ফ্রেড হয়েল— নোবেল বঞ্চনার এক প্রতীক

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
487 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

 

~ কলমে সত্যেন দাস ~ 

১৯ শে অক্টোবর ১৯৮৩ সাল। একটি ফোন এসেছিল আমেরিকার বিখ্যাত পরমাণু পদার্থবিদ উইলি ফাউলার-এর কাছে। যে ফোনটা পৃথিবীর যে কোন বিজ্ঞানীর কাছে একটা স্বপ্ন। ফোনটা এসেছিল সুইডিশ একাডেমী অফ সায়েন্সের এক সদস্যের কাছ থেকে। খুব শান্ত ও সযত্নে তিনি বললেন, সমস্ত মৌল যাদের দ্বারা আমাদের শরীর তথা এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড তৈরি হয়েছে, তাদের নাক্ষত্রিক উৎসের ওপর গবেষণার জন্য এই বছরের নোবেল পুরস্কার উইলি ফাউলারকে দেওয়া হচ্ছে। এও বলা হল, তাঁর সঙ্গে এই পুরস্কার ভাগ করে নেবেন সুব্রহ্মনিয়াম চন্দ্রশেখর যাঁর গবেষণা তারাদের গঠন এবং তাদের বিবর্তন নিয়ে। ফাউলার ভাবছিলেন, হয়ত তাঁর সহ-গবেষক ফ্রেড হয়লের নামটাও শুনবেন। কিন্তু কোথায়? ৭২ বছরের ফাউলার আকাশ থেকে পড়লেন— ফ্রেড হয়লের নাম নেই? এটা কি সঠিক বিচার হল? রয়্যাল সোসাইটির প্রেসিডেন্ট বিখ্যাত ব্রিটিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী লর্ড মারটিন রীস দুঃখ করে বলেছিলেন— এটা সুইডিশ একাদেমির অন্যায্য ভুল বিচার। হয়েলের জীবনীকার কেমব্রিজের জ্যোতির্বিজ্ঞানী সাইমন মিট্টনের দাবী— তারাদের মধ্যে সমস্ত মৌলদের সৃষ্টি রহস্যভেদের যে ভাবনা বা অন্ত:দৃষ্টি তা সবই হয়েলের; পরীক্ষালব্ধ তথ্য পরিবেশন করেছেন ফউলার। নেচার পত্রিকার সম্পাদক জন ম্যাডক্স বলেন, এটা লজ্জার যে ফাউলার নোবেল পেলেন কিন্তু হয়েল পেলেন না।  

৭২ বছরের ফাউলার আকাশ থেকে পড়লেন— ফ্রেড হয়লের নাম নেই?

১৯৭২ সালে স্যার উপাধি পেলেন হয়েল। এছাড়া রয়্যাল মেডাল, রয়্যাল এস্ট্রোনোমিকাল সোসাইটির স্বর্ণপদক, ক্রফুড প্রাইজ ইত্যাদি। না, নোবেল প্রাইজ হয়েলের কপালে জুটল না। সমস্যাটা কোথায়? তাঁর বিজ্ঞানে নাকি তাঁর ব্যক্তিত্বে? ব্যাক্তিত্ব তাঁর যাই হোক না কেন, হয়েল ছিলেন অসাধারন প্রতিভাধর। যে বছর অর্থাৎ ১৯১৫ সালে আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব প্রকাশিত হল, সেই বছরেই জন্মালো এক নক্ষত্র, ফ্রেড হয়েল, যাঁর সারাজীবন কাটল নক্ষত্রদের গবেষনায়।

