ওদের যতটা খারাপ ভেবেছিলাম, ওরা ততটা খারাপ নয়

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
506 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

~কলমে এলেবেলে সঞ্চারী ~

আজ সকাল থেকেই মিনি আর পুকু মনমরা করে নিজেদের ঘরে চুপ হয়ে বসে আছে। কারণ হলো তাদের বাবা। আজ চতুর্থী, দুর্গা পুজোর শুরু। আর আজই কিনা তাদের বাবা কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন যে এবছর পুজোয় কোনো প্যান্ডেলে যাওয়া যাবে না। করোনা আবার বেড়ে যাচ্ছে, তাই ভিড়ের মধ্যে পুজো প্যান্ডেলে যাওয়া তো দূরের কথা, বাড়ী থেকে বেরনোই যাবে না! বাড়ির অন্য সদস্যরা (মা, কাকাই, দাদু, ঠাম্মি) এই প্রস্তাব মেনে নিলেও মিনি আর পুকুর মন কিছুতেই এই নিষেধাজ্ঞা মানতে রাজি হচ্ছে না। পুকু তো বার বার বলছে, “ধুর! আমি যেই লাল জামাটা কিনলাম সেটা আর পরাই হবে না। বাপির যদি প্যান্ডেলে না নিয়ে যাওয়ারই থাকতো তাহলে তো আগেই বলে দিতে পারতো আমি আর জামা কিনতাম না!” আর ঐদিকে মিনি শুধু বলছে, “নে পুকু এবছরের পুজো ঘরে বসে পাড়ার প্যান্ডেলের মাইকের ওই বোরিং গান শুনেই কাটাতে হবে।” একবার তো দুজনে প্রায় কেঁদেই উঠলো…এই সমস্ত কথা বলতে বলতে হঠাৎ নীচের কলিং বেলটা বেজে উঠল।

দু’জনেই হুড়মুড়িয়ে নীচে এসে পিঙ্কি মাসিকে জড়িয়ে ধরতে গেল। কিন্তু পারলো না!

দুঃখী মনে, শুকনো মুখ নিয়ে ব্যালকনি থেকে মুখ বাড়িয়ে যেই নিচের দিকে তাকালো সেই তার কাঁদো কাঁদো মুখটা এক গাল হাসিতে ভরে উঠল। পুকুকে হাসতে দেখে মিনিও ব্যালকনিতে এসে হাজির। তারও একই অবস্থা! এর কারণ হলো প্রায় দুই বছর তিন মাস কুড়ি দিন পর তাদের আদরের পিঙ্কি মাসি এসেছে। দু’জনেই হুড়মুড়িয়ে নীচে এসে পিঙ্কি মাসিকে জড়িয়ে ধরতে গেল। কিন্তু পারলো না! বাবা প্রথমেই বললেন, “পিঙ্কি, তুই আগে গিয়ে স্নান কর। তারপর সবার সঙ্গে জমিয়ে আড্ডা হবে।” পরে মিনিরা বুঝতে পারলো যে, এটা তাদের বাপিরই একটা প্ল্যান কারণ, পিঙ্কি মাসিকে পেলে ওরা ঠাকুর দেখা কি, নাওয়া খাওয়া পর্যন্ত ভুলে যায়। বাড়ি থেকে না বেরনোর সত্যি একটা জব্বর প্ল্যান এঁটেছেন মিনি-পুকুর বাবা। পিঙ্কি মাসি বীরভূম-এ একটি কলেজের অধ্যাপিকা। কলেজ তো প্রায় দেড় বছর হলো বন্ধ। তাই এবছর করোনার চিন্তাকে তুড়ি মেরে, তার জামাইবাবুর (মিনি পুকুর বাবা) এক কথায় চলে এসেছেন এখানে। পিঙ্কি মাসি এখানে আসলে মিনি পুকুকে ভালো ভালো গল্প শোনায়, গান শোনায়, সিনেমা দেখতে নিয়ে যায়, ঘুরতে নিয়ে যায় আরও কত কি… মানে ওদের সব আবদার মেটায় পিঙ্কি মাসি।

