দূষণহীন বৈদ্যুতিক গাড়ী

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
487 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

~ কলমে দেবাশিস দাশগুপ্ত ~

আধুনিক সমাজে ক্রমবর্ধমান পরিবেশ দূষণ কমানোর জন্য আমাদের জীবাশ্ম জ্বালানি ভিত্তিক অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে এসে বর্তমানে পরিচ্ছন্ন শক্তিকেন্দ্রিক বিকল্পগুলির কথা ভাবার সময় এসেছে। এই রূপান্তর পর্যায়ে সৌর, বায়ু এবং জলবিদ্যুতের মতো বেশ কয়েকটি নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস অনুসন্ধান করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে আমাদের বর্তমান পরিবহন ব্যবস্থায় বড়সড় পরিবর্তন প্রয়োজন হয়ে পড়েছে, কারন জীবাশ্ম জ্বালানি যে ভাবে পরিবেশ দূষণ করে চলেছে তার আশু সমাধান প্রয়োজন। এই পরিস্থিতিতে ব্যাটারী চালিত গাড়ী অর্থাৎ ইলেকট্রিক ভেহিকল (ইভি) এক সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে উঠে আসছে। কিন্তু ব্যাটারী মানে তো তাকে আবার চার্জ করতে হবে— তার মানে চার্জিং স্টেশন, পাওয়ার গ্রিড এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্র যার মধ্যে কিছু আবার কয়লা জ্বালিয়ে চালানো হবে। তাহলে প্রচলিত শক্তির উপর নির্ভরতা কি আমরা কমাতে পারছি? কিন্তু এমন কোনও প্রযুক্তি যদি আমরা উদ্ভাবন করতে পারতাম যাতে ব্যাটারী চার্জ করার কোনও প্রয়োজন হবেনা তাহলে কেমন হ’ত? যদি এমন কোনও ব্যাটারী আমরা তৈরি করতে পারতাম যা লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারী থেকে অনেক সস্তায় সহজলব্ধ এবং দূষণ রোধক হ’ত, যা অনেকগুণ বেশি মাইলেজ দিতে সক্ষম এবং যার কোনও চার্জের প্রয়োজন নেই অর্থাৎ কিনা ফসিল ফুয়েল দ্বারা উৎপাদিত বিদ্যুতের কোনও ভূমিকাই থাকবেনা এই ব্যাটারীর ক্ষেত্রে— তাহলে সেই পরিবেশ বান্ধব ব্যাটারীই হ’ত এই গাড়ীর জন্য আদর্শ ও উপযোগী ব্যাটারী। হ্যাঁ সেটাই হতে চলেছে অদূর ভবিষ্যতে।

বিশ্বব্যাপী ডিকার্বনাইজেশন বা কার্বন মুক্ত প্রযুক্তির উদ্ভাবনে এই ব্যাটারি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে চলেছে। জ্বালানি দহন থেকে সরাসরি যে কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গমন হয় তার ২৪% এর জন্য দায়ী পরিবহনজাত নির্গমন যার প্রায় তিন-চতুর্থাংশ রাস্তার যানবাহন থেকে উদ্ভূত হয়। কোভিড-১৯ মহামারীর প্রভাব থাকা সত্ত্বেও, বিমান ও শিপিং থেকেও নির্গমন বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। বায়োডিজেল, বায়োগ্যাস, বৈদ্যুতিক, হাইব্রিড বা হাইড্রোজেন চালিত যান সহ অনেকগুলি বিকল্প জ্বালানি এবং প্রযুক্তি রয়েছে যা পেট্রল বা ডিজেল চালিত যানবাহনের চেয়ে দূষণহীন। আরেকটি প্রযুক্তি যা খুব কমই প্রচার পায়, কিন্তু যেটির প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে বলে বিশ্বাস করা হয়, তা হল (Al)-Air বা অ্যালুমিনিয়াম-বায়ু ব্যাটারি প্রযুক্তি। প্রায় ২০ বছর আগে, বিজ্ঞানীরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে অ্যালুমিনিয়াম-বায়ু ব্যাটারি এবং বৈদ্যুতিক গাড়ী সম্মিলিত ভাবে ভবিষ্যতের যাত্রীবাহী যানের জন্য ভ্রমণের সর্বোচ্চ সীমা, ক্রয় মূল্য, জ্বালানী খরচ এবং জীবন চক্রের ব্যয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিময় প্রযুক্তিগুলির মধ্যে একটি হবে।