ইংল্যান্ডের ইয়র্কশ্যায়ারে গিলস্টিড জেলার বিংলে গ্রামে ২৪ শে জুন জন্মগ্রহন করেন ফ্রেড হয়েল। বাবা ছিলেন ফ্রেড হয়েলের প্রথম বিজ্ঞান শিক্ষক। বাবাই তাকে এনে দিতেন বিজ্ঞানের বই আর নানা রকমের বিজ্ঞানের যন্ত্রপাতি। তাই দিয়েই নানা পরীক্ষা নিরিক্ষা করতেন। একদিন মায়ের রান্নাঘরে তৈরি করলেন বিষাক্ত ফসজিন। হাইস্কুলে তিনি ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি ও অঙ্কে সমান পারদর্শিতা দেখান। জ্যোতির্বিজ্ঞানে তাঁর একটা স্বাভাবিক প্রজ্ঞা ছিল। মাত্র দশ বছর বয়সে তিনি তারাদের অবস্থান নিখুঁতভাবে দেখিয়ে বড়দের তাক্‌ লাগিয়ে দিতেন। বিংলে গ্রামার স্কুলে তাঁর প্রথম বছরের শেষ দিকে অর্থাৎ ১৯২৭ সালে টাউন লাইব্রেরী থেকে আনা আর্থার এডিংটনের ‘স্টারস অ্যান্ড অ্যাটমস’ বইটি বোধহয় হয়েলের শিক্ষা জীবনকে হঠাৎ করে পাল্টে দেয়। স্কুল পালানো ছেলেটা, যে কিনা ১৬ তম স্থানে ছিল, সে হল প্রথম। ১৯৩৩ সালে উনি কেম্ব্রিজে ফিজিক্স পড়ার সুযোগ পান। যখন জানলেন কেম্ব্রিজ বিজ্ঞানীরা, অর্থাৎ নিউটন, ম্যাক্সওয়েল, কেল্ভিন, এডিংটন, ডিরাক সবাই অঙ্কবিদ, তখন উনি ঠিক করলেন অঙ্ক নিয়ে পড়াশুনা করবেন। সেখানেও তিনি অত্যন্ত দক্ষতায় কেমব্রিজের উচ্চতম মান নিয়ে পাশ করলেন, দ্বিতীয় বৎসরকে টপকে গিয়ে। কেমব্রিজে পড়ার সময় হয়েলের শিক্ষকদের নাম শুনলে বোঝা যায় হয়েলের প্রতিভার বিকাশ এতখানি কেন হয়েছিল। ম্যাক্স বর্ন এবং পল ডিরাক পড়াতেন কোয়ান্টাম মেকানিক্স, এডিংটন পড়াতেন আপেক্ষিকতা তত্ত্ব। হয়েল ফলিত গণিতে স্নাতক হলেন এবং শুরু করলেন গবেষণা। গণিত ব্যবহার করে জ্যোতির্বিজ্ঞানে তাঁর হাতেখড়ি হল ব্রিটিশ গণিতজ্ঞ ও তাত্ত্বিক জ্যোতির্বিজ্ঞানী রে লিট্টলটনের হাত ধরে। দুজনে বিশদে আলোচনা করেন কিভাবে মহাজাগতিক গ্যাস মাধ্যাকর্ষণ বলের দ্বারা পূঞ্জীভুত হয় এবং তারাদের সৃষ্টি হয়।

১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বাজতে শুরু করে। এই সময়েই হয়েল বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হন। সংসারের সমস্যায় জড়িয়ে পড়েন। হয়েল সময় পান না লিট্টলটনের সঙ্গে জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে কাজ করার। ১৯৪২ সালে যুদ্ধের পরিস্থিতিতে উনি নৌসেনা বিভাগের রাডার পর্যবেক্ষকের চাকরি নেন। এখানে কাজ করতে করতে পরিচয় হয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী হারমান বন্ডি এবং থমাস গোল্ডের সঙ্গে। হয়েল এনাদের সঙ্গে জ্যোতির্বিজ্ঞানের নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন এবং পরবর্তীকালে এই তিনজন মিলে প্রকাশ করেন ‘স্টেডি স্টেট থিওরি’ বা ‘মহাজাগতিক স্থিতাবস্থা তত্ত্ব’। হয়েল সারাজীবন এই তত্ত্বকেই বিশ্বাস করেছেন। অনেক বিজ্ঞানী এই তত্ত্বের ওপর কাজ করেছেন। এঁদের মধ্যে আছেন ভারতীয় বিজ্ঞানী জয়ন্ত বিষ্ণু নার্লিকার যিনি হয়েলের সঙ্গে একসঙ্গে গবেষণা করেছেন। ‘বিগ ব্যাং’ শব্দবন্ধটি হয়েলের দেওয়া। উনি বেতারের মাধ্যমে বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করেছিলেন। এইরকম একটি বেতার প্রচারে ‘বিগ ব্যাং’ শব্দটি তাচ্ছিল্যের সঙ্গে উদ্ভাবন করেন। কিন্তু তিনি এই তত্ত্বকে মেনে নিতে পারেননি। এই বিশ্বাস হয়তো হয়েলের নোবেল না পাওয়ার এক বড় কারণ। 

