শক্তি – দ্বিতীয় পর্ব

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
426 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

~কলমে স্বপ্নীলা রায়~

(আগের পর্ব)

  1. পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি উৎস: 
  2. i) জলবিদ্যুৎ: জলবিদ্যুৎ হল সেই শক্তি যা প্রবাহমান জলের শক্তি থেকে উৎপন্ন হয়। এটি একটি পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি উৎস কারণ এটি পর্যায়ক্রমে জলচক্রের মাধ্যমে পরিপূর্ণ ভাবে সঞ্চয় করা যায়। জল যখন প্রচণ্ড গতিবেগে কোনো টারবাইনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়, তখন জলের গতিশক্তি যান্ত্রিক শক্তিতে পরিণত হয়। এই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে শস্য পেষাই করা, স-মিল চালনা, জলের মোটর চালানো যায় এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। 

যদিও জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক ব্যয়বহুল, তবে পরবর্তীকালে দীর্ঘকালীন মেয়াদে স্বল্প ব্যয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। কারণ শক্তির উৎস হিসেবে প্রবাহমান জল প্রকৃতিতে বিনামূল্যে পাওয়া যায়।

জলবিদ্যুতের সুবিধা: 

  1. i) পরিবেশ দূষণ হয় না এবং অনেক বেশি নিরাপদ।
  2. ii) মূল উৎস জলকে সহজেই সংরক্ষণ করা যায় বা বড় বড় জলাধার নির্মাণ করে সঞ্চয় করে রাখা যায়। এছাড়া প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম জলপ্রপাত জলবিদ্যুতের অফুরন্ত শক্তির উৎস। 

iii) জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবহারের ফলে কয়লা, তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস (যেগুলি একসময় নিঃশেষ হয়ে যাবে) যথেচ্ছভাবে ব্যবহার না করে সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করা যাবে। 

জলবিদ্যুতের অসুবিধা:

  1. i) প্রাথমিক পর্যায়ে বাঁধ নির্মাণ করতে প্রচুর পরিমাণ মূলধনের প্রয়োজন।
  2. ii) বাঁধ এবং জলাধার নির্মাণ করে কৃত্রিম জলপ্রপাত তৈরি করার ফলে পরিবেশের ওপর লক্ষণীয় প্রভাব পড়ে। 

iii) জলবিদ্যুৎ সেখানেই উৎপাদন করা যায় যেখানে উৎস হিসাবে জলের প্রাচুর্য রয়েছে।

জলবিদ্যুতের চাহিদা: সারা বিশ্বে প্রতি বছর মোট শক্তির প্রায় এক পঞ্চমাংশ জলবিদ্যুৎ থেকে পাওয়া যায়। এটি সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি উৎস। সারা বিশ্বে জলবিদ্যুৎ থেকে উৎপন্ন বিদ্যুতের পরিমাণ সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, জৈবনিক ভর এবং অন্যান্য সমস্ত পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি উৎস থেকে উৎপন্ন বিদ্যুতের তুলনায় অনেক বেশি।

 *) তরঙ্গ শক্তি: এক বিশেষ পদ্ধতিতে তরঙ্গসমূহকে একই অভিমুখে কেন্দ্রীভূত করে চালনা। করে তরঙ্গের আকার ও শক্তি বৃদ্ধি করা হয়। যাতে ওই তরঙ্গসমূহ টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। বায়ুশক্তি, পাম্প, ভূগর্ভস্থ জল নিষ্কাশন ইত্যাদি অনেক কাজে প্রযুক্তিগত উন্নতিগুলি কাজে লাগানো হয়। 

*) প্রবাহী শক্তি: প্রবাহী শক্তির একটি উৎস— বাঁধ নির্মাণ করে গেটের মধ্য দিয়ে জলের তল ও জলের প্রবাহমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। জোয়ারের সময় জল প্রবাহিত হয় এবং জলাধার পূর্ণ হয়ে যায়। পুনরায় যখন জল উপর থেকে নীচের দিকে প্রবাহিত হয়, তখন বেশ কিছু সাহায্যে চালিত হয়ে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়।

  1. ii) জৈব জ্বালানী: জৈব জ্বালানী যেমন ইথানল হল স্বচ্ছ জ্বলনশীল ও জৈব পচনশীল পদার্থ এবং যা পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি উৎস থেকে তৈরি হয়। এছাড়া জৈব জ্বালানী পরিবহন শিল্পে জ্বালানী হিসেবে ব্যবহৃত হয়। জৈব জ্বালানী থেকে মিথেন গ্যাস ও তাপশক্তি উৎপন্ন করা যায় এবং এটিকে অন্যান্য শক্তিতে রূপান্তরিত করা যায়।