দই, মাখন, কুমিস, ঘোল, ইডলি, পনির তৈরি করতেও ব্যাকটেরিয়াদের প্রয়োজন হয়।

কিন্তু এবার পিঙ্কি মাসিকে দেখে ওরা খুশি হলেও ওদের মনে একটা দুঃখ রয়েই গেছে, এবছর ওরা পিঙ্কি মাসিকে নিয়ে ঠাকুর দেখতে যেতে পারবে না। ওদের এই অবস্থা দেখে পিঙ্কি মাসি ওদেরই কাছ থেকে আসল কারণটা জেনে নিলো। এইবার পিঙ্কি মাসির পালা মিনি আর পুকুর দুঃখকে গল্পের ছলে ভোলানো। অগত্যা পিঙ্কি মাসি বললো, “ওহ!! এই ব্যাপার।”-সঙ্গে সঙ্গে পুকু বলে উঠলো, “এই ব্যাপার মানে? তুমি জানো, আমরা এবছর পুজোর জন্য কত প্ল্যান করেছিলাম! সব প্ল্যানে বাপি আর এই করোনা দু’জন মিলে একবারে জল ঢেলে দিলো। ধুস! কেন যে এই পৃথিবীতে এই ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া নানান জীবাণু বেঁচে আছে কি জানি!” তখন পিঙ্কি মাসি বললো, “তাহলে শোন। আজকে তোদের একটা গল্প বলি।” দুজনেই উদগ্রীব হয়ে বলল, “কি গল্প?”

—“আজকে তোদের বলব এই পৃথিবীতে কেন বিভিন্ন জীবাণুদের প্রয়োজন? মানে, তোদের কিছু ভালো জীবাণুদের উপকার-এর কথা বলবো।” পুকু সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো, “হুমমম জীবাণুরা নাকি আবার ভালো!! কই বলো দেখি, ওরা কি এমন উপকার করে আমদের?” পিঙ্কি মাসি বলতে লাগলো, “আচ্ছা পুকু তুই প্রথমে বল তোর ফেভারিট ডিস কি?” পুকু বলল, “সেটা তো তুমি জানোই। কি আবার! লাচ্ছা পরোটা আর বাটার পনির।”

—“হ্যাঁ তুই কি জানিস এই পনির তৈরি করতেও ব্যাকটেরিয়াদের প্রয়োজন হয়।” পুকুর চোখ গোলগোল হয়ে গেল।

এরা কিন্তু কৃষকদের একরকম বন্ধু হিসেবে কাজ করে।

“এছাড়াও দই, মাখন, কুমিস, ঘোল, ইডলি যেটা মিনির প্রিয়, এই সবকিছু তৈরি করতেও প্রয়োজন হয় স্বয়ং ব্যাকটেরিয়াদের। তাছাড়াও তোদের শরীর খারাপ হলে ডক্টর-আঙ্কেল যে এন্টিবায়োটিক (স্ট্রেপটোমাইসিন, নিওমাইসিন, এরিথ্রোমাইসিন, টেরামাইসিন ইত্যাদি) দেন, সেগুলোও কিন্তু আবিষ্কার হয়েছে জীবাণুদের সাহায্যে। এছাড়া ভ্যাকসিন, ভিটামিন ইত্যাদি উৎপাদনেও জীবাণুরা সাহায্য করে।