‘বিগ ব্যাং’ শব্দবন্ধটি হয়েলের দেওয়া।……একটি বেতার প্রচারে ‘বিগ ব্যাং’ শব্দটি তাচ্ছিল্যের সঙ্গে উদ্ভাবন করেন।

রাডার সংক্রান্ত কাজের জন্য ১৯৪৪ সালে হয়েলকে আমেরিকা যেতে হয়েছিল। সেখানে গিয়ে দেখলেন এবং কিছুটা বুঝলেন পরমাণু বোমা গবেষণায় কি ধরনের কাজকর্ম হচ্ছে। এই সময় থেকেই হয়েল পরমাণু বিক্রিয়া নিয়ে ভাবতে শুরু করেন এবং তখনই তাঁর মাথায় আসে এক যুগান্তকারী চিন্তা— কিভাবে তৈরি হল আমাদের পরিচিত চারপাশের মৌলগুলি। 

হয়েলের প্রতিভা ছিল বহুমুখী। যদিও অঙ্ক ছিল মুখ্য বিষয়, ওনার কাজের পরিধি ছিল বিবিধ ও বিশাল। স্নাতক পাঠের সময়তেই প্রকাশিত হয় তাঁর ‘কোয়াণ্টাম তড়িৎগতিবিদ্যা’র ওপর গবেষণাপত্র। এত কম বয়সে এইরকম কাজ সত্যই বিরল দৃষ্টান্ত। কেম্ব্রিজে অঙ্কের শিক্ষক থাকাকালীন উনি লিখলেন ‘তারাদের গঠন পদ্ধতির সমীকরণগুলির সংহতিকরন প্রক্রিয়ার ওপর গবেষণাপত্র। তার পরপরই লিখলেন খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক গবেষণাপত্র যার বিষয়— হাইড্রোজেন থেকে বিভিন্ন মৌল সৃষ্টির পদ্ধতি। তারাদের ভর, তাপমাত্রা এবং ঘনত্ব অনুযায়ী কীভাবে হাইড্রোজেন থেকে বিভিন্ন রসায়ানিক মৌল তৈরি হল তার বিশদ বিবরণ প্রকাশ করলেন এই গবেষণাপত্রে। পরিসংখ্যান তত্ত্বের সাহায্যে তাদের আনুপাতিক পরিমানও বার করে ফেললেন। বিশেষভাবে উল্লেখ্য কার্বন তৈরির ইতিহাস। হয়েলই প্রথম ভবিষ্যদ্বাণী করেন কার্বন নিউক্লিয়াস-এর একটি অনুরণন শক্তিস্তর আছে যার জন্য ব্রহ্মাণ্ডে কার্বনের প্রাচুর্য জীবনের অস্তিত্বের জন্য একেবারে সঠিক। এই প্রসঙ্গে নীচের লিঙ্কের লেখাটি উল্লেখ করা যেতে পারে (https://bigyan.org.in/2020/08/14/carbon-12-nucleous-7-65mev-state/)। 

এরপর ১৯৫৪ সালে লিখলেন তাঁর অন্যতম বিখ্যাত গবেষণাপত্র যেখানে উনি দেখালেন ভারী মৌল অর্থাৎ কার্বন থেকে নিকেল পর্যন্ত মৌলদের সৃষ্টির পথ। হয়েলের লেখাটি প্রকাশিত হল ‘আস্ট্রোফিজিকাল জার্নাল সাপ্লিমেন্ট’ পত্রিকায়। এই পত্রিকার প্রচার খুবই সীমিত। এই লেখাটি তাই অনেকের অগোচরে থেকে গিয়েছিল।  

১৯৫৭ সালে যে গবেষণাপত্রটি জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং পরমাণু বিজ্ঞানীদের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল সেটি B2FH নামে খ্যাত যা চারজন লেখকের নামের আদ্যক্ষর নিয়ে তৈরি, যারা হলেন E.M. Burbridge, G.R. Burbridge, W.A. Fowler and F. Hoyle। এটি প্রকাশিত হয় বিজ্ঞানের খুবই জনপ্রিয় পত্রিকা ‘রিভিউ অফ মডার্ন ফিজিক্স’-এ, যার খ্যাতি ও প্রচার অনেক বেশি। অনেক বেশি বিজ্ঞানীর কাছে পৌছায় এই পত্রিকা। অধিকাংশ বিজ্ঞানীর কাছে তাই B2FH-টি যতটা পরিচিত, ১৯৫৪ সালে ‘আস্ট্রোফিজিকাল জার্নাল সাপ্লিমেন্ট’-এর হয়েলের গবেষণাপত্রটি প্রায় অচেনা বা অপাঠ্যই ছিল। 