*) উৎপাদন: ট্রান্সএস্টারিফিকেশন পদ্ধতির দ্বারা বেশির ভাগ জৈব জ্বালানী উৎপন্ন করা হয়। এই পদ্ধতিতে গ্লিসারিনকে প্রাণীজ চর্বি বা ভোজ্য তেল থেকে পৃথক করা হয়। অবশিষ্ট হিসাবে পড়ে থাকে মিথাইল এস্টার, যার রাসায়নিক নাম বায়ো ডিজেল এবং গ্লিসারিন। 

রান্নার চর্বি বা তেল, ভোজ্য তেল বা প্রাণীজ চর্বির সঙ্গে অ্যালকোহল মিশিয়ে জৈব জ্বালানী তৈরি করা হয়। ইথানলের মত জৈব জ্বালানীকে অতিরিক্ত সংযােজন হিসেবে যানবাহনের দূষণ নিয়ন্ত্রণের কাজে ব্যবহার করা হয়।

ফারমেনটেশান বা সন্ধান প্রক্রিয়ায় শ্বেতসার বা শর্করা জাতীয় শস্য, যেমন চিনি, যব বা বার্লি, ভুট্টা, আলু, চাল, সূর্যমুখী, গম, সুগারবীট এবং অন্যান্য শস্য থেকে ইথানল প্রস্তুত করা হয়। 

*) সামুদ্রিক শৈবাল থেকে সৃষ্ট জ্বালানী: বিজ্ঞানীদের ধারণা অনুযায়ী, সালোকসংশ্লেষকারী শৈবালের মধ্যে এক বিশেষ সুবিধা থাকার দরুণ এরা বিকল্প জ্বালানী হিসেবে কাজ করতে পারে।

  1. a) সামুদ্রিক শৈবালরা ফ্যাট, লিপিড কোষ তৈরি করে। এই কোষের মধ্যে এক ধরণের তেল থাকে, যেটা জ্বালানী হিসাবে ব্যবহৃত হয়।
  2. b) বাড়ন্ত বা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত সামুদ্রিক শৈবালরা কার্বনডাই অক্সাইড গ্রহণ করে ও গ্রীনহাউস গ্যাস ত্যাগ করে। 
  3. c) যে সব জায়গা উদ্ভিদ ও কৃষিশস্য উৎপাদনের পক্ষে অনুপযুক্ত, সেই সব জায়গায় শৈবাল জন্ম নেয় এবং বৃদ্ধি পায়। কৃষিশস্য বা অরণ্যের পরিবর্তে এই সব জায়গায় এক ধরণের শৈবাল উৎপাদন করা হয়, যা জৈব জ্বালানীর অন্যতম সুবিধাজনক দিক।
  4. d) প্রতি একরে জৈব জ্বালানী তৈরি করতে অন্যান্য উৎসের তুলনায় শৈবালদের ভূমিকা অনেক বেশি। 

*) আখ থেকে তরল জ্বালানী প্রস্তুত হয়। 

*) কোপাইফেরা ল্যাঙ্গসডোরফি থেকে ডিজেল জ্বালানী প্রস্তুত করা হয়। 

*) বোট্রিককাস ব্রাউনি হল এককোষী শৈবাল, যা থেকে ৭৫ শতাংশ শুষ্ক হাইড্রোকার্বন প্রস্তুত হয়।

*) ব্যবহার: জৈব জ্বালানী সুগন্ধী দ্রব্য, আঠালো পদার্থ প্রস্তুতিতে দ্রাবক হিসাবে ব্যবহৃত হয়। রোগজীবাণু বিনাশকারী পদার্থ হিসাবে, ঔষধ প্রস্তুতিতে, গ্যাসোলিনের নির্গমনের মান উন্নত করতে জৈব জ্বালানী ব্যবহৃত হয়।

