সাপের বিষ থেকে আবিষ্কার হল প্রেশারের ওষুধ

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
467 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

 

~ কলমে এলেবেলে নির্মাল্য ~ 

বেশিদিন আগের কথা নয়। এই ১৯৫০ সালেও লোকে মনে করত হাইপার টেনশান বা হাই প্রেশার খারাপ কিছু নয়। এ হল শরীরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। শরীরে বেশি রক্ত পাম্প করার দরকার তাই হৃদপিণ্ড তাই করছে। এ নিয়ে এত মাথা ঘামাবার দরকার নেই। এ হল হাই তোলার মতই এক স্বাভাবিক ব্যাপার। এমনকি একে কমাবার চেষ্টা করলে তা রোগীর জন্য মারাত্মক হতে পারে। শরীরের জন্য এই উচ্চ রক্তচাপ ‘অপরিহার্য্য’ (“Essential Hypertension”)। যেকারণে অ্যামেরিকার রাষ্ট্রপতি ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্টের উচ্চ রক্তচাপ থাকলেও, সে নিয়ে চিকিৎসকরা বিশেষ মাথা ঘামাননি এবং যথারীতি রুজভেল্ট স্ট্রোকে মারা যান। তা সত্ত্বেও উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ বানাবার চেষ্টাও ছিলনা কোনদিকে। 

তাও ওষুধ আবিষ্কার হয়েই গেল। মার্ক কোম্পানি রক্তের অম্লতা কমাবার ওষুধ নিয়ে গবেষণা করছিল। কিডনি ও ফুসফুসের সমস্যায় রক্তের অম্লতা বেড়ে যায়, এর ফলে নানাবিধ শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। খুব বেশি বেড়ে গেলে রোগী কোমায় চলে যায়। আর এই অম্লতা নিয়ন্ত্রণ করে Carbonic anhydrase নামে একটি উৎসেচক। মার্ক গবেষণায় টাকা ঢালছিল— Carbonic anhydrase উৎসেচকের কাজ বন্ধ করতে পারে এমন একটা ওষুধ। ওষুধ একটা বেরোল। কিন্তু তার একটা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও দেখা গেল। সেই ওষুধ খেলে রোগীকে ঘন ঘন ‘মূত্র বিসর্জন’ করতে হচ্ছে। অর্থাৎ এর মধ্যে ডাইউরেকটিক বৈশিষ্ট্য দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সাথে দেখা গেল, এই ঘন ঘন মূত্রত্যাগের কারণে রক্তে জলের অংশ কমছে, তাই হৃদপিণ্ডকে কম প্লাম্প করতে হচ্ছে, ফলে প্রেশার কমে যাচ্ছে। যদিও সেসময় প্রেশার নিয়ে কেউ মাথা ঘামাত না, আগেই বললাম। এই Carbonic anhydrase পন্ডকারী ওষুধ খুঁজতে খুঁজতে মার্ক পেয়ে গেল Diuril নামে একটা ওষুধ। এটা Carbonic anhydrase এ দেখা গেল কিছু করতে পারেনা, কিন্তু ডাইউরেকটিক হিসেবে জবরদস্ত আর রক্তচাপ কমাতেও ভারী কার্য্যকরী। 

