শক্তি – প্রথম পর্ব

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
487 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

~কলমে স্বপ্নীলা রায়~

শক্তিই হচ্ছে মানব সভ্যতার প্রধান চালক। দৈনন্দিন কাজে, কৃষিতে, পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থায়, চিকিৎসা ও শিক্ষায় এবং আমোদ প্রমোদ ব্যবস্থায় শক্তির ব্যবহার অনস্বীকার্য। বহুল ব্যবহৃত শক্তির প্রচলিত (Conventional) উৎস হচ্ছে ‘জীবাশ্ম জ্বালানী’ (যেমন – কয়লা, পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস) এবং তেজস্ক্রিয় পদার্থ। কিন্তু প্রচলিত শক্তি-উৎসের সঞ্চয় খুবই সীমিত এবং বাধাহীন ব্যবহারের ফলে সঞ্চয় ভান্ডার নিঃশেষের মুখে (অনবীভবনযোগ্য)। তাছাড়া প্রচলিত শক্তির উৎস থেকে শক্তি আহরণের পদ্ধতিতে পরিবেশের ওপর ক্ষতিকারক প্রভাবও যথেষ্ট (জীবাশ্ম জ্বালানীর দহনে উৎপন্ন SO2, NO2, CO, CO2 প্রভৃতি গ্যাস বায়ুমণ্ডলের দূষণের জন্য দায়ী)। এই অবস্থায় গতিশীল বাস্তুতন্ত্রের পরিবেশ ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণে প্রচলিত শক্তি-উৎসের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে। পরিবেশ সংকটের এই সন্ধিক্ষণে অপ্রচলিত (Non-conventional) শক্তির উৎস (যথা সূর্যরশ্মি, বায়ুপ্রবাহ, জোয়ারভাটা, আবর্জনা, ভূ -তাপ ইত্যাদি) থেকে শক্তি আহরণের উদ্যোগ শুরু হয়েছে এবং প্রবণতা ক্রমশ বাড়ছে। কারণ অপ্রচলিত শক্তি-উৎসের যোগান অফুরন্ত (নবীভবনযোগ্য) এবং পরিবেশ দূষণের সমস্যা নেই বললেই চলে।

প্রচলিত এবং অপ্রচলিত শক্তির উৎস:- সচরাচর যে সব শক্তি-উৎস থেকে ব্যবহারোপযোগী শক্তি সংগৃহীত হয় তাদের প্রচলিত শক্তি-উৎস বলা হয়। প্রচলিত শক্তি-উৎস আবার নবীভবনযোগ্য বা অনবীভবনযোগ্য হতে পারে। জীবাশ্ম জ্বালানী – কয়লা, পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস ‘অনবীভবন প্রচলিত এবং জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের মূল উপকরণ জলপ্রবাহ এবং পারমাণবিক শক্তি নবীভবনযোগ্য প্রচলিত (Renewable Conventional) শক্তি-উৎসের অন্তর্ভুক্ত।

অনবীভবনযোগ্য প্রচলিত শক্তি-উৎসের সীমিত সঞ্চয় এবং ব্যবহারোপযোগী শক্তি আহরণের সময় সৃষ্ট পরিবেশ দূষণজনিত সমস্যার কথা মাথায় রেখে অধুনা নবীভবনযােগ্য বিশেষ শক্তি-উৎস ব্যবহারােপযােগী শক্তি আহরণের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে, যেগুলি পূর্বে কখনােও শক্তি আহরণের কাজে ব্যবহার করা হয়নি। এই সব নবীভবনযােগ্য শক্তি-উৎসকে ‘নবীভবনযোগ্য অপ্রচলিত’ (Renewable Non-conventional) শক্তি-উৎস বলা হয় । যেমন- সৌরশক্তি, ভূ-তাপীয় শক্তি, বায়ুশক্তি ইত্যাদি।

মানুষ যত শক্তি ব্যবহার করে তার শতকরা 33 ভাগ সংগ্রহ করে খনিজ তেল থেকে (পেট্রোলিয়াম ও ডিজেল ), শতকরা 27 ভাগ কয়লা থেকে এবং মাত্র শতকরা 5 ভাগ পরমাণুবিদ্যুৎ থেকে।