iii) জৈব গ্যাস: জৈব গ্যাস হল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি উৎস। এটি এক বিশেষ পদ্ধতিতে বিভিন্ন আবর্জনা থেকে তৈরি করা হয়। এছাড়া অক্সিজেন বর্জনকারী ব্যাকটেরিয়াকে পরিপাক করে অথবা ফারমেনটেশান বা সন্ধান প্রক্রিয়ায় জৈব পচনশীল বস্ত যেমন সার, নর্দমার আবর্জনা ইত্যাদি, জৈব গ্যাস প্রস্তুত করা হয়। জৈব গ্যাস হল প্রাথমিক ভাবে কার্বনডাই অক্সাইড, মিথেন ও সামান্য পরিমাণ হাইড্রোজেন সালফাইড, জলীয় বাষ্প প্রভৃতির মিশ্রণ। মিথেন, হাইড্রোজেন, কার্বন মনোঅক্সাইডকে অক্সিজেনের সঙ্গে দহন করা হয়। এই দহনের ফলে যে শক্তি উৎপন্ন হয় সেটাই জ্বালানী হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই জ্বালানী রান্নার কাজে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। জৈব গ্যাস থেকে উপজাত দ্রব্য হিসেবে মূল্যবান রাসায়নিক সার পাওয়া যায় যা কৃষিকাজে ব্যবহৃত হয়। এই সারে বেশি মাত্রায় অক্সিজেন, ফসফরাস ও পটাশিয়াম থাকে। জৈব গ্যাস প্রস্তুতিতে প্রধানত ৩০–৩৫ ডিগ্রী তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়। গোবর গ্যাসের তুলনায় জৈব গ্যাসের তাপীয় কার্যকারিতা ৬০ শতাংশ বেশি। 

*) উৎপাদন:

বায়োগ্যাস সাধারণত ব্যবহারিক ক্ষেত্রে ল্যান্ডফিল গ্যাস বা ডাইজেসটেড গ্যাস হিসাবে উৎপন্ন হয়। বায়োগ্যাস উৎপাদন কেন্দ্র প্রায়ই অ্যানারোবিক ডাইজেসটারের নামে হয়।

*) জৈব গ্যাস কেন্দ্রের অসুবিধা:

ফার্মের ক্ষেত্রে: 

  1. a) স্বয়ং সম্পূর্ণভাবে ও স্থিতিশীলভাবে বিদ্যুৎ এবং তাপশক্তি উৎপাদন করা।
  2. b) সস্তায় ও স্বল্পব্যয়ে শক্তি উৎপাদন করা যায়, যা দীর্ঘকালীন মেয়াদে অর্থনৈতিক ভাবে সাশ্রয়কারী। 

*) অরণ্যের বাইরের অংশ এবং দূরবর্তী স্থানে:

  1. a) প্রাণীদেহ থেকে নির্গত দুষিত ও বর্জ্য পদার্থ সুনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার মাধ্যমে কাজে লাগানোর ফলে স্থানীয় পরিবেশ এবং জলসম্পদ কম মাত্রায় দূষিত হয়। 
  2. b) জৈব গ্যাস উৎপাদন কেন্দ্রে এই পদ্ধতিতে জীবাণুর মৃত্যু হওয়ায় প্রাণীদেহ থেকে নির্গত দূষিত বর্জ্য পদার্থ এবং রোগজীবাণু ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা কমে যায়।

*) জৈব গ্যাস উৎপাদন কেন্দ্রের সুবিধা: জৈব গ্যাস উৎপাদনের মাধ্যমে শক্তির প্রয়োজনীয়তার ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা সম্ভব। পরিবেশগত দিক থেকে জৈব গ্যাস উৎপাদনের ও ব্যবহারের ফলে জীবাশ্ম জ্বালানীর ব্যবহার এবং তা থেকে নির্গত কার্বনডাই অক্সাইডের মাত্রা কিছুটা কমেছে। জৈব গ্যাস উৎপাদন কেন্দ্র থেকে মিথেন গ্যাসের নির্গমন নিয়ন্ত্রিত এবং কমানো হয়। মিথেন হল এমনই এক গ্রীনহাউস গ্যাস যা কার্বনডাই অক্সাইডের তুলনায় ২০ গুণ বেশি ক্ষতিকারক। জৈব গ্যাস একটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং দূষণমুক্ত শক্তি উৎস। জৈব গ্যাস থেকে উন্নত সমৃদ্ধ সার পাওয়া যায়। জৈব গ্যাস উৎপাদনের মাধ্যমে স্থানীয় জল নিকাশী ও আবর্জনা দূরীকরণ ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নতি ঘটানো যায়। জৈব গ্যাস উৎপাদন কেন্দ্রগুলি ভারতীয় কৃষকদের কাছে এক আশীর্বাদস্বরূপ কারণ জৈব গ্যাস উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাথমিক উপাদানসমূহ প্রকৃতিতে সহজলভ্য। জৈব গ্যাস উৎপাদন কেন্দ্র থেকে যে দুটি প্রধান উপজাত দ্রব্য পাওয়া যায় তা হল উন্নত সমৃদ্ধ সার এবং মিথেন (গোবর গ্যাস) গ্যাস। এই উন্নত সমৃদ্ধ সার কৃষকদের সারের প্রয়ােজনীয় চাহিদা মেটাতে অর্থনৈতিক ও কার্যকরীভাবে সহায়ক হয়। এর ফলে কৃষিকাজ এবং কৃষিজাত পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করে গােবর গ্যাসের বিস্তৃত ও ব্যাপক ব্যবহার, বর্তমানে ভারতবর্ষের অন্যতম তিনটি প্রধান সমস্যা— খাদ্য, সার এবং জ্বালানীর সমাধানে সহায়ক হবে।