মার্কের দেখাদেখি অন্যান্য কোম্পানিও কপি করে করে thiazide গ্রুপের ওষুধ বানাতে লাগল। এই করে মার্কের Diuril-র পরপরই বেশ কয়েকটি ওষুধ বাজারে এসে গেল। তখনও সামান্য কয়েকজন চিকিৎসক ছাড়া প্রেশার কমাবার ওষুধ কেউ দিতে চাইতেন না। এসময় সেই এপিডেমোলজিকাল গবেষণায় উঠে এল স্ট্রোকের সাথে উচ্চ রক্তচাপের সম্পর্ক আছে। কিন্তু সম্পর্কটা নিছক সম্পর্ক (Correlation) না স্ট্রোকের কারণ (Cause), সেটা নিয়ে তখনও সংশয় ছিল। অনেক চিকিৎসক সেটা মানলেনও না। তাঁদের মতে উচ্চ রক্তচাপ আর স্ট্রোক দুটোই বার্ধ্যক্যের ফল। এ নিয়ে কিছু করার নেই। অ্যামেরিকার FDA দেখল, এই Correlation না Cause এই সংশয় থেকে মুক্তি পেতে হলে উচ্চরক্তচাপ না কমিয়ে উপায় নেই। thiazide গ্রুপের ওষুধ রক্তচাপ কমাচ্ছে, আবার সেরকম কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছেনা, রোগীর জন্যেও নিরাপদই। তাই ভেবেচিন্তে FDA চিকিৎসকদের উচ্চরক্তচাপে thiazide গ্রুপের ওষুধ ব্যাবহার করতে বলল। ফল মিলল হাতেনাতে। প্রথম ক’বছরের মধ্যেই দেখা গেল thiazide ব্যবহার করে স্ট্রোকের সংখ্যা অনেক কমে এসেছে। ১৯৫৫ থেকে ১৯৮০, এই পঁচিশ বছরে অ্যামেরিকায় স্ট্রোকের ঘটনা চল্লিশ শতাংশ কমে গিয়েছিল। বোঝা গেল উচ্চরক্তচাপ অপরিহার্য্য নয়, বরং ক্ষতিকর। ততদিনে বাজারের গন্ধ পেয়ে ওষুধ কোম্পানিরা তেড়েফুঁড়ে লেগেছে ডাইইউরেকটিকের বদলে সত্যিকারের প্রেশার কমানোর ওষুধ তৈরিতে। কারণ ডাইউরেটিকের প্রভাব সীমিত, সাথে বারবার টয়লেট যাবার তাড়না। এদিকে ঠিকঠাক একটা ওষুধ বানাতে পারলে, সেই ওষুধ রোগীকে সারাজীবন খেয়ে যেতে হবে। কিন্তু বললেই তো আর বানানো যায়না। সময় লাগে, আর লাগে এক যাদুকর। এরকম এক যাদুকর জেমস ব্ল্যাক। 

অ্যাড্রিনালিন হর্মোণের কথা আমরা সবাই জানি। ভয় পেলে, কি মারপিট করতে হলে, কিংবা প্রথম প্রথম প্রেমে পড়লে যে হর্মোণ রক্ত সঞ্চালন বাড়িয়ে দেয়, হৃদপিণ্ড ধক ধক করতে থাকে, সেই হর্মোণ হল অ্যাড্রিনালিন। অ্যাড্রিনালিন আমাদের রক্তচাপেরও নিয়ন্ত্রক। স্কটিশ বিজ্ঞানী জেমস ব্ল্যাক বেশ কিছুদিন অ্যাড্রিনালিন নিয়ে কাজ করছিলেন। ওঁর মনে হল, অ্যাড্রিনালিনের ক্রিয়াকলাপ বন্ধ করা গেলে নিশ্চয়ই রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। উনি ওঁর এই idea নিয়ে প্রফেসারি ছেড়ে যোগ দিলেন ICI নামে এক ব্রিটিশ কোম্পানিতে। এখন মুশকিল হল, কোষে আড্রিনালিনের দুটো প্রোটিন গ্রাহক থাকে আলফা আর বিটা, যেখানে আড্রিনালিন বসে আর তার কর্ম করে। রক্তচাপের ক্ষেত্রে বিটারই মুখ্য ভূমিকা। তাই বিটা গ্রাহকে আর আড্রিনালিনের বসাটা আটকানো বা ব্লক করাই লক্ষ্য এখন। কাজটা কঠিন, কারণ আলফা আর বিটার মধ্যে বড্ড মিল। কিন্তু চেষ্টা চরিত্তির করে ১৯৬৪ সালে জেমস বানিয়ে ফেললেন প্রথম বিটা-ব্লকার Propranolol, যার ঘন ঘন টয়লেট যাবার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। ১৯৬০–৭০ এর দশকে Propranolol চুটিয়ে ব্যবসা করল। এই অনবদ্য কাজের জন্য ১৯৮৮ সালে জেমস নোবেল পেলেন।

১৯৬৪ সালে জেমস বানিয়ে ফেললেন প্রথম বিটা-ব্লকার Propranolol, যার ঘন ঘন টয়লেট যাবার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। ১৯৬০–৭০ এর দশকে Propranolol চুটিয়ে ব্যবসা করল। এই অনবদ্য কাজের জন্য ১৯৮৮ সালে জেমস নোবেল পেলেন।