এরা কিন্তু কৃষকদের একরকম বন্ধু হিসেবে কাজ করে কারণ, পেস্টদের জৈবিক নিয়ন্ত্রণে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, প্রোটোজোয়ার ভূমিকা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। Bacillus thuringiensis নামক ব্যাকটেরিয়া, পতঙ্গ ও পেস্টদের মেরে ফেলে। Bacillus papillae নামক ব্যাকটেরিয়া প্রয়োগ করে জাপানি বিটল দমন করা হয়। Leptomonas, Tetrahymena, Nosema ইত্যাদি প্রোটোজোয়া বিভিন্ন পতঙ্গদের দেহে রোগ সৃষ্টি করে পতঙ্গ পেস্ট দমন করে। এছাড়াও অনেক ভাইরাস আছে যারা বিভিন্ন পেস্টদের আক্রমণ করে তাদের দেহে বিভিন্ন রোগ সৃষ্টি করে। এইসব ভাইরাসদের ব্যবহার করেও পেস্টদের দমন করা হয়।

তাছাড়া কিছু ব্যাকটেরিয়া, শৈবাল, ছত্রাক একা একা বা দল বেঁধে পরিবেশ-এর কোনরকম ক্ষতি না করে মাটির উর্বরতা বাড়ায়, শস্য, ফসল ইত্যাদি উৎপাদনকারী গাছদের পুষ্টি যোগায়, তাদের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। এদের বলে Biofertilizer বা অণুজীব সার।

কৃষিক্ষেত্রে সায়ানোব্যাক্টেরিয়া চাষ করে প্রায় ৭.৮ লক্ষ টন নাইট্রোজেন উৎপাদন করা যেতে পারে।

এবার একটু এদের কথাই বলি তোদেরকে। 

প্রধানত তিন প্রকার অনুজীব সারের মূল উপাদান হলো— ব্যাকটেরিয়া, সায়ানব্যাক্টেরিয়া ও মাইকোরাইজা।

ব্যাকটেরিয়া: কিছু কিছু ব্যাকটেরিয়া আছে যারা বায়ুর নাইট্রোজেনকে মাটিতে আবদ্ধ করে মাটিতে নাইট্রোজেন-এর পরিমাণ বৃদ্ধি করে। এদের মধ্যে কিছু হলো মুক্তজীবী আর কিছু হলো মিথজীবী।

এবার তোদের বলি, মুক্তজীবী ব্যাকটেরিয়াদের দ্বারা নাইট্রোজেন মাটিতে সংবদ্ধন-এর গল্পটা। Azotobacter, clostridium, Bacillus polymyxa ইত্যাদি হলো মাটিতে বসবাসকারী স্বাধীনজীবী ব্যাকটেরিয়া। এরা বাতাস থেকে সরাসরি নাইট্রোজেন শোষণ করে মাটিতে আবদ্ধ করে। ফলে মাটিতে নাইট্রোজেন-এর পরিমাণ বাড়ে এবং মাটি উর্বর হয়।

মিথজীবী ব্যাকটেরিয়া কর্তৃক নাইট্রোজেন সংবদ্ধন: রাইজবিয়াম নামক মিথজীবী ব্যাকটেরিয়া, শিম্বিগোত্রীয় উদ্ভিদ যেমন মটর, সিম, বরবটি ইত্যাদির মূলের অর্বুদে বসবাস করে। এরা বায়ু থেকে সরাসরি নাইট্রোজেন শোষণ করে, তার কিছুটা মাটিতে মিশিয়ে দেয় আর কিছুটা নিজের দেহ সংগঠনের কাজে লাগায়। গাছগুলি মরে গেলে মাটির সঙ্গে মিশে যায়, তখন দেহস্থ নাইট্রোজেন উপাদান (প্রোটিন) মাটিতে মিশে মাটির নাইট্রোজেন এর পরিমাণ বাড়ায়।

এবার বলি সায়ানোব্যাক্টেরিয়াদের কথা।

সায়ানোব্যাক্টেরিয়া: মাটিতে বসবাসকারী সায়ানব্যাক্টেরিয়া বা নীলাভ সবুজ শৈবাল বায়ু থেকে নাইট্রোজেন শোষন করে মাটিতে নাইট্রোজেন সংবদ্ধন ঘটায়, ফলে মাটি উর্বর হয়। কৃষিক্ষেত্রে সায়ানোব্যাক্টেরিয়া চাষ করে প্রায় ৭.৮ লক্ষ টন নাইট্রোজেন উৎপাদন করা যেতে পারে, যার মুল্য প্রায় ১৫-১৭ লক্ষ টন ইউরিয়ার সমান।