পরমাণু জ্যোতির্বিজ্ঞানের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ক্যালটেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০৭ সালে এক সন্মেলন আয়োজিত হয়। এখানে মুখ্য আলচনার বিষয় ছিল ১৯৫৭ সালের ১০১ পাতার B2FH-এর রিভিউ। বিজ্ঞানের ইতিহাসবিদ ডে ক্লেটন উপরোক্ত সন্মেলনে তাঁর বক্তব্য রাখেন এবং ওই বছরেই এই বিষয় নিয়ে সায়েন্স পত্রিকায় একটি লেখা প্রকাশ করেন। ওনার কথায়, ১৯৫৪ সালের ‘আস্ট্রোফিজিকাল জার্নাল সাপ্লিমেন্ট’-এর হয়েলের গবেষণাপত্রটি সন্মেলনের অধিকাংশ বক্তাই হয় পড়েননি অথবা বোঝেননি। এই লেখাটিতে হয়েল প্রাথমিক মৌলসৃষ্টির কথা বলেছেন, আর B2FH-এ মৌলসৃষ্টির গৌণ পদ্ধতিগুলি আলোচনা করা হয়েছে। ১৯৫৪ সালের হয়েলের গবেষণাপত্রটি অনেক বেশি প্রাথমিক। তবে এই কাজের দূর্বলতা হচ্ছে এখানে মুখ্য সমীকরণটি হয়েল অঙ্কের ভাষায় লেখেননি। সেটা বুঝিয়েছিলেন যুক্তির ভাষা দ্বারা। তা সত্ত্বেও ১৯৫৪ সালের অগ্রণী এই লেখাটিকে ধরা হয় বিশ্ববিজ্ঞানের ইতিহাসে এক অন্যতম দৃষ্টান্তমূলক গবেষণাপত্র। 

অনেকে ভুল করে ভাবেন, B2FH-তে প্রকাশিত গবেষণার জন্যই ফাউলারকে নোবেল প্রাইজ দেওয়া হয়। নোবেল কমিটি পরিস্কারভাবে বলেন, ফাউলারকে নোবেল প্রাইজ দেওয়া হয় তারাদের ভেতরে যে পারমানবিক বিক্রিয়া ঘটে তাদের নিয়ে কয়েক দশকের পরীক্ষালব্ধ গবেষণার জন্য। ফাউলার নোবেল পাওয়ার পর আক্ষেপ করেন হয়েলের না পাওয়ার জন্য। উনি জানতেন, আমাদের চারপাশে যে মৌলগুলি দেখতে পাই তাদের পরমাণু সংশ্লেষের মৌলিক তাত্ত্বিক গবেষণা হয়েল তাঁর ১৯৪৬ এবং ১৯৫৪ সালের গবেষণায় প্রকাশ করেন। কিন্তু সেগুলি প্রচার পায় না। ফাউলার তাঁর নোবেল বক্তৃতায় স্বীকার করেন হয়েলই তাদের পথপ্রদর্শক। B2FH-এর অন্যান্য গবেষক অর্থাৎ জেওফ্রি বারব্রিজ এবং মার্গারেট বারব্রিজ এরাও এককথায় স্বীকার করেন হয়েলই তাদের এই কাজের অনুপ্রেরণা এবং দ্ব্যর্থহীন পরিচালক। সাইমন মিট্টন মনে করেন এই নোবেল গবেষণার কাজে হয়েলের অবদান ফাউলারের থেকেও বেশি। ফাউলার পরমাণু বিক্রিয়ার প্রাথমিক তথ্যগুলি দিয়েছিলেন, কিন্তু এই কাজের ভাবনার অন্তঃদৃষ্টি বা অনুপ্রেরণা কিন্তু হয়েলের।  

তাহলে কি এমন কারণ ঘটলো যার জন্য হয়েল নোবেল পেলেন না!

