বিজ্ঞানের খবর: পৃথিবীর মধ্যমণ্ডলকে (ম্যান্টেল) বিজ্ঞানীদের আরেকটু স্বচ্ছভাবে দেখালো আফ্রিকার এই হীরে

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
440 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

 

 

~ কলমে কিঞ্জল গাঙ্গুলী ~

চিত্র: বোট্স্বানার এই হীরের অভ্যন্তরে পাওয়া গেছে ডেভমাওআইট-এর স্ফটিক

পৃথিবীর গভীর অভ্যন্তর থেকে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করলেন একটি নতুন খনিজপদার্থ যা এর পূর্বে ভূ-পৃষ্ঠে খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয় বলেই অনুমান করেছিলেন ভূতত্ত্ববিদরা। এই নতুন খনিজপদার্থটি, যার নাম দেওয়া হয়েছে ডেভমাওআইট বা Davemaoite (বিশিষ্ট ভূ-পদার্থবিজ্ঞানী হো-কোয়াং (ডেভ) মাও এর নামে), CaSiO3  রাসায়নিক গঠনের প্রথম উচ্চ-চাপ খনিজপদার্থ বলে ঘোষণা করেছেন বিজ্ঞানীরা। এই স্ফটিক গঠনের ভূতাত্ত্বিক নাম পেরোভস্কাইট (perovskite)।

 

সাধারণ CaSiO3, যার বৈজ্ঞানিক নাম ওলাস্টোনাইট, সারা পৃথিবীতেই পাওয়া যায় কিন্তু ডেভমাওআইট-এর বিশেষত্ব হল এর স্ফটিকের কাঠামো, যা তৈরী হওয়ার জন্য যে অত্যন্ত উচ্চমাত্রার চাপ এবং তাপমাত্রা প্রয়োজন তা কেবল পৃথিবীর ১৫০-২০০ কিমি ও আরো গভীরে বিদ্যমান। পৃথিবীর অভ্যন্তরের এই স্তরের দুটি ভাগ : ১১০-৪১০ কিমি এর  নাম অশক্তমণ্ডল (asthenosphere) যা গলিত পাথর দিয়ে তৈরী ও ৪১০-২৯০০ কিমি এর নাম মধ্যমণ্ডল (mantle) যা কঠিন পাথর দ্বারা গঠিত। পৃথিবীতে প্রাকৃতিক উপায়ে হীরে (কার্বন দ্বারা গঠিত একটি স্ফটিক) তৈরী হওয়া সম্ভব এই অশক্তমণ্ডল ও মধ্যমণ্ডলে। এখানকার তাপমাত্রা ও চাপ এতটাই বেশি যে পাথরের অভ্যন্তরীণ কার্বন গলিত পাথরের অথবা ফ্লুইডের (তরল এবং বাস্পীয় পদার্থের সংমিশ্রণ) সাথে বেরিয়ে আসে। এর থেকেই তৈরী হয় হিরে এবং অন্যান্য পেরোভস্কাইট গঠনের স্ফটিক। এরকম ভাবেই গড়া একটি ক্ষুদ্র হীরের স্ফটিকের ভিতরে ডেভমাওআইট আবিষ্কার করলেন অলিভার শাওনের, নেভাডা ইউনিভার্সিটিতে কর্মরত খনিজপদার্থবিদ, ও তার সহকর্মীরা।

 

পৃথিবীর অশ্মমণ্ডলে এবং মধ্যমণ্ডলে প্রভূত ডেভমাওআইট-এর অস্তিত্বের সম্ভবনা বহুদিন আগে থেকেই অনুমান করেছেন বিজ্ঞানীরা। যদিও তার কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়নি এর পূর্বে। এর প্রধান কারণ হল এই খনিজপদার্থের স্ফটিক গুলো যত ভূ-পৃষ্ঠের দিকে উঠে আসে তত চাপের মাত্রা কমতে থাকে এবং দ্রুত তাদের স্ফটিকের গঠনে পরিবর্তন ঘটে। ফলে ডেভমাওআইট ভেঙে নতুন আরও স্থিতিশীল খনিজপদার্থে রূপান্তরিত হয়ে। তবে হীরে, তাদের স্ফটিক গঠনের কারণে, চাপ কমা সত্ত্বেও এই ভাঙ্গন প্রক্রিয়া এড়িয়ে যেতে পারে। ফলে আফ্রিকার বোট্স্বানা থেকে উদ্ধার করা এরকম একটা হীরের মধ্যে অক্ষত অবস্থায় ডেভমাওআইট-এর স্ফটিক পেলেন বিজ্ঞানীরা।