সকল শক্তি-উৎস গুলি পরিবেশকে প্রভাবিত করে। প্রকৃতিতে এমন কোন বস্তু নেই যা সম্পূর্ণরূপে ‘স্বচ্ছ শক্তি-উৎস রপে বিবেচিত হবে। প্রাথমিক শক্তি-উৎসগুলিকে (সাধারণ অর্থে শক্তি সরাসরি প্রকৃত উৎস থেকে সৃষ্টি হয় ) সাধারণতঃ দুই ভাগে বিভক্ত করা যায়।

  1. অপুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি-উৎস  

  2. পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি-উৎস

  1. অপুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি-উৎস: যে সব শক্তি-উৎসগুলি কঠিন, তরল এবং গ্যাসীয় অবস্থায় নির্দিষ্ট পরিমাণে প্রকৃতিতে পাওয়া যায় তাকে অপুনর্নবীকরণযােগ্য শক্তি-উৎস হিসাবে গণ্য করা হয়। এই ধরণের শক্তিকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সঞ্চয় করা যায় না অথবা নতুন করে তৈরী করা যায় না। উদাহরণ: প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা, পারমানবিক শক্তি। 
  2. পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি-উৎস: যে সব শক্তি-উৎসকে যেমন- সূর্য এবং বাতাস, একটি নির্দিষ্টসময়ের মধ্যে প্রতিনিয়ত পুনরায় নতুন করে উৎপন্ন করা যায় এবং প্রাকৃতিক ভাবে সঞ্চয় করা যায় তাদেরকে পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি-উৎস বলা হয়। উদাহরণ: সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, জৈবনিক ভর (জ্বালানীরূপে ব্যবহৃত উদ্ভিদ বা প্রাণীর অংশ), জলবিদ্যুৎ। বর্তমানে সারা বিশ্বে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় দুই শতাংশের কম এই পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি-উৎস থেকে আসে। 
  3. গৌণ শক্তি-উৎস: যে সব শক্তি-উৎস প্রাথমিক শক্তি-উৎস থেকে রূপান্তরিত হয় তাদের গৌণ শক্তি-উৎস বলা হয়। এই ধরণের শক্তি-উৎস সহজে ব্যবহারযোগ্যরূপে সঞ্চয়, স্থানান্তরিত এবং সরবরাহ করা যায়। উদাহরণ: বিদ্যুৎ এবং হাইড্রোজেন।
  4. অপুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি-উৎস: ১) কয়লা: এটি একটি অপুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি-উৎস কারণ এটি লক্ষ লক্ষ বছর ধরে তৈরী হয়। কয়লা মূলতঃ কার্বন এবং হাইড্রোকার্বন দিয়ে গঠিত পাললিক শিলা। তাছাড়া কয়লা একপ্রকার জীবাশ্ম জ্বালানী কয়েক লক্ষ বছর ধরে মৃত সামুদ্রিক প্রাণী, উদ্ভিদ,অ্যালগী প্রভৃতির দেহ চাপা পড়ে প্রস্তরীভূত হয়ে যায়। এবং তা কয়লার মত জীবাশ্ম জ্বালানীতে পরিণত হয়। কয়লার একটি স্বাভাবিক ত্রুটি হল এটি একটি অপরিচ্ছন্ন জ্বালানী। কয়লা পােড়ালে SO2 নির্গত হয় যা দূষিত গ্যাস এবং বায়ুতে H2SO4 তৈরী করে অম্লবর্ষণ ঘটায়। এর ফলে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি হয়। কয়লা উত্তোলনের পর কয়লাখনির খাদে মাটি বসে যাওয়ায় সমস্যার সৃষ্টি করে এবং সন্নিহিত অঞ্চলের জনবসতি বিপন্ন হয় । কয়লা পোড়ানোর ফলে উৎপন্ন ছাই (Fly ash) একটি আপত্তিজনক বর্জ্য পদার্থ যা পরিবেশের ক্ষতি করে। তাই কয়লার সোজাসুজি ব্যবহার পরিবেশের নানাবিধ সমস্যার সৃষ্টি করে। সেই কারণে উন্নত দেশগুলিতে বিশেষ পদ্ধতিতে কয়লা থেকে সালফার ও ছাই মুক্ত করে কয়লা পুড়িয়ে গ্যাস ও তরল জ্বালানীতে রূপান্তরিত করা হয়। এই পদ্ধতিতে কয়লা চূর্ণ করে উপযুক্ত দ্রাবকে নিয়ে উচ্চ চাপে (1000 lb বর্গ ইঞ্চিতে) এবং উচ্চ তাপে (450 ডিগ্রী সেন্টিগ্রেট তাপমাত্রায় ) হাইড্রোজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া করানো হয়। এই ভাবে উৎপন্ন কয়লাকে বলা হয় দ্রাবক পরিশােধিত কয়লা (Solvent Refined Coal, SRC) যার দাহিকা শক্তি বেশি (প্রতি পাউন্ডে 16000 BTU)। বায়ুর অনুপস্থিতিতে উচ্চ তাপমাত্রায় কয়লাকে ভেঙে কোকে রূপান্তরিত করা হয়। এই পদ্ধতিতে উদবায়ী পদার্থ আলাদা হয়ে যায়। ফলস্বরূপ কোককে তাপ উৎস হিসাবে এবং লৌহ প্রস্তুতিতে বিজারক পদাথ হিসাবে ব্যবহৃত হয়।

