নোবেল প্রাইজ ২০২১: রসায়ন

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
170 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

~ কলমে এলেবেলে বেদাংশু ~

—————————————

অপ্রতিসম অজৈব অনুঘটনঃ বেঞ্জামিন লিস্ট ও ডেভিড ম্যাকমিলান 

২০২১এর নোবেল প্রাইজ ঘোষণার মাধ্যমে পাঁচ বছর পর পুনরায় জৈব রসায়ন থেকে নোবেল প্রাইজ পেলেন দু’জন বিজ্ঞানী। এর আগে ২০১৬ সালে জৈব রসায়ন থেকে আণবিক যন্ত্র (Molecular Machine) আবিষ্কারের জন্য এই প্রাইজ পেয়েছিলেন বেন ফেরিঙ্গা, ফ্রেজার স্টুডার্ট এবং জ পিয়ের সোভাজ। আর এবারে এই পুরস্কার পেলেন প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির ডেভিড ম্যাকমিলান ও ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইন্সটিটিউটে কর্মরত বেঞ্জামিন লিস্ট। দুজনেই পেলেন অপ্রতিসম জৈব অনুঘটন প্রক্রিয়া (Asymmetric Organocatalysis) নিয়ে তাদের কাজের জন্য। 

অপ্রিতসম জৈব অনুঘটন বুঝতে গেলে আমাদের প্রথমে বুঝতে হবে রসায়নে অপ্রতিসম যৌগ বলতে কী বোঝায়। অপ্রতিসম জিনিসের খুব ভালো উদাহরণ হল আমাদের ডান এবং বাঁ হাত। অর্থাৎ দুটি বস্তু, যারা একে অন্যের প্রতিবিম্ব (mirror image) কিন্তু একে অন্যের সাথে সম্পূর্ণ এক (Superimposable) নয়। অপ্রতিসম যৌগ হল এমন দুটি অণু যারা একে অন্যের প্রতিবিম্ব। সম্পূর্ণ একই ফরমুলার কেবলমাত্র গঠনগত আলাদা এইরকম দুটি যৌগকে বলা হয় এনানসিওমার। একটি R, অন্যটি S।

দুটি এনানশিওমারের আণবিক সঙ্কেত (Molecular formula), আণবিক ভর (Molecular Mass), সবই এক। কেবলমাত্র গঠনগত তফাৎ। ওই যে, উপরে যেমন বললাম, একজন মানুষের ডান এবং বাম হাত। অথচ এই সামান্য তফাৎই তার কার্যকারিতায় কতটা আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে দেয় তা বোঝা যায় তার বাইরের বিভিন্ন ধর্ম দেখে। যেমন, লিমোনিন। লিমোনিন একটি যৌগ যা লেবুজাতীয় ফলের খোসায় পাওয়া যায়। লিমোনিনের একটি এনানসিওমারের গন্ধ পাতিলেবুর মতো, কিন্তু অন্য এনানশিওমারের গন্ধ কমলালেবুর মতো। সুতরাং, কেবলমাত্র ত্রিমাত্রিক জ্যামিতিতে তফাৎ থাকলেও তার বাহ্যিক ধর্মে আমূল পরিবর্তন হওয়া সম্ভব। 

১৯৫৭ সালে থ্যালিডোমাইড বলে একটি ওষুধ পশ্চিম জার্মানির বাজারে আসে। এটির মূল কাজ ছিল সিডেটিভ হিসেবে কাজ করা। কিন্তু বাজারে আসার কিছু বছর বাদে আবিষ্কার হয়, গর্ভস্থ মহিলা এই ওষুধ খেলে তার গর্ভস্থ ভ্রুণ একাধিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। ১৯৬১ সালের মধ্যে শুধুমাত্র পশ্চিম জার্মানিতে ১০০০০ শিশু এই ওষুধের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্থ হয়, যার মধ্যে ৪০% জন্মের সময়ই মারা যায়, বাকিরা বিকলাঙ্গ হয়ে জন্মগ্রহণ করে।

এই ঘটনা সমগ্র পৃথিবীর ওষুধ নির্মাণের জগতে এক স্থায়ী প্রভাব ফেলে। পরে আবিষ্কার হয়, থ্যালিডোমাইডের দুটি এনানশিওমারের একটি এই দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। থ্যালিডোমাইডের S এনানশিওমার যেখানে সিডেটিভ হিসেবে কাজ করে, সেখানে R এনানশিওমার গর্ভস্থ ভ্রুণকে বিকলাঙ্গ করে তোলে। এর উপর ভিত্তি করে বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে আমেরিকার Food and Drug Administration (FDA) নিয়ম পাশ করে যে এখন থেকে কোনো ওষুধের ছাড়পত্র পেতে গেলে তার এনানশিওমারের প্রত্যেকটির কার্যকারিতা আলাদাভাবে দেখাতে হবে। ফলে দুটি এনানশিওমারের মধ্যে যেকোনো একটিকে নির্দিষ্টভাবে তৈরি করতে পারাটা ক্রমশ খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে রসায়নের জগতে এবং এই জায়গাতেই বেঞ্জামিন লিস্ট ও ডেভিড ম্যাকমিলান তাদের যুগান্তকারী আবিষ্কার জগতের সামনে রাখেন।