*) ভারতে প্রতি বছর আনুমানিক ৬৫ কোটি টন গোবর সংগ্রহ করা হয়। 

*) একটি জৈব গ্যাস উৎপাদন কেন্দ্রে জৈব গ্যাস উৎপাদনে (চার কিউবিক মিটার) প্রতিদিন ১০০ কেজি তরল গোবর প্রয়োজন হয়।

  1. iv) সৌর শক্তি: অতি উচ্চ চাপ এবং তাপমাত্রায় পারমাণবিক বিক্রিয়ার ফলে যে শক্তি বিকিরণ প্রক্রিয়ায় নির্গত হয়, তাকেই সৌরশক্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। প্রকৃতিতে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে এই শক্তি পাওয়া যায়। সৌরশক্তিকে দুটি পদ্ধতিতে আমরা ব্যবহারিক প্রয়ােগ করতে পারি।

১) সৌরতাপ পদ্ধতি

২) সৌরবিদ্যুৎ পদ্ধতি 

সূর্যকিরণের তাপকে সরাসরি কাজে লাগিয়ে জল গরম করা বা শস্য শুকোনো যেতে পারে। এই পদ্ধতি প্রয়োগ করে সোলার কুকার (রান্নার জন্য), সোলার ড্রায়ার (শস্য শুকোনোর জন্য), সোলার ওয়াটার হিটার (জল গরম করার জন্য), সোলার ডিস্টিলেশন (অবিশুদ্ধ জল থেকে বিশুদ্ধ জল পৃথক করার জন্য), সৌর জলাশয় (জল গরম করার কাজে) বিভিন্ন যন্ত্র উদ্ভাবিত হয়েছে। দ্বিতীয় পদ্ধতিতে সৌরকোষ প্রধানত সিলিকন থেকে তৈরি হয়ে থাকে বলে একে সেল বলা হয়।

বর্তমানে কয়লা থেকে ১ ঘন্টায় ১ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে পরিমাণ ব্যয় হয়, সৌরশক্তি থেকে ওই একই পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে প্রায় ১০ গুণ বেশি ব্যয় হয়। উন্নতর প্রযুক্তি উদ্ভাবন করলে এই খরচ অনেকটাই কমানো যেতে পারে।

সৌর শক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং ব্যবহারিক প্রয়োগ: 

সৌরকোষের মাধ্যমে সূর্যের আলোকে তড়িৎ শক্তিতে রূপান্তরিত করা হয়। সৌরকোষ হল মূলতঃ আলোক তড়িৎকোষ। সৌরকোষগুলি সিলিকন দিয়ে তৈরি হয়। এই সিলিকন রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে যে যৌগ গঠন করে তা হল সিলিকা বা বালি। সিলিকনকে অতি উচ্চ তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করে গলিয়ে অতি পাতলা একপ্রকার বিস্কুট বা কেকের মত গঠন দিয়ে একটি কাঠামো তৈরি করা হয়। যখন সূর্যালোক সরাসরি সৌরকোষেরর ওপর পড়ে, তখন ইলেকট্রন বা ঋণাত্মক তড়িৎকণাগুলি শিথিল বা মুক্ত হয়ে সম্মুখভাগের পৃষ্ঠদেশের দিকে এগিয়ে যায়। এর ফলে সামনের ও পিছনের দুই প্রান্তের বা পৃষ্ঠদেশের মধ্যে বিভবের পার্থক্য তৈরি হয়। যেদিকে ইলেকট্রনের আধিক্য থাকে সেদিকে ঋণাত্মক বিভব এবং অপর দিকে ধনাত্মক বিভব গঠিত হয়। কোন পরিবাহী তার দ্বারা আলাদা বিভবযুক্ত দুই প্রান্তকে যুক্ত করলে তড়িৎ প্রবাহিত হয়। একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে জৈব জীবাশ্ম জ্বালানীর মাধ্যমে অনেক বেশি মাত্রায় পরিবেশ দূষণ হয়। আলোক তড়িৎকোষ বা সৌরকোষ তৈরির সময় সীসা এবং পারদের মত ক্ষতিকারক ধাতুর প্রয়োজন হয় এবং এই সময় কিছু গ্রীণ হাউস গ্যাস নির্গত হয় যার ক্ষতিকারক মাত্রা বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে কয়লা থেকে উৎপন্ন গ্যাসের তুলনায় ৩০০ গুণ কম।

আলোক তড়িৎকোষগুলি আকারে ছোট। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এগুলি প্রায় চার ইঞ্চির মত। সৌরকোষ বা আলোকতড়িৎ কোষ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বেশি পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপন্ন করতে পারে না। সাধারণত আলোক তড়িৎকোষগুলি সারিবদ্ধ ভাবে একটি আয়তাকার কাঠামোর মধ্যে বসানো হয়। এই আলোক তড়িৎকোষগুলি সরাসরি সূর্যালোক গ্রহণ করে এবং তা তড়িৎ শক্তিতে রূপান্তরিত করে। 

সৌরতাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে আলোকতড়িৎ কোষ থেকে সূর্যালোক ব্যবহার করে বিভিন্ন উপায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। প্রথম ধাপে সূর্যের আলোকরশ্মির সাহায্যে তরল পদার্থকে উত্তপ্ত করা হয়, যা পরবর্তী ধাপে জল গরম করতে ব্যবহৃত হয়। জল তাপ গ্রহণ করে বাষ্পে পরিণত হয়। সেই বাষ্পের সাহায্যে টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়।

সৌরশক্তির সাহায্যে গৃহস্থালির কাজে ব্যবহৃত জল গরম করা হয়। এছাড়া কৃষিজাত পণ্য শুষ্ক করার কাজে সৌরশক্তি ব্যবহৃত হয়। সৌরবিদ্যুৎ এবং অন্যান্য স্বচ্ছ ও পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি উৎস থেকে সারা বিশ্বের বিদ্যুৎহীন এলাকার প্রায় ১৬ কোটি মানুষ সুবিধা ভোগ করছে।

সৌরশক্তির প্রত্যক্ষ ব্যবহার: সৌরশক্তির ব্যবহার প্রধানত তিনভাবে হয়ে থাকে।

১) তাপ প্রয়োগ 

২) আলোকরশ্মির প্রয়োগ 

৩) জৈব রাসায়নিক পদ্ধতি

  1. a) সৌর জল উত্তাপক (Solar Water Heater): শীত প্রধান দেশে অপেক্ষাকৃত কম খরচে সৌর জল উত্তাপকের দ্বারা বাড়ি ঘর গরম রাখার কাজে জল গরম করার পদ্ধতি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বর্তমানে অসংখ্য হাসপাতাল এবং শিল্পকারখানায় প্রচুর পরিমাণে জল গরম করার কাজে ‘সৌর জল উত্তাপক’ ব্যবহার করা হচ্ছে।

কার্যপ্রণালী:

  1. b) সৌর নিরুদক (Solar Dryer): বিভিন্ন কৃষিজাত দ্রব্য বা সংরক্ষণে সৌর নিরুদক ব্যবহার করা হয়। সৌর নিরুদকের দ্বারা উৎপন্ন উত্তপ্ত বায়ু কোনো আবদ্ধ প্রকোষ্ঠে রাখা সংরক্ষিত শস্যের মধ্যে দিয়ে পাঠিয়ে শস্য শুষ্ক করা হয়। এক্ষেত্রে শস্যকে সরাসরি রৌদ্রের সংস্পর্শে আনার প্রয়োজন হয় না। ফলে বৃষ্টি, ধূলো এবং কীটপতঙ্গের দ্বারা শস্যের ক্ষতি হয় না।

কার্যপ্রণালী:

  1. c) সৌর পাতক (Solar Distillator): অশোধিত জলকে সৌরতাপের দ্বারা ফুটিয়ে প্রথমে বাষ্পে পরিণত করা হয় এবং উৎপন্ন বাষ্পকে পরে শীতল ও ঘনীভূত করে বিশুদ্ধ জল পাওয়া যায়। এই পদ্ধতিকে ‘সৌরপাতন’ বলা হয়। এই প্রক্রিয়ায় জলের পাতনের কাজে প্রচলিত জ্বালানীর সাশ্রয় হয়। 

কার্যণালী:

  1. d) সৌর পাচক (Solar Cooker): সৌর পাচক বা সোলার কুকার হচ্ছে সৌরকিরণ থেকে সংগৃহীত তাপশক্তির মাধ্যমে রান্না করার যান্ত্রিক ব্যবস্থা। এই পদ্ধতিতে রান্নার জন্য কোন প্রচলিত শক্তি উৎসের (কয়লা, তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ) প্রয়োজন হয় না। প্রধানত দুই রকমের সৌর পাচক ব্যবহার করা হয়।
  2. i) গরম বাক্স সৌর পাচক।
  3. ii) কেন্দ্রাভিমুখী সৌর পাচক (প্রথমটি অধিক জনপ্রিয়)। 

গঠন:

সোলার কুকারের গঠনগত চিত্র

  1. e) সৌর জলাশয় (Solar Pond): কৃত্রিম উপায়ে প্রস্তুত সৌর জলাশয়ে জল এবং লবণের অসম্পৃক্ত দ্রবণ রাখা হয়। এই লবণের দ্রবণ সৌর কিরণ থেকে তাপ সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করতে পারে। লবণ হিসেবে সোডিয়াম ক্লোরাইড বা অ্যামোনিয়াম সালফেট বা অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট বা ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম ক্লোরাইডের মিশ্রিত দ্রবণ ব্যবহার করা হয়। সৌর জলাশয়ে সংরক্ষিত তাপ (৯০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেট তাপমাত্রা বা তার বেশি) জল গরম করার কাজে, বাড়ি গরম করার কাজে এবং বিদ্যুৎশক্তি উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করা হয়।
  • পণ্ডিচেরী বা পুদুচেরি সরকারের বিদ্যুৎ পর্ষদ এবং পণ্ডিচেরী ইজ্ঞিনিয়ারিং কলেজের যৌথ প্রয়াসে দুটি সৌর জলাশয় সংস্থাপিত হয়েছে। দেখা গেছে যে, এই সৌরতাপ সংরক্ষণ ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ ৯০ কিলোওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব।

সৌর বিদ্যুতের ব্যবহার (Use of Solar Electricity): সৌর কিরণ থেকে বিদ্যুৎশক্তি আহরণ এবং প্রয়োগের নকশা চিত্র দেখানো হল:

সৌরশক্তির অন্যতম ব্যবহার জৈব রাসায়নিক পদ্ধতি।

জৈব রাসায়নিক পদ্ধতি: জীবাণু থেকেও বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায় এবং এটিও সৌরশক্তির অন্যতম প্রয়োগ। জৈব বস্তু অর্থাৎ বায়োমাস থেকেও শক্তি উৎপাদনও জৈব রাসায়নিক পদ্ধতি প্রয়োগের উদাহরণ। আখের ছিবড়ে, কৃষিজাত বর্জ্য পদার্থ প্রভৃতি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সৌর শক্তি প্রয়োগ করা হয়। আমাদের গ্রামাঞ্চলে জৈব রাসায়নিক উপায়ে সৌরশক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনা অপরিমিত। যেমন, কচুরিপানা। সাধারণত যে কোনো জলাশয়ে এক তৃতীয়াংশ কচুরিপানা রেখে বাকিটা যদি নিয়মিত কেটে পরিষ্কার করা যায়, তবে সেই অবশিষ্ট পরিমাণ কচুরীপানা জল পরিষ্কারে কাজে লাগে আর বাকি দুই তৃতীয়াংশ কচুরীপানা ডাইজেস্টরে দিয়ে অত্যন্ত কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে সেই গ্রামের বিদ্যুৎ চাহিদার অনেকটাই পূরণ করা যায়।

~~~~~~~~~~~~~~~

স্বপ্নীলা রায় বর্তমানে উত্তরপ্রদেশের সাহারানপুর স্থিত গ্লোকাল বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর রূপে কর্মরতা। পূর্বে তিনি কে কে ইউনিভার্সিটি, নালন্দা, বিহারেও সহকারী অধ্যাপিকা হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিবেশ রসায়নবিদ্যায় পিএইচডি অর্জন করেন।

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।