এখন এই নামটা পপুলার সায়েন্সের জগতে একটু অচেনা, তাই একটু বর্ণনা দেওয়া প্রয়োজন জটিল বস্তু জটিল কেন?

পদার্থবিদ্যায় কোন বস্তুর আচরণ ব্যক্ত করা হয় যে রাশিগুলির দ্বারা, তাদেরকে বলা হয় সেই বস্তুর Degrees of freedom বা স্বাধীনতার মাত্রা। কিন্তু স্বাধীনতার মাত্রা যত বেশি হয়, সেই বস্তুকে নিয়ে গবেষণা তত কঠিন হয়ে যায়, কারণ সেই স্বাধীনতার মাত্রা যদি সাধারণ নিউটনের সূত্র মেনে চলে, তবুও খুব বেশি সংখ্যক স্বাধীনতার মাত্রার জন্য নিউটনের সূত্র সমাধান করা সম্ভব নয়। 

তার কারণ হল দুটো; এক তাদের সংখ্যা অনেক বেশি, আর দুই, স্বাধীনতার মাত্রাগুলি কোন না কোনভাবে পরস্পরের সাথে যুক্ত বা Coupled, এই বিশাল সংখ্যক অবকল সমীকরণকে Decouple করা অথবা এই বিপুল সংখ্যক Coupled অবকল সমীকরণ সমাধান করা অসম্ভব। এই অসম্ভবটা আসলে আমাদের সীমাবদ্ধতা, তাত্ত্বিকভাবে (In principle) এটা করার কথা, কিন্তু বর্তমান সময়ে আমাদের সবথেকে শক্তিশালী সুপার কম্পিউটার ব্যবহার করেও হয়তো সমাধান পেতে সময় লাগবে যতটা মহাবিশ্বের আয়ু, ততটা। সুতরাং, এইভাবে এগুলো নিয়ে কাজ করা যাবেনা। আসলে তার প্রয়োজনও নেই, যদি আমরা সংখ্যাতত্ত্ব (Statistics), গড়, সম্ভাবনা, এই সব ধারণাগুলিকে কাজে লাগাই। 

এগুলি কাজে লাগবে, কারণ এই সব জটিল বস্তু জটিল, কারণ এদের স্বাধীনতার মাত্রাগুলোর আচরণ সুসংহত (Deterministic) নয়, বরং বিশৃঙ্খলতা আছে তাদের আচরণে (randomness)

এছাড়াও আছে ক্যায়োটিক ব্যবহার, অর্থাৎ কোন একটা সময়ে তাদের আচরণে খুব সামান্য পরিবর্তন, পরবর্তীকালে কোন দৈত্যাকার পরিবর্তনের জন্ম দিতে পারে। এই ধরণের জটিল বস্তুর উদাহরণ ট্রাফিক, স্নায়ুকোষের ব্যবহার, আবহাওয়া, Glassy সিস্টেম ইত্যাদি।

যারা ২০২১ সালের পদার্থবিদ্যা বিভাগে নোবেলের জন্য মনোনীত হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ সুকুরো মানাবে। তাঁর যে গবেষণার জন্য এই নোবেল, তা মূলত পৃথিবীর গরম হওয়া-সংক্রান্ত মডেলের উপর, যা তিনি শুরু করেছিলেন আগের শতকের ৫০-এর দশকে। আরহেনিয়াসের গবেষণা থেকে এটা জানা ছিল যে কার্বন ডাই অক্সাইডের ঘনত্ব পৃথিবীর উষ্ণায়ন ঘটাতে পারে, আবার এই ঘনত্ব হ্রাস পৃথিবীকে আবার একটু শৈতীযুগে নিয়ে যেতে পারে। পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়বে না কমবে তা নির্ভর করে প্রধানত তিনটে জিনিসের উপর, সূর্য থেকে আগত দৃশ্যমান রশ্মি, পৃথিবী থেকে প্রতিফলিত অবলোহিত রশ্মি, এবং বায়ুমণ্ডল কর্তৃক শোষিত অবলোহিত রশ্মি। গ্রিনহাউস গ্যাস এই শোষণের পরিমান বাড়ায়। তবে এটুকুই শেষ না, আর এটাই মানাবের গবেষণার প্রথম ধাপ। তাঁর প্রস্তাবিত মডেল অনুযায়ী, বায়ুমণ্ডল কর্তৃক তাপ শোষিত হয়, এবং মাটির কাছের বায়ু বেশি গরম হয়, সুতরাং সেটি হালকা হয়ে উপরে উঠে যায়, আর ঠান্ডা বায়ু নিচে নেমে আসে। গরম বায়ুতে জলীয়বাষ্প থাকে, যা উপরে উঠে লীনতাপ ত্যাগ করে জলকণায় পরিণত হয়, যা আরো খানিকটা উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণ। তার এই মডেলটি ছিল একমাত্রিক, কারণ সেই সময় ত্রিমাত্রিক মডেল সমাধান করার মত কম্পিউটার ছিল না। পরবর্তীকালে তিনি এই মডেলের আরো উন্নতিসাধন করেন, এবং বলাই বাহুল্য এটি পৃথিবীর উষ্ণায়ন সম্পর্কে এক মাইলস্টোন গবেষণা ছিল। 