কিন্তু Propranolol-র একটা বড় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা গেল। আড্রিনালিন বিটা গ্রাহকের মাধ্যমে ফুসফুসে রক্তসঞ্চালনও নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে কারো কারো ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট দেখা গেল। হাঁপানির রোগীদের জন্য তো Propranolol ব্যবহার বেশ বিপজ্জনকই সাব্যস্ত হল। এদিকে অনেক পুরুষের ক্ষেত্রে আরেকটা মানসিক সমস্যার কারণ হল। কারণটা হল লিঙ্গ শিথিলতা। ফলে বিটা-ব্লকারে কাজ হলেও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ভয় রয়েই গেল। খোঁজ শেষ হলনা তাই এখানে। যদিও এখন নতুন অনেক বিটা-ব্লকার এসেছে আরও গবেষণার মাধ্যমে। 

এই দুজন পিট ভাইপার শ্রেণীর সাপের বিষ নিয়ে খুব উৎসাহী হয়ে উঠলেন। কারণ, এই পিট ভাইপারদের বিষে, আক্রান্তের রক্তচাপ কমে যায়। ওঁরা ভাবলেন, যদি এদের বিষ থেকে সেই জিনিসটা আলাদা করা যায়, তবে একটা ওষুধ বানাবার চেষ্টা করা যেতে পারে।

Squibb বলে এক কোম্পানিতে ছিলেন এক কেমিস্ট, খুব ধীর স্থির, গোছানো, কেমিস্ট্রিঅন্ত প্রাণ Miguel Ondetti, আর তাঁর বন্ধু আড্ডাবাজ, এর ওর পেছনে লেগে বেড়ানো, কমিক্সঅন্ত প্রাণ ফার্মাকোলজিস্ট Dave Cushman। এই দুজন পিট ভাইপার শ্রেণীর সাপের বিষ নিয়ে খুব উৎসাহী হয়ে উঠলেন। কারণ, এই পিট ভাইপারদের বিষে, আক্রান্তের রক্তচাপ কমে যায়। ওঁরা ভাবলেন, যদি এদের বিষ থেকে সেই জিনিসটা আলাদা করা যায়, তবে একটা ওষুধ বানাবার চেষ্টা করা যেতে পারে। তাঁরা Teprotide বলে একটা যৌগ সেই বিষ থেকে আলাদা করলেন। দেখলেন, এই Teprotide মানুষের ACE1 (angiotensin converting enzyme 1) প্রোটিন উৎসেচকের কাজে বাধা দেয়। আড্রিনালিন রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করলেও, এই ACE1 হল রক্তচাপের নিয়ন্ত্রণের অন্যতম হত্তাকত্তা বা “Master Controller”। তাই ACE-র কাজ আটকালে রক্তচাপও কমে যায়। পিট ভাইপারের বিষও এভাবেই কাজ করে।

কিন্তু Teprotide বড়ি হিসেবে তো খাওয়া যাবেনা, কারণ পাকস্থলীতে গেলেই এটা হজম হয়ে যায়। তাহলে কি রোজ দিনের পরদিন সূচ ফুটিয়ে Teprotide ঢোকাতে হবে রুগীর দেহে। কিন্তু এতে কেউ রাজি হবেই বা কেন? আর রাজি হলেও এর জন্য যে স্ট্রেস হর্মোণ বেরোবে, তা’তে উল্টো বিপদ। বড়ি বানাতে না পারলে এর কোন ভবিষ্যৎ নেই। 

তখন মিগুয়েল আর ডেভ Teprotide জাতীয় কয়েকশো যৌগ তৈরি করলেন ল্যাবে। এর মধ্যে একটিকে তাঁদের মনে ধরল, যা পাকস্থলীতে হজম হয়ে যাবেনা। নাম দিলেন Captopril।

তখন মিগুয়েল আর ডেভ Teprotide জাতীয় কয়েকশো যৌগ তৈরি করলেন ল্যাবে। এর মধ্যে একটিকে তাঁদের মনে ধরল, যা পাকস্থলীতে হজম হয়ে যাবেনা। নাম দিলেন Captopril। মিগুয়েল আর ডেভ তো মহা খুশি। কিন্তু তাঁদের কোম্পানি Squibb একটুও খুশি হলনা। কারণ, Squibb তখন বিটা ব্লকার Nadolol বেচে প্রচুর আয় করছে। তারা ভাবল, Captopril আসা মানে Nadolol-র বাজার লাটে উঠল। Captopril হয়তো ভবিষ্যতে লাভ দেবে, কিন্তু Nadolol ছেড়ে এই মুহুর্তে Captopril-র ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে গুচ্ছ পয়সা লাগাবার কোন অর্থই হয়না। মিগুয়েল আর ডেভের বুক ভরা আশা ধুক করে নিভে গেল। কিন্তু এত পরিশ্রম ভাবনা তবে সব কি জলাঞ্জলি দেবেন? ওঁরা বললেন, ওষুধ বের না করলেও ওঁদের পেপার ছাপতে দেওয়া হোক অন্তত, যাতে এই আবিষ্কারের কৃতিত্বটুকু অন্তত ওঁরা পান। Captopril-র পেটেন্ট Squibb থাকায়, কোম্পানি ছাপাবার অনুমতি দিল। ভাবল, বেচারারা এত খাটাখাটনির একটু দাম পাক। 