তাহলে কি এমন কারণ ঘটলো যার জন্য হয়েল নোবেল পেলেন না! প্রাথমিকভাবে মনে করা হয়, উনি যে ইয়র্কশায়ারী উপভাষায় কথা বলতেন তা তাঁর অনেক প্রভাবশালী বন্ধুকে ক্ষুব্ধ করেছিল। শুধু তাই নয়, এঁদের অনেককে সরাসরি মিথ্যাবাদী এবং প্রতারকও বলেছেন। তিনি ছিলেন ঠোঁটকাটা মানুষ, ওনার মুখ ও মনের মধ্যে কোন পার্থক্য ছিল না। উনি নিজের সম্পর্কে বলেছেন, “আমি যখন যুবক ছিলাম, বৃদ্ধরা আমাকে বলত অশিষ্ট যুবক, আর আমি এখন বৃদ্ধ, যুবকরা আমাকে বলে অশিষ্ট বৃদ্ধ”। ওনার অকপট ব্যবহার নোবেল কমিটিকে বিব্রত করেছিল। ১৯৭৪ সালে ব্রিটিশ রেডিও জ্যোতির্বিদ হেউইশকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয় প্রথম স্পন্দিত তারা (পালসার) আবিস্কার করার জন্য। হয়েল সরাসরি হেউইশকে তথ্য চুরির জন্য দায়ী করেন। এই স্পন্দিত তারার পর্যবেক্ষণ করেন হেউইশ-এর ছাত্রী জসেলিন বেল বারনেল যাকে হেউইশ এই কাজের জন্য কোন স্বীকৃতি দেননি। হেউইশের প্রতি হয়েলের মন্তব্য বিশ্বের সব সংবাদ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। হয়েল এখানেই থেমে থাকেননি, নোবেল কমিটিকে দায়ী করে চাঁচাছোলা ভাষায় একটি চিঠি লেখেন। নোবেল কমিটি এটাকে অবশ্যই ভালোভাবে নিতে পারেনি। সাইমন মিট্টন মনে করেন নোবেল কমিটিতে কেউ একটা বড় কলম দিয়ে ভবিষ্যতের নোবেলজয়ীদের তালিকা থেকে হয়েলের নামটা কেটে বাদ দিয়ে দিয়েছে। 

আগেই উল্লেখ করেছি হয়েল ছিলেন মহাজাগতিক স্থিতাবস্থা তত্ত্বের কট্টর বিশ্বাসী। ১৯৪৮ সালে হোয়েল, হারমান বন্ডি ও থমাস গোল্ড এই তত্ত্বের প্রস্তাব দেন। এটা ছিল বিগ ব্যাং এর বিকল্প তত্ত্ব। এটাও হয়ত ওনার নোবেল পাওয়ার পথের বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। উনি মনে করতেন এই ব্রহ্মাণ্ড অসীম, ব্রহ্মাণ্ডের বয়স অসীম। চতুর্দিক থেকে ব্রহ্মাণ্ড একরকম। অতীতে একরকম ছিল, বর্তমানে আছে এবং ভবিষ্যতে থাকবে। তারাদের মৃত্যু হচ্ছে এবং পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে নতুন তারার। এর ফলে ব্রহ্মান্ডের গড় ধর্ম একই থাকছে। সময়ের সঙ্গে অপরিবর্তিত বা বিবর্তনহীন। 

এই সময় বিগ ব্যাং তত্ত্ব তেমন গুরুত্ব পায়নি, কারণ সেই সময় এই তত্ত্বের সপক্ষে পরীক্ষালব্ধ প্রমান যথেষ্ট ছিলনা। তবে ১৯৬০ সালের পর থেকে স্থিতাবস্থা তত্ত্ব তার গুরুত্ব হারাতে শুরু করে। সুদূর গ্যালাক্সিতে রেডিও তরঙ্গের পরিমাণ অথবা কোয়েজার আবিস্কার সবই স্থিতাবস্থা তত্ত্বের বিরুদ্ধে যেতে শুরু করলো। কফিনের শেষ পেরেকটি পোঁতা হলো যখন ১৯৬৫ সালে আরনো পেনজিয়াস এবং রবার্ট উইলসন মহাজাগতিক মাইক্রোওয়েভ পটভূমি আবিস্কার করলেন। প্রমাণ হল আমাদের ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি হয়েছিল অতীতে কোন সময়। হয়েলের মৃত্যু হয় ২০০১ সালে। বিগ ব্যাং শব্দের উদ্ভাবক হয়েও হয়েল কিন্তু আজীবন স্থিতাবস্থা তত্ত্বকেই গুরুত্ব দিয়েছেন। মেনে নিতে পারেননি এই ব্রহ্মান্ড অতীতে কোন সময় বিন্দুবৎ ছিল এবং কোন অজানা কারণে বিস্ফোরণ হয়, শুরু হয় প্রসারণ। 