Anabaena, Nostoc, Aulosira, Tolypothrix, Stigonema, Cylindrospermum ইত্যাদি কতগুলো স্বাধীনজীবী সায়ানোব্যাক্টেরিয়া আছে, যারা নাইট্রোজেন স্থিতিকরণ ঘটাতে পারে। সায়ানোব্যাক্টেরিয়া জমিতে জন্মালে জমির উর্বরতা অনেকটা বেড়ে যায়। এছাড়া সায়ানোব্যাক্টেরিয়া মরে জমিতে মিশলে জমির উর্বরতা আরো বেশি বেড়ে যায়। এর দ্বারা জৈব পদ্ধতিতে নাইট্রোজেন সারের প্রয়োজন মেটানো যায়।

এবার আসি মাইকোরাইজার কথায়। 

মাইকোরাইজা: এরা একটা বিশেষ ধরনের ছত্রাক। পাইন গাছের মূলে এরা বসবাস করে। এইসব মাইকোরাইজার জন্য গাছ মাটি থেকে অনেক পুষ্টি উপাদান শোষণ করতে পারে। মাইকোরাইজা ছত্রাক যেমন গাছের কাছ থেকে থাকার জায়গা বা আশ্রয় পায় ও তার থেকে পুষ্টি আহরণ করে, তেমনই গাছকে মাটি থেকে পুষ্টি আহরণেও সাহায্য করে। মাইকোরাইজা ছত্রাকের দুই রকম অবস্থান দেখা যায়। এদের বহিঃমাইকোরাইজা এবং অন্তঃ মাইকোরাইজা বলে। এরা মূলের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে এবং মূলের চারপাশে অসংখ্য অনুসূত্র সৃষ্টি করে জল শোষণে সহায়তা করে। মাইকোরাইজার হাইফা মাটিকে দৃঢ় ভাবে আটকে রেখে ভুমিক্ষয় রোধ করে। শিম্বীজাতীয় উদ্ভিদ এ মাইকোরাইজা রাইজোবিয়াম এর সাহায্যে অর্বুদ গঠন করে। Pinus মূলে মাইকোরাইজাল ছত্রাক লিগনলাইটিক ও সেলুলোজ উৎসেচক ক্ষরণ করে মাটিতে পড়ে থাকা উদ্ভিদ-এর দেহাংশকে পচিয়ে হিউমাস গঠন করে। অর্কিড জাতীয় উদ্ভিদ-এর মূলে মাইকোরাইজা গঠিত না হলে স্বাভাবিক বৃদ্ধিও বাধাপ্রাপ্ত হয়।”

কি রে তাহলে বুঝলি আমাদের জীবনে জীবাণুদের কতটা ভূমিকা আছে?

“কিরে তাহলে বুঝলি আমাদের জীবনে জীবাণুদের কতটা ভূমিকা আছে?”

পুকু আর মিনি এতক্ষণ চোখ গোলগোল করে সব কথা গুলো শুনছিলো। এবার পুকু বললো, “না! ওদের যতটা খারাপ ভেবেছিলাম ততটা খারাপ ওরা নয় তাহলে! কি বল মিনি?” মিনিও পুকুর কথায় সায় দিলো। “যাক পিঙ্কি কিছুটা হলেও ওদের মনে আনন্দ দিতে পারলো। দশমী পর্যন্ত এইসব গল্পই চলবে তাহলে!” মিনি আর পুকুর বাবা খুশি হয়ে বললেন।

———————————————–

লেখক পরিচিতি: দলবলের কনিষ্ঠতম সদস্য সঞ্চারী রায়চৌধুরী শিবহাটি হাই স্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্রী।

 

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।