 

প্রায় ৬৬০ কিমি গভীরতায়, মধ্যমণ্ডলে তৈরী এই হীরের ভেতরে থাকা  ডেভমাওআইট-এর স্ফটিক অত্যন্ত ক্ষুদ্র (কয়েক মাইক্রোমিটার, অর্থাৎ ০.০০০০০১ মি)। এই  কারণে এই স্ফটিকের সঠিক রাসায়নিক গঠন জানতে শাওনের-রা ব্যবহার করেছেন সিঙ্ক্রোট্রন এক্স-রে ডিফ্র্যাক্সান নামক এক বিশ্লেষণাত্মক পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে একটি সূক্ষ্ম উচ্চ-তেজের এক্স-রের রশ্মি অত্যন্ত নিখুঁত ভাবে নিক্ষেপ করা হয় হীরেটির বিভিন্ন জায়গায়। প্রতিফলিত রশ্মির কোণ এবং তীব্রতা নিরীক্ষণ করে গবেষকরা জানতে পারেন হীরের ভেতর থাকা এই বস্তুর রাসায়নিক এবং স্ফটিক কাঠামো।

 

ডেভমাওআইট ও এর মতো অন্যাণ্য খনিজপদার্থের একটি বড় ভূমিকা আছে পৃথিবীর মধ্যমণ্ডলের  ভূ-রসায়নে। গবেষকদের অনুমান যে এই খনিজপদার্থগুলোর মধ্যে আছে খুব সামান্য পরিমাণে (ট্রেস কন্সেন্ট্রেশন) বিভিন্ন মৌলিক পদার্থ। এদের মধ্যে ইউরেনিয়াম ও থোরিয়ামের মতো মৌলিক পদার্থ তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের মাধ্যমে তাপ ছাড়ে। এই কারণে গবেষকরা মনে করেন ডেভমাওআইট মধ্যমণ্ডলের প্রচন্ড তাপের এক বড় অবদানকারী পদার্থ। এছাড়াও হীরের ভেতর এই ডেভমাওআইট আবিষ্কার, পৃথিবীর মধ্যমণ্ডলে হীরে তৈরী হওয়ার সম্ভাব্য গভীরতার অনুমান আরও বাড়িয়ে দিয়েছে এবং এইরকম গভীরতায় তৈরী হওয়া হীরের মধ্যে খুঁজলে আরো সদৃশ খনিজপদার্থ আবিষ্কার সম্ভব  বলে জানালেন শাওনের।

 

এই আবিষ্কারের গুরুত্ব সম্বন্ধে, ওয়াশিংটন ডিসির কার্নেগি ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্সের ভূ-পদার্থবিজ্ঞানী ইংওয়েই ফে (যিনি শাওনেরদের কাজের সাথে যুক্ত নন) জানাচ্ছেন “শাওনের এট. অল. দের কাজ এরকম আরও দুষ্কর উচ্চ্-চাপ স্ফটিক আবিষ্কারের আশা বাড়িয়ে দিল। পৃথিবীর গভীর অলভ্য স্তরগুলোয় বিদ্যমান খনিজপদার্থের আবিষ্কার, মধ্যমণ্ডলের রাসায়নিক গঠন সম্বন্ধে আমাদের বর্তমানের অত্যন্ত সীমিত জ্ঞানের বৃদ্ধি ঘটাবে বলেই আশা করা যায়।”

চিত্রসূত্র: Aaron Celestian, Natural History Museum of Los Angeles County.

____________________________________________________

লেখক পরিচিতি: কিঞ্জল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূতত্ত্ব-তে স্নাতকোত্তর। পড়াশোনার বাইরে ননফিক্শন পড়া, থিয়েটার দলে নাটক এবং নতুন ভাষা শেখায় আগ্রহী।

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।