১৯৯৬ সালের কেমিষ্ট্রিতে নোবেলজয়ী স্যার হ্যারি ক্রোটো বলেন, কোন ব্যক্তিকে নোবেল পুরস্কার বিশেষ কোন একটি কাজের জন্য দেওয়া হয়না। বিজ্ঞানীর সারাজীবনের বিজ্ঞান-চেতনা, উপলব্ধি এবং বিশ্বাস থেকে যে খ্যাতি তৈরি হয়, তা সেই বিজ্ঞানীকে এনে দেয় নোবেল পুরষ্কার। সেক্ষেত্রে, যে তত্ত্ব ভুল, তার প্রবক্তাকে কি নোবেল পুরষ্কার দেওয়া যায়? এখানে তর্কের অবকাশ আছে। এছাড়া, হয়েলের আরও নানারকম অপ্রচলিত ধারনা ছিল। উনি মনে করতেন ব্যাকটেরিয়া এবং ভাইরাস পৃথিবীর বাইরে থেকে এসেছে। এইডস ভাইরাস এত জটিল, উনি মনে করতেন, এটি কোন পরীক্ষাগারে তৈরি করা হয়েছে জৈবযুদ্ধের অস্ত্র হিসাবে। জীবনের অস্তিত্ব, যে মহাজাগতিক সমাপতনগুলির জন্য দায়ী তাদের সম্ভাব্যতা এতই কম, হয়েল মনে করতেন এই ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি কোন অতিমানবিক পরিকল্পনা। হয়েলের এই ধ্যানধারণা অনেকের হাস্যকর মনে হয়। স্যার হ্যারি ক্রোটো মনে করেন নোবেল কমিটি ঠিক কাজই করেছে। তা নাহলে, হয়েল হয়ত তাঁর নোবেল খ্যাতিকে কাজে লাগাতেন নিজের বিশ্বাস অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার জন্য। 

তাহলে কি ব্যক্তির ভূমিকা বড় হল নোবেল (না) পাওয়ার ক্ষেত্রে? বিজ্ঞান নয়?

 তাহলে কি ব্যক্তির ভূমিকা বড় হল নোবেল (না) পাওয়ার ক্ষেত্রে? বিজ্ঞান নয়? যে পথ ধরে অন্য বিজ্ঞানীরা নোবেল পেলেন, তারই যিনি পথদ্রষ্টা তিনিই বঞ্চিত হলেন। কি অদ্ভুত পরিহাস। আজ যে বিগ ব্যাং তত্ত্বকে আমরা স্বীকার করে নিচ্ছি, তা কি একশো শতাংশ সঠিক? ফ্রেড হয়েল কি এতটাই অবিবেচক যে, বিজ্ঞানসম্মতভাবে যে তত্ত্ব সত্যি, তাকে তিনি অগ্রাহ্য করবেন। উনি হয়ত স্থিতাবস্থা তত্ত্বকে বিশ্বাস করেছেন, তার জন্য মৌলসৃষ্টির ক্ষেত্রে ওনার যে অবদান তা তো আর ছোট হয়ে যাচ্ছেনা। 

এখানে লর্ড মারটিন রিস-এর মন্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ। উনি মনে করেন, তারাদের ব্যাপারে যে অন্তর্দৃষ্টি, বা তাঁর এই ব্রহ্মাণ্ডে মৌলসৃষ্টির যে গবেষণা, তা বিংশ শতাব্দীর জ্যোতির্বিজ্ঞানে এক মহান অবদান। শুধু তাঁর ছাত্র বা সহকর্মীরা নয়, হয়েলকে শ্রদ্ধা এবং কৃতজ্ঞতার সঙ্গে মনে রাখবে বিশ্বের অধিকাংশ বিজ্ঞানী। 

(চিত্রসূত্র:  https://scienceblogs.com/startswithabang/2009/06/23/the-last-100-years-1950s-the-t)

—————————————————————————– 

লেখক পরিচিতিঃ প্রাক্তন বিজ্ঞানী, ভাবা পরমাণু গবেষণা কেন্দ্র, মুম্বাই।  

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।