কয়লাকে নিম্নলিখিত চারটি পদ্ধতিতে তরল এবং গ্যাসীয় জ্বালানীতে পরিণত করা হয়।

  1.  পাইরোলিসিস 
  2.  ফিসার টুপস্ক পদ্ধতি 
  3.  হাইড্রোলিকুইফ্যাকশন
  4.  আংশিক পাতন। 

বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলিতে কয়লা, লিগনাইট, ডিজেল, প্রাকৃতিক গ্যাস প্রভৃতি জ্বালানীকে চুল্লীতে পুড়িয়ে বা দহন করার ফলে যে তাপশক্তি পাওয়া যায়, সেই তাপশক্তি যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয় তা হল তাপবিদ্যুৎ ।। তাপবিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষতিকারক দিকগুলি হল

  1. সালফার ডাই অক্সাইড, নাইট্রোজেনের বিভিন্ন অক্সাইড যৌগ, কার্বনডাই অক্সাইড ইত্যাদি | নির্গত হওয়ার ফলে বায়ু দূষণ হয়। 
  2. বিভিন্ন রকমের বর্জ্য পদার্থ মুক্ত হওয়ার কারণে জল দূষণ হয়। 
  3. বন-উচ্ছেদ বা বৃক্ষছেদন ।

কয়লা থেকে সহজেই মিথানল উৎপন্ন হয়। উচ্চ চাপে (50 atm চাপে) ও 250 ডিগ্রী সেন্টিগ্রেট তাপমাত্রায় CO এবং H2-এর বিক্রিয়ায় (তামার যৌগের অনুঘটকের উপস্থিতিতে ) মিথানল তৈরী হয়।

CO+2H2 – CH3OH

বর্তমানে ম্যাগনেটো হাইড্রোডায়নামিক জেনারেটরে কয়লা ব্যবহার করে গ্যাসের দহন প্রক্রিয়ায় সরাসরি তাপশক্তি থেকে কার্যকরী ও সুবিধাজনক পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। ম্যাগনেটো হাইড্রোডায়নামিক জেনারেটরে কম পরিমাণ জ্বালানীর প্রয়োজন হয়। প্রচলিত নিয়মে কয়লা পুড়িয়ে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ শক্তি উৎপন্ন হয় এবং তার ফলে যে মাত্রায় পরিবেশ দূষণ হয়, ম্যাগনেটো হাইড্রোডায়নামিক জেনারেটরে এই দুইয়ের পরিমাণ অপেক্ষাকৃত কম।