নতুন শক্তি সঞ্চয় বিকল্পগুলির মধ্যে ধাতু-বায়ু ব্যাটারিগুলি অন্যতম যা উচ্চ শক্তিঘনত্ব ও ক্ষমতা সম্পন্ন এবং কম খরচে তৈরি করা সম্ভব। অপারেটিং লোড এবং তাপমাত্রার কারণে তাদের ক্ষমতার খুব একটা হেরফের হয়না এবং ডিসচার্জ ভোল্টেজের তারতম্য সামান্য। এই কারণে এই প্রযুক্তি সবার মধ্যে প্রচুর আগ্রহের সঞ্চার করেছে। এখন পর্যন্ত, বিভিন্ন ধরনের ধাতব এয়ার ব্যাটারি, যেমন লিথিয়াম (Li)-air, সোডিয়াম (Na)-air, পটাসিয়াম (K)-air, জিঙ্ক (Zn)-air, ম্যাগনেসিয়াম(Mg)-air, এবং অ্যালুমিনিয়াম(Al)-air ব্যাটারিগুলি নিয়ে ব্যাপকভাবে অনুসন্ধান চলছে। এই মেটাল-এয়ার বা ধাতব-বায়ু ব্যাটারিগুলি অত্যাধুনিক লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারির তুলনায অধিক শক্তি ঘনত্ব সম্পন্ন৷ ধাতব-বায়ু ব্যাটারিগুলি একটি উপযুক্ত ইলেক্ট্রোলাইটের মাধ্যমে একটি ধাতব অ্যানোড এবং একটি বায়ু-পরিচালিত ক্যাথোড দিয়ে গঠিত। ধাতব-এয়ার ব্যাটারিতে রাসায়নিক বিক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সহজেই পার্শ্ববর্তী বায়ুমন্ডল থেকে সরাসরি গ্রহণ করা হয় যার ফলে উচ্চ শক্তি ঘনত্ব অর্জন করা সম্ভব।

পূর্বে আলোচিত ধাতব-এয়ার ব্যাটারিগুলির মধ্যে, অ্যালুমিনিয়াম-বায়ু ব্যাটারিগুলি তাদের সর্বনিম্ন খরচ এবং উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন হওয়ার কারণে ভবিষ্যতে বড় আকারের শক্তি প্রয়োগের জন্য বিবেচিত হবার দাবী রাখে। স্বাভাবিকভাবেই, বিশুদ্ধ অ্যালুমিনিয়ামকে তার উন্নত ইলেক্ট্রোকেমিক্যাল বৈশিষ্ট্যের কারণে অ্যালুমিনিয়াম-বায়ু ব্যাটারির জন্য অ্যানোডিক উপাদান হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। এই ব্যাটারি তৈরি করতে লাগবে শুধু অ্যালুমিনিয়াম, হাওয়া আর জল। এই ব্যাটারিতে অ্যালুমিনিয়াম পাত অ্যানোড হিসেবে ব্যবহার করা হয়, জল হচ্ছে ইলেক্ট্রোলাইট আর হাওয়া হচ্ছে ক্যাথোড। বায়ুমণ্ডল থেকে শোষিত হাওয়া ক্যাথোডে জমা হয় যার মধ্যে ক্যাটালিস্ট বা অনুঘটক সঞ্চিত আছে। হাওয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া অক্সিজেন জলের সাথে বিক্রিয়া করে হাইড্রোক্সাইড আয়ন (OH-) উৎপন্ন করে। আবার আয়নিত অক্সিজেন (O+) অ্যালুমিনিয়াম আয়নের সঙ্গে বিক্রিয়া করে অ্যালুমিনিয়াম ট্রাই হাইড্রক্সাইডের Al(OH)3 সৃষ্টি করে। একটি বিশুদ্ধ অ্যালুমিনিয়াম অ্যানোড  −১.৬৬ V বিভব সৃষ্টি করতে সক্ষম। এই রাসায়নিক বিক্রিয়ায় যে ইলেকট্রন কণা নির্গত হয় তা বৈদ্যুতিক বর্তনীর মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহের সৃষ্টি করে। এই বিক্রিয়ার ফলে অ্যালুমিনিয়াম পৃষ্ঠের ক্রমাগত ক্ষয় হয় এবং যখন এই অ্যালুমিনিয়াম প্লেট পুরোপুরি ক্ষয় হয়ে যায় তখন তা নতুন প্লেট দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়। সঙ্গে সঙ্গে নতুন ইলেক্ট্রোলাইট বা জলও পরিবর্তন করা হয়। যেহেতু বিশুদ্ধ অ্যালুমিনিয়াম এই ব্যাটারির জন্য অ্যানোড হিসাবে ব্যবহার করা হয় সেই কারণে ব্যাটারি চালনাকে দীর্ঘায়িত করার জন্য এবং ক্ষয়ের হার হ্রাস করার জন্য অ্যালুমিনিয়ামের অ্যালয় ব্যবহার করা যেতে পারে।

এয়ার ক্যাথোড হল অ্যালুমিনিয়াম-বায়ু ব্যাটারির অপরিহার্য উপাদানগুলির মধ্যে একটি, যা সাধারণত একটি গ্যাস ডিফিউশন স্তর, বিদ্যুৎ সংগ্রাহক এবং অনুঘটকের সক্রিয় স্তর দ্বারা গঠিত। বিদ্যুৎ সংগ্রাহকগুলি সাধারণত একটি নিকেলের ধাতব জাল দিয়ে তৈরি হয় যা বাহ্যিক সার্কিট বা বর্তনীর সাথে সংযুক্ত করা হয় এবং ইলেকট্রন প্রবাহ প্রক্রিয়াকে সুদৃঢ় করে থাকে৷ অনুঘটক সক্রিয় স্তরটি একটি ইলেক্ট্রোক্যাটালিস্ট, কার্বন উপাদান এবং বাইন্ডার দিয়ে গঠিত যেখানে অক্সিজেন বিজারণ ক্রিয়া (Oxygen Reduction Reaction) সংঘটিত হয়।