মানাবের প্রায় ১০ বছর পরে এই আবহাওয়া সংক্রান্ত গবেষণায় আসেন ক্লাউস হাসলম্যান। তিনি জলবায়ু এবং আবহাওয়ার মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করেন তার মডেলের মাধ্যমে। একটা উদাহরণে আসি, ৬ই অক্টোবর পশ্চিম বাংলার আবহাওয়া কেমন থাকে? কবি লিখেছেন “এসেছে শরৎ হিমের পরশ, লেগেছে হওয়ার পরে”, কিন্তু কৈ, চেপে বৃষ্টি হল যে আজ! তাহলে? আসলে জলবায়ু আর আবহাওয়া ব্যাপারটাই এরকম, জলবায়ু একটা গড় ব্যাপার, কিন্তু আবহাওয়া তা নয়, আবহাওয়া ভীষণই বিশৃঙ্খল। এই রকম বিশৃঙ্খল আবহাওয়ার তথ্য থেকে কেমন করে জলবায়ুর মডেল আসতে পারে, যেটা আদতেই অনেক সুসংহত (well behaved)? এটাই হাসলম্যানের মুন্সিয়ানা, তিনি এখানে কাজে লাগলেন আইনস্টাইন আবিষ্কৃত ব্রাউনিয়ান গতির তত্ত্ব, বিশৃঙ্খল আবহাওয়াকে Noise হিসাবে ধরে নিলেন, কাজে লাগলেন সম্ভাবনা-বিজ্ঞান। তাই তাঁর প্রস্তাবিত মডেলটিকে আমরা বলতে পারি জলবায়ুর সম্ভাবনাময় মডেল (Stochastic model of Climate), এই মডেলকে অনেক কিছুই প্রভাবিত করতে পারে, যেমন হঠাৎ মরুপ্রদেশে কোন বিশাল বরফের চাঙড় গলে গেল, বা হঠাৎ কোথাও অগ্নুৎপাত শুরু হল, এগুলো অবশ্যই পারিপার্শ্বিক আবহাওয়াকে প্রভাবিত করবে, কিন্তু দীর্ঘকালীন পরীক্ষা বা Long time average নিলে এই আকস্মিক ঘটনাগুলির পরেও সুসংহত জলবায়ুর prediction সম্ভব, এবং হাসেলম্যান সেটাই করেছিলেন। এছাড়াও হাসেলম্যান একটি পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলেন যার মাধ্যমে মানবসভ্যতার অবদান কতটা বিশ্বউষ্ণায়নের পিছনে, তা পরিমাপ করা সম্ভব হয়েছিল।