বেঞ্জামিন দেখেছিলেন, মানুষের শরীরের বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ায় যেসমস্ত রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে তাতে কিন্তু নির্দিষ্টভাবে একটিই এনানশিওমার তৈরি হয়। শরীরের ক্ষেত্রে উৎসেচক (enzyme) এই সমস্ত বিক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে অনুঘটক হিসেবে। অনুঘটন এমন একটি প্রক্রিয়া যাতে বাইরে থেকে কোনো রাসায়নিক যৌগ (অনুঘটক) ব্যবহার করে কোন বিক্রিয়ার হার বাড়ানো বা কমানো হয়। বেঞ্জামিন পর্যবেক্ষণ করেন, উৎসেচক অজস্র অ্যামাইনো অ্যাসিড দ্বারা গঠিত হলেও, বিক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে মাত্র কয়েকটি অ্যামাইনো অ্যাসিড। তিনি ভাবতে শুরু করেন, আদৌ একইভাবে বিক্রিয়াটি করার জন্য সম্পূর্ণ উৎসেচকটির বদলে যদি কেবলমাত্র ওই কয়েকটি অ্যামাইনো অ্যাসিড ব্যবহার করা যায়, সেক্ষেত্রে ফল কীরকম পাওয়া যেতে পারে। মূলত এরই উপর ভিত্তি করে বেঞ্জামিন প্রোলিন (একটি অ্যামাইনো অ্যাসিড) ব্যবহার করেন রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অনুঘটক হিসেবে, এবং তার ফলাফল অত্যন্ত সদর্থক হয়। বেঞ্জামিন একটিই এনানশিওমার তৈরি করতে সমর্থ হন। ২০০০ সালের ফেব্রুয়ারির মাসে এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়, যাতে বেঞ্জামিন লেখেন তার পরবর্তী কাজ হল এই ধরণের আরও  জৈব অনুঘটক তৈরি ও তাদের কার্যকারিতার উপর গবেষণা করা।

যদিও এই যাত্রায় বেঞ্জামিন একা ছিলেন না। প্রায় একই সময়কালে বার্কলেতে ডেভিড ম্যাকমিলান প্রায় একই জিনিস তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। ম্যাকমিলানের কাজ ছিল ধাতব অনুঘটক (Metal Catalyst)-এর বিকল্প খুঁজে বার করা। তিনি খেয়াল করেছিলেন, যে পরিমাণে অনুঘটক আবিষ্কার হয়, তার খুবই কম পরিমাণ কলকারখানায় ব্যবহৃত হচ্ছে। এর কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে ম্যাকমিলান দেখলেন, ধাতব অনুঘটকের একটি মূল সমস্যা হল তা জলীয় বাষ্প ও অক্সিজেনের সংস্পর্শে এলে বড় তাড়াতাড়ি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। ফলে পরীক্ষাগারের ভেতরে জলীয় বাষ্প ও অক্সিজেনহীন পরিবেশ বানিয়ে তাতে ধাতব অনুঘটক নিয়ে কাজ করা সম্ভব হলেও, বৃহৎ আকারে কলকারখানায় তা একেবারেই সম্ভব না। যেহেতু মূল সমস্যা ধাতুতে তাই ম্যাকমিলান ঠিক করলেন, ধাতু ছাড়া কেবল জৈব অণুই (Organic Compound) অনুঘটক হিসেবে ব্যবহার করবেন তিনি।