স্বচ্ছ কয়লা প্রযুক্তিবদ্যা: পরিবেশের ওপর কয়লার দহন এবং খননের প্রভাব কমানোর জন্য বর্তমানে কয়লা শিল্প এক নতুন ধরণের প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। অন্যতম বহুল পরিচিত স্বচ্ছ কয়লা প্রযুক্তি হল কার্বন সংগ্রহ ও পৃথকীকরণ (Carbon Capture and Sequestration). যার মাধ্যমে কয়লা থেকে উৎপন্ন কার্বনডাই অক্সাইড, তরল অবস্থায় পরিণত হয় এবং ভূপৃষ্ঠের নীচে চিরস্থায়ী ভাবে সঞ্চিত হয়। বিজ্ঞানীরা ভবিষ্যৎবাণী করেছেন যে, বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের মাধ্যমে যে সমস্যা দেখা দিতে পারে, তা দূর করতে হলে গ্রীণহাউস গ্যাসের নির্গমন প্রায় ৮০ শতাংশ কমাতে হবে । স্বচ্ছ কয়লা প্রযুক্তিবদ্যার (Carbon Capture and Sequestration) মাধ্যমে এই লক্ষ্য পূরণ করা সম্ভব হতে পারে ।

২) পারমাণবিক বিদ্যুৎ বা নিউক্লীয় শক্তি: পারমানবিক বিভাজন প্রক্রিয়ায় ইউরেনিয়ামের নিউক্লিয়াসের (U-235) বিভাজন ঘটিয়ে যে তাপশক্তি নির্গত হয় তা থেকেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। একেই বলা হয় পারমাণবিক বিদ্যুৎ। 

* পারমাণবিক বিদ্যুতের অসুবিধা

  1. i) জল, বাতাস এবং মাটি তেজস্ক্রিয় বর্জ্য পদার্থ দ্বারা দূষিত হয়।
  2. ii) বন-উচ্ছেদ বা বৃক্ষছেদন 

* পারমাণবিক বিদ্যুতের ব্যবহার

  1. i) সারা বিশ্বের মোট শক্তির প্রায় ১৫ শতাংশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ থেকে আসে। 
  2. ii) চিকিৎসাবিদরা অনেক ক্ষেত্রে রোগের কারণ অনুসন্ধান এবং সনাক্তকরণের জন্য তেজস্ক্রিয় সমস্থানিক বা রেডিও আইসোটোপ ব্যবহার করেন। প্রথাগত চিকিৎসা পদ্ধতির উন্নতির বৃদ্ধির লক্ষ্যে এগুলো ব্যবহার করা হয়। 

iii) বিভিন্ন শিল্পক্ষেত্রে আণুবীক্ষণিক ঘনত্ব পরিমাপের জন্য, ধাতব বহিরাবরণের ত্রুটি নির্নয়ের ক্ষেত্রে এবং ধাতব জোড় পরীক্ষা করতে তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ ব্যবহার করা হয়। 

  1. iv) প্রত্নতাত্ত্বিকবিদরা প্রাগৈতিহাসিক বস্তুর বয়স বা সমসাময়িক কাল নির্ধারণের ক্ষেত্রে পারমাণবিক পদ্ধতি ব্যবহার করে থাকেন। তাছাড়া কোনো খোদাই করা প্রতিমূর্তি বা বহুতল অট্টালিকায় কোনো গঠনগত ত্রুটি নির্নয়ের ক্ষেত্রে পারমাণবিক পদ্ধতি কাজে লাগানো হয়। 
  2. v) খাদ্যের নিউক্লীয় উজ্জ্বলতার কারণে সংরক্ষিত, হিমায়িত এবং শুষ্ক খাদ্যের তুলনায় ভিটামিনের অভাব কম হয়। এর ফলে খাদ্য থেকে সৃষ্ট রােগের প্রকোপ কম দেখা দেয় ।