ইতালির বিজ্ঞানী জর্জিও পারিসি একজন বহুমুখী প্রতিভা, তার গবেষণার ক্ষেত্রগুলি হল, কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরি, স্ট্যাটিসটিকাল ফিজিক্স এবং জটিল বস্তু। তবে তাঁর যে কাজটির জন্য নোবেল সেটি হল স্পিন গ্লাস, এখানে গ্লাসকে গ্লাসই বলা হচ্ছে, কারণ এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি অবস্থা পদার্থের। স্পিন গ্লাসের একটা ছোট্ট বিবরণ দেওয়া যাক। ধরা যাক আমাদের কাছে কিছু সারি আছে, ছবির মত, সেই সারিগুলির প্রত্যেক বিন্দুতে একটা করে পরমাণু বসতে পারে। এখন এই সারির বেশিরভাগ বিন্দুতে তামার পরমাণু বসবে, অল্প কয়েকটা বিন্দুতে লোহার পরমাণু বসালাম। লোহার পরমাণুর চৌম্বক ভ্রামক আছে, আর সেই জন্য তারা একে অপরকে প্রভাবিত করে। কিন্তু আমাদের এই বিশেষ সিস্টেমটিতে কিছু বিশেষ অবস্থায় দেখা যায় একটা দশা পরিবর্তন (Phase transition) হয়, আর লোহার পরমাণুগুলির চৌম্বকভ্রামকের কোনো সুনির্দিষ্ট ক্রম (order) পাওয়া যায় না, অথচ তারা স্থায়ী অবস্থা (Stable Configuration) লাভ করেছে। পদার্থের এই বিশেষ অবস্থাকে বলা হয় স্পিন গ্লাস। চৌম্বক ভ্রামক আছে, এমন সিস্টেম স্থায়িত্ত্ব লাভ করে তখনই, যখন তাদের সবার ভ্রামকের দিক এক হয়, কারণ তখনই তাদের শক্তি সর্বনিম্ন হয়। কিন্তু স্পিন গ্লাসে অবাক কান্ড, লোহার পরমাণুর চৌম্বক ভ্রামকের কোন নির্দিষ্ট দিক নেই, কিন্তু তারা স্থায়ী, তবে তাদের মধ্যে এমন কি মিথস্ক্রিয়া বর্তমান, যার জন্য সুনির্দিষ্ট দিক ব্যতিত তারা স্থায়ী! চৌম্বকীয় পদার্থের একটা বিশেষ অবস্থা, এবং এটা অনেকদিন বিজ্ঞানীদের মাথা ঘামিয়েছে। ই অবস্থাকে Magnetic Frustration বা হতাশ চৌম্বকত্ব বলা হয়। একটা চৌম্বক ভ্রামকের চারপাশের ভ্রামকগুলি এমন ভাবেই অবস্থান করছে, যে সে নিজে একটা দ্বিধার মধ্যে, যে সে কোন দিক নির্দেশ করবে?

১৯৭৯ সালে পারিসি একটি মডেল উত্থাপন করেন, যেটি, এই স্পিন গ্লাসের ব্যবহারকে বর্ণনা করতে সক্ষম হয়েছিল, যদিও সেটার গাণিতিক প্রমাণ করা যায়নি সাথে সাথে। তবে সেই গাণিতিক প্রমান করা গিয়েছিল কিছু বছর পর এবং তার পর পারিসি-এর মডেল অনেক সিস্টেমের বর্ণনা দিতে কাজে লেগেছে। এছাড়াও পারিসির একটা বিখ্যাত মডেল আছে KPZ বা কারদার- পারিসি-ঝাং মডেল যেটি ক্রমবর্ধমান ইন্টারফেসএর অবকল সমীকরণ। জটিল বস্তু সম্পর্কিত তাঁর এই গবেষণা যে শুধু পদার্থবিদ্যায় কাজে লাগে তা নয়, গণিত, জীববিদ্যা, মেশিন লার্নিং ইত্যাদি ক্ষেত্রগুলিতেও এর অনেক ব্যবহার। 

আশা করা যায়, এই জটিল বস্তুর সম্ভাবনাময় জগৎ সম্পর্কে অল্প কিছু বোঝা গেল।     

—————————————

চিত্র: এলেবেলে অর্কব্রত ও এলেবেলে প্রত্যয়

সাইক্লোন-চিত্রের সূত্র: https://pixabay.com/photos/storm-hurrican-ocean-shore-weather-1209365/

 

 

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।