এদিকে কয়েকটি বিখ্যাত জার্ণালে তাঁদের কাজ প্রকাশ মাত্র একাডেমিয়া জুড়ে একটা হইচই শুরু হল। সবাই ভাবল Squibb তাহলে এবার ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু করবে। অনেক চিকিৎসক Squibb-র সাথে যোগাযোগ করলেন, এই ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে আগ্রহী হয়ে। Squibb-র হত্তাকত্তারা দেখলেন, লোকে না জেনেই তাঁদের গাছে তুলে দিয়েছে। এবার চুপচাপ বসে থাকা ব্যবসার জন্য ভাল কথা নয়। এভাবে একাডেমিয়ার অত্যুৎসাহে, কোন কোম্পানির শিকেয় তুলে রাখা প্রকল্প আবার চালু করার এরকম নিদর্শন বোধহয় ইতিহাসে খুব বেশি নেই। ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শেষে দেখা গেল, Captopril একটি নিরাপদ ও অনবদ্য রক্তচাপ কমাবার ওষুধ। ১৯৮১ সালে FDA-র ছাড়পত্র পাবার পর Squibb খালি Captopril বেচেই এক বছরে এক বিলিয়ান ডলার কামিয়ে ফেলল, যা Squibb তার সব ওষুধ বেচেও কোনদিন কামাতে পারেনি। কিন্তু একটা অদ্ভুত কান্ড দেখা গেল, যার কোন ব্যাখ্যা মেলেনা সেভাবে। Captopril বিক্রি থেকে এত মুনাফা হলেও, Squibb-র শেয়ারের দর পড়তেই থাকল। শেষ পর্যন্ত, Squibb-কে প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানি Bristol Myers কিনে নেয়। নতুন ব্লকব্লাস্টার ড্রাগ তৈরি করেও বিদায় নিল Squibb। 

মিগুয়েল আর ডেভের কি হল? তাঁরা অনেক পুরস্কার-সম্মান পেয়েছেন এযাবৎ। ১৯৯৯ সালে বিখ্যাত ল্যাস্কার পুরস্কার পান। ভবিষ্যতে নোবেল পুরস্কারও হয়তো পেতে পারেন। 

এলোপাথাড়ি না খুঁজে দুজনে এই যে কম সময় ও কম খরচে কেমিস্ট্রি, বায়োকেমিস্ট্রি আর শারীরবিদ্যার পূর্বজ্ঞানের ভিত্তিতে নতুন ড্রাগ ডিজাইন করলেন, এই পদ্ধতির অধুনা গালভরা নাম Rational Drug Design। আর Captopril-র আবিষ্কার Rational Drug Design-র ক্ষেত্রে একটা দিকচিহ্ন।

কাহিনী সূত্র: The Drug Hunters: The Improbable Quest to Discover New Medicines by Donald R. Kirsch. 

 

2 thoughts on “সাপের বিষ থেকে আবিষ্কার হল প্রেশারের ওষুধ

  • December 11, 2021 at 3:16 pm
    Permalink

    আলফা রিসেপটারেরও কিন্তু বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে ব্লাডপ্রেশারের ব্যাপারে। আলফা ব্লকার তো অ্যান্টিহাইপারটেনসিভ হিসেবে ব্যবহার হয়।

    • December 11, 2021 at 7:16 pm
      Permalink

      আচ্ছা, এটা জানা ছিলনা। মানে আমিও অবশ্য এই আবিষ্কারের গল্প পড়ার সময়েই ব্যাপারগুলো জানলাম। সেখানে আলফা নিয়ে এরকমই লেখা আছে। কারণ সেসময় জেমস ব্ল্যাক বিটাকেই টার্গেট করেছিলেন। আলফা ব্লকার নিশ্চয়ই বেশ পরে এসেছে।

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।