যদিও কাজটা বেশ কঠিন ছিল। ধাতব অনুঘটকে ধাতুর প্রধান কাজ হল ইলেকট্রনের আদানপ্রদান নিয়ন্ত্রণ। ম্যাকমিলান চাইছিলেন এমন কিছু একটা, যা ধাতুর বিকল্প হতে পারে। আগের অভিজ্ঞতা ও রসায়নের জ্ঞান থেকে তিনি ঠিক করেন, এই কাজ করার জন্য উপযুক্ত হবে ইমিনিয়াম আয়ন (iminium ion), যা একটি নাইট্রোজেন ও চারটি হাইড্রোজেন পরমাণু দ্বারা গঠিত, এবং আয়ন হওয়ায় ইলেকট্রনের সহজ আদান প্রদান করতে সক্ষম। ম্যাকমিলান এইধরণের একাধিক যৌগ প্রস্তুত করে তাদের উপর পরীক্ষানিরীক্ষা করেন। এবং ফলাফল খুবই আশানুরূপ হয়। ম্যাকমিলান এবং তার সাথীরা দেখেন, শুধু ভালো কাজই না, এদের মধ্যে কিছু কিছু জৈব অনুঘটক নির্দিষ্ট এনানশিওমার তৈরি করত সক্ষম। এইসমস্ত পরীক্ষানিরীক্ষার ফলাফল একত্রিত করে ২০০০ সালে, বেঞ্জামিনের কাজটি প্রকাশিত হওয়ার ঠিক কয়েকদিন আগে, ম্যাকমিলান তার লেখা জমা দেন, যেখানে তারা প্রথম জৈব অনুঘটন (Organocatalysis) শব্দটি ব্যবহার করেন।

বেঞ্জামিন ও ম্যাকমিলান, দুজনের কাজই রসায়নের জগতে বিশাল আলোড়ন ফেলে। পরবর্তী বছরে অপ্রতিসম জৈব অনুঘটনের উপর অজস্র কাজ হয়। একাধিক সস্তা, কার্যকরী ও ব্যবহারযোগ্য জৈব অনুঘটক প্রস্তুত করেন দু’জনে। 

কেবলমাত্র অপ্রতিসম যৌগ তৈরি বা ধাতব অনুঘটকের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করা নয়, জৈব অনুঘটকের আবিষ্কার জৈব রাসায়নিক বিক্রিয়ার (Organic reactions) জগতে এক আমূল পরিবর্তন আনে। সাধারণত রাসায়নিক বিক্রিয়ায় প্রধান দরকারি রাসায়নিক যৌগের পাশাপাশি একাধিক অদরকারি জিনিসও তৈরি হয়, এবং মূল যৌগকে আলাদা করতে গিয়ে প্রতি ধাপে তা কিছু পরিমাণে নষ্ট হয়ে থাকে। জৈব অনুঘটনে দেখা যায় অনুঘটকেরা একবারেই ধাপে ধাপে একাধিক রাসায়নিক বিক্রিয়া (Cascade reaction) ঘটাতে সক্ষম, যেমনটা উৎসেচক প্রকৃতিতে করে থাকে। 

জৈব অনুঘটনের সাফল্যের একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা আরো পরিষ্কার হবে। স্ট্রিকনিন (strychnine) তৈরি করতে পারাটা জৈব রসায়নবিদ (Organic Chemist)-দের কাছে সবসময় একটা চ্যালেঞ্জের ব্যাপার। ১৯৫২ সালে স্ট্রিকনিন তৈরি করতে ২৯টি রাসায়নিক বিক্রিয়ার (reactions) প্রয়োজন পড়ত। এবং শেষ পর্যন্ত যা পাওয়া যেত, তা আসলের ০.০০০৯% মাত্র। ২০১১ সালে বিজ্ঞানীরা যখন জৈব অনুঘটকের ব্যবহার করে স্ট্রিকনিন তৈরি করলেন তখন তার মূল রাসায়নিক বিক্রিয়ার সংখ্যা শুধু কমে ১২ হল তাই নয়, এবারের প্রাপ্ত স্ট্রিকনিনের পরিমাণ ছিল আগেরবারের তুলনায় প্রায় ৭০০০ গুণ বেশি।

বেঞ্জামিনের মূল উদ্দেশ্য ছিল অপ্রতিসম যৌগ উৎপাদনের প্রয়োজনীয় অনুঘটক খুঁজে বার করা, অন্যদিকে ম্যাকমিলান চেয়েছিলেন ধাতু ব্যবহার না করেই অনুঘটক তৈরি করতে। বেঞ্জামিনের আবিষ্কৃত অনুঘটক ধাতুহীন হওয়ায় এবং ম্যাকমিলানের ধাতুহীন অনুঘটক অপ্রতিসম যৌগ তৈরিতে সক্ষম হওয়ায় তারা নিজেদের লক্ষ্যের পাশাপাশি একে অন্যের লক্ষ্যেও পৌঁছতে সক্ষম হয়েছিলেন। এই পুরস্কার তাই যৌথভাবে দুজনকেই অপ্রতিসম জৈব অনুঘটন প্রক্রিয়ার আবিষ্কারের জন্য দেওয়া হয়েছে। 

আশা করা যায়, রসায়নের এই নতুন শাখা ভবিষ্যৎ পৃথিবী ও মানবসভ্যতার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

 

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।