              

 Al-Air ব্যাটারির আভ্যন্তরীণ বিক্রিয়া (Source: Métalectrique)

এই অ্যালুমিনিয়াম-বায়ু ব্যাটারীর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে এর শক্তি ঘনত্ব (নির্দিষ্ট ভর/আয়তন অনুযায়ী সঞ্চিত শক্তির পরিমান) অনুরূপ লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারীর তুলনায় অনেক বেশি। সেই জন্য লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারী যেখানে প্রতিবার চার্জ করার পর ১০০–১৫০ কিলোমিটার যেতে পারে সেখানে অ্যালুমিনিয়াম-বায়ু ব্যাটারী ব্যবহার করে অনায়াসে প্রায় ৬০০–৮০০ কিলোমিটার যাওয়া সম্ভব। অর্থাৎ সংক্ষেপে বলতে গেলে এই ব্যাটারীতে বিদ্যুৎ লাগেনা কারণ এতে চার্জের প্রয়োজন নেই; সেই কারণে পুরোপুরি পরিবেশ বান্ধব। ব্যাটারী থেকে প্রাপ্ত অ্যালুমিনিয়াম হাইড্রক্সাইড সল্যুশন থেকে রিসাইক্লিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ১০০% অ্যালুমিনিয়াম পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারীতে যে ইলেক্ট্রোলাইট ব্যবহৃত হয় তা ক্ষতিকারক টক্সিক দাহ্য তরল, কিন্তু অ্যালুমিনিয়াম-বায়ু ব্যাটারীতে ইলেক্ট্রোলাইট হিসেবে ব্যবহৃত হয় জল, যার এই জাতীয় কোনও সমস্যা নেই। 

যেহেতু এই ব্যাটারি রিচার্জ করা যায় না, তাই এটি বদল করতে হবে। দূর যাত্রার যানবাহনের চালককে প্রতিনিয়ত প্রায় ১০০ কেজি ওজনের ব্যাটারি তোলার কথা না হয় ছেড়েই দিলাম, এটিকে বারোটি প্রায় ৮ কেজি ব্যাটারিতে ভাগ করে নিলেও ব্যাটারি তোলার সরঞ্জাম সহ একটি যান্ত্রিক পরিকাঠামো প্রয়োজন। এই সমস্ত ব্যবহৃত ব্যাটারির অ্যালুমিনিয়াম পুনর্ব্যবহার করা যেতেই পারে, তবে এটি একটি শক্তি-নির্ভর প্রক্রিয়া। 

সম্ভাব্য সুবিধাগুলি হল এই ব্যাটারির শক্তি-ঘনত্ব উন্নত মানের, অ্যালুমিনিয়াম দামে সস্তা এবং আমাদের দেশে পর্যাপ্ত পরিমানে পাওয়া যায়, যেখানে লিথিয়াম আমাদের দেশে সহজলভ্য নয়— বিদেশ থেকে আমদানী করতে হয়, যার ফলে অনেক দামী। এছাড়া পরিত্যক্ত এবং ব্যবহৃত ক্যান বা পাত্র থেকেও অ্যালুমিনিয়াম পুনরুদ্ধার করা যায় যা ব্যাটারি তৈরি করতে কাজে লাগবে। যদিও এই ব্যাটারি বিদ্যুতের গ্রিডের উপর কোন চাপ সৃষ্টি করেনা, কিন্তু নন-রিচার্জেবল ব্যাপারটা বর্তমানে ব্যবহারকারীদের পক্ষে একটি অসুবিধার কারণ। এটির জন্য বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহারকারীদের পরিকাঠামো প্রস্তুত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। অপর পক্ষে আগে রাস্তায় পর্যাপ্ত ব্যবহারকারী না আসা পর্যন্ত পরিকাঠামো কে তৈরি করবে? এই ধরনের পরিস্থিতিতে অ্যালুমিনিয়াম-বায়ু ব্যাটারি শুধু প্রযুক্তিগত দিক থেকেই নয় যদি ব্যবসায়িক দিক থেকেও লাভজনক সাব্যস্ত হয় তা হলেও সরকারী বা বেসরকারী সংস্থাকে উপযুক্ত পরিকাঠামো তৈরি এবং বাড়ানোর জন্য এগিয়ে আসতে হবে।

অ্যালুমিনিয়াম-বায়ু ব্যাটারি একটি ব্যাটারি বা ইঞ্জিন নয়, বরং একটি ইঞ্জিনের বৈদ্যুতিক সমতুল্য। এই ‘ইঞ্জিনে’ ‘জ্বালানি’ হল অ্যালুমিনিয়াম ধাতু (অ্যানোড), যা চারপাশের অক্সিজেনের (ক্যাথোড) সাথে বিক্রিয়া করে শক্তি তৈরি করে