পারমাণবিক শক্তি – পরিবেশ ও সুরক্ষা: ভারতে এই শক্তির সম্ভাবনাও যথেষ্ট রয়েছে । কারণ প্রচুর পরিমাণ থোরিয়াম এবং যথেষ্ট পরিমাণ ইউরেনিয়াম ভাণ্ডার এদেশে রয়েছে । সঙ্গে সঙ্গে সেগুলির উত্তোলন, প্রক্রিয়াকরণ, জ্বালানী হিসেবে পরমাণু চুল্লীতে ব্যবহার করে শক্তি উৎপাদন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও ভারত অর্জন করেছে। পাশাপাশি মানুষের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা এবং পরিবেশের ওপর ক্ষতিকারক প্রভাবের দিক বিবেচনা করে পারমাণবিক শক্তিকে শক্তি-উৎস রূপে ব্যবহারের উত্তোরত্তর বৃদ্ধির আংশিক ভাবে সীমাবদ্ধতা প্রয়োজন। বিশ্ব পারমাণবিক অ্যাসােসিয়েসান নিশ্চিত করে বলছে যে পারমানবিক শক্তি থেকে যে ভাবে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়, তা কয়লা ও পেট্রোলিয়াম নামক জীবাশ্ম জ্বালানী থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের তুলনায় অনেক বেশি নিরাপদ। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হল যে, তেজস্ক্রিয় বর্জ্য হঠাৎ করে পরিবেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাছাড়া পারমাণবিক শক্তিকে যুদ্ধের কাজে লাগানো যেতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে তেজস্ক্রিয় পদার্থ জমে থাকলে তা পরিবেশের ওপর মারাত্মক ক্ষতিকারক প্রভাব পড়বে।

নিউক্লিয় জ্বালানী: অপুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি-উৎসের অন্যতম রূপ হল নিউক্লিয় জ্বালানী, যা প্রাথমিকভাবে ইউরেনিয়াম আকরিকের খনন এবং বিশোধনের মাধ্যমে পাওয়া যায়।

ইউরেনিয়াম প্রাকৃতিকভাবে খনিজগর্ভে পাওয়া যায় । অধিকাংশ ইউরেনিয়াম অত্যন্ত অল্প পরিমাণে সঞ্চিত হয় যা একত্রিত হয়ে বিশোধিত হয়। ইউরেনিয়াম আকরিকসমূহ একত্রিত হলে এগুলিকে একসঙ্গে দণ্ডে পরিণত করাহয় । যখন এটি সংকট ভরে (critical mass) উপনীত হয়, তখন ইউরেনিয়ামের । ভাঙ্গন শুরু হয় এবং এটি শক্তি নির্গমন করে যা জলকে (দণ্ডটি জলে নিমজ্জিত) উত্তপ্ত করে। এই ঘটনাকে ‘ফিশন’ (fission) বলে । এই উত্তপ্ত জল চাপ সৃষ্টি করে এবং এই সৃষ্ট চাপ টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে যা আমরা প্রতিদিন ব্যবহার করে থাকি ।

৩) পেট্রোলিয়াম: তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাস এই দুইয়ের সংমিশ্রণে পেট্রোলিয়াম তৈরী হয়। পেট্রোলিয়াম হল শত শত হাইড্রোকার্বন অণুর দ্বারা গঠিত একটি জৈব যৌগ, যাতে হাইড্রোজেন এবং কার্বন থাকে। পেট্রোলিয়াম কখনাে তরল অবস্থায় (অশোধিত তেল) এবং কখনো গ্যাসীয় অবস্থায় (প্রাকৃতিক গ্যাস ) থাকে । 

প্রাকৃতিক গ্যাস – মুল্যবান উৎস: প্রাকৃতিক গ্যাস পৃথিবীর ভূ-গর্ভ থেকে সংগৃহীত মিথেন সমৃদ্ধ গ্যাসীয় এবং অনবীভবনযোগ্য একটি প্রচলিত শক্তি-উৎস । রাসায়নিক সংযুক্তি অনুসারে প্রাকৃতিক গ্যাসের মূল উপাদান মিথেন গ্যাস (60 – 95 %) এবং সামান্য পরিমাণ ইথেন গ্যাস (সর্বোচ্চ 25%) এবং অতি সামান্য পরিমাণ হাইড্রোকার্বন । প্রাকৃতিক গ্যাসের দহনে CO2 কম উৎপন্ন হয়। প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে প্রতি ইউনিট শক্তি উৎপাদনে যত CO2 উৎপন্ন হয়, তার 45% বেশি CO2 উৎপাদন হয় খনিজ তেল থেকে, 75% CO2 উৎপাদন হয় কয়লা থেকে এবং 80-90% বেশি CO2 উৎপন্ন হয় কাঠ জ্বালালে। প্রাকৃতিক গ্যাসের ভাণ্ডার খনিজ তেলের মত স্বল্পস্থায়ী। এটি সাধারণত বর্ণহীন এবং বিষক্রিয়াহীন। ভূ-গর্ভের অধিকাংশ ‘অয়েল ট্র্যাপ’ থেকে কিছু পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস। সংগৃহীত হলেও প্রাকৃতিক গ্যাস প্রধানত উত্তোলন করা হয় পৃথক গ্যাস সঞ্চিত কূপ থেকে। প্রাকৃতিক গ্যাসের দহনে অনেক কম পরিমাণে কার্বনডাই অক্সাইড উৎপন্ন হয়। সেই জন্য প্রাকৃতিক গ্যাসকে স্বচ্ছ ও পরিবেশ বান্ধব জ্বালানী হিসাবে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। বেশির ভাগ প্রাকৃতিক গ্যাস পাইপ লাইনের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়। এতে নিকটস্থ ব্যবহারের বাজার থেকে দূরবর্তী উৎস গুলিতে সরবরাহের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা তৈরী হয়। কিন্তু প্রযুক্তিবিদ্যার উল্লেখযোগ্য উন্নতির ফলে প্রাকৃতিক গ্যাসকে তরলে পরিণত করে অনেক বিস্তৃত দূরবর্তী স্থানে সরবরাহ ও পরিবহন করা যায়। প্রাকৃতিক গ্যাস ছাড়া কৃত্রিম উপায়ে প্রস্তুত জ্বালানী গ্যাস প্রোডিউসার গ্যাস (CH4, CO, CO2 ও H2) এবং ব্লাস্ট ফার্নেস কোক ওভেন থেকে প্রাপ্ত উপজাত -‘কোল গ্যাস’ (CH4, H2) শক্তির উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। প্রাকৃতিক গ্যাসের তাপ উৎপাদক শক্তি প্রভূত হওয়ায় জ্বালানী হিসেবে এবং বিদ্যুৎ শক্তি উৎপাদনের উৎস হিসেবে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহৃত হয়। এক্ষেত্রেও রাসায়নিক শক্তি তাপশক্তিতে বা বিদ্যুৎশক্তিতে রূপান্তরিত হয়। উল্লেক্ষ্য, কঠিন বা তরল জ্বালানীর তুলনায় প্রাকৃতিক গ্যাসের তাপ উৎপাদন ক্ষমতা অনেক বেশি।

প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার এবং পরিবেশের ওপর প্রভাব: বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত পেট্রোলিয়ামের ৬৬ শতাংশ পরিবহনের ক্ষেত্রে অর্থাৎ গাড়ী, বাস, ট্রাক এবং বিমানের জ্বালানী হিসাবে ব্যবহৃত হয়। অবশিষ্ট ৩৪ শতাংশ পেট্রোলিয়াম অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত হয় যার দ্বারা আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে অনেক সহজ ও উপযোগী করে তুলেছে।

তেল এবং গ্যাস ব্যবহারের ক্ষেত্রে যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে উপজাত দ্রব্য হিসাবে কার্বনডাই অক্সাইড গ্যাস নির্গত হয়, তার প্রভাব সমন্ধে আরও বিস্তারিত মূল্যবান এবং সঙ্গতিপূর্ণ কাজের প্রয়ােজন আছে। এই সমস্যার প্রস্তাবিত সমাধান হিসাবে কার্বনডাই অক্সাইডকে পৃথকীকরণ বা পুরোনো তেল বা গ্যাস ভাণ্ডারে সঞ্চয় করে রাখতে হবে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রে এবং অন্যান্য শিল্প ক্ষেত্রে সংগ্রহ করে বিশেষ পদ্ধতিতে উচ্চ চাপে ক্ষুদ্র জায়গার মধ্য দিয়ে ভূপৃষ্ঠের নীচে শিলা স্তরে প্রবেশ করিয়ে সঞ্চয় করতে হবে।

চিরাচরিত শক্তির উৎস :

প্রোডিউসার গ্যাস: প্রোডিউসার গ্যাস হল কার্বনমনোঅক্সাইড এবং নাইট্রোজেনের মিশ্রণ। এটি একটি শিল্পের জন্য প্রয়ােজনীয় সস্তা জ্বালানী । এটি নিম্নমানের কয়লা থেকে পাওয়া যায়। 

*) LPG: LPG (Liquified Petroleum Gas ) সাধারণতঃ প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে অথবা তৈল শোধনাগার থেকে উৎপন্ন হয়। 

*) দুটি অপেট্রোলিয়াম জাত দ্রব্য মোটর গাড়ীর জ্বালানী হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

  1. a) বেঞ্জল: এটি লাইট ওয়েলের (Light Oil) আংশিক পাতন প্রক্রিয়ায় পাওয়া যায়। 
  2. b) পাওয়ার আ্যলকোহল: এটা একধরণের ইথাইল আলকোহল যা মোটরের জ্বালানীর

অতিরিক্ত সংযোজক হিসেবে কাজ করে ইঞ্জিন চালনা করে । 

*) প্রোপেন: প্রোপেন একটি শক্তি সমৃদ্ধ গ্যাস। এর রাসায়নিক সংকেত CH। এটি একটি তরলায়িত পেট্রোলিয়াম গ্যাস যা প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেলের মিশ্রণ। প্রাকৃতিক গ্যাস প্রস্তুতিকরণ কেন্দ্রে প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে এবং তৈল শোধনাগারে অপরিশোধিত তৈল থেকে প্রোপেন এবং অন্যান্য তরল গ্যাস (যেমন- ইথেন, বিউটন) পৃথকীকরণ করা হয়। প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে এবং তেল থেকে উৎপাদিত প্রোপেনের পরিমাণ প্রায় সমান। LPG ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা গৃহস্থালির বিভিন্ন কাজে সুবিধা ভোগ করি। যেমন- শক্তি সরবরাহ, উত্তাপন, রন্ধন এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজে LPG ব্যবহৃত হয়।

নিম্নলিখিত ভাবে LPG -এর সঙ্গে অন্যান্য জ্বালানীর তুলনা করা যেতে পারে – ১) LPG থেকে কোনো ক্ষতিকারক বা বিপজ্জনক পদার্থ উৎপন্ন হয় না। ২) LPG – এর জ্বলনে কয়লা এবং তেলের তুলনায় কম পরিমাণ CO2 উৎপন্ন হয়। ৩) LPG – এর জ্বলনে কোনো প্রকার ধোঁয়া নির্গত হয় না এবং সামান্য পরিমাণ SO2 ও | NO2 উৎপন্ন হয়। ৪) LPG থেকে স্থলভাগে ও জলভাগে কোনোরকম দূষণ ঘটে না। ৫) LPG হল উপজাত দ্রব্য। ফলে কোনো বর্জ্য পদার্থ উৎপন্ন হয় না । ৬) তেলের বয়লারের তুলনায় LPG বয়লার সহজে লাগানাে যায় এবং স্বল্প ব্যয়ে রক্ষণাবেক্ষণ করা যায়।

~~~~~~~~~~~~~~~

স্বপ্নীলা রায় বর্তমানে উত্তরপ্রদেশের সাহারানপুর স্থিত গ্লোকাল বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর রূপে কর্মরতা। পূর্বে তিনি কে কে ইউনিভার্সিটি, নালন্দা, বিহারেও সহকারী অধ্যাপিকা হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিবেশ রসায়নবিদ্যায় পিএইচডি অর্জন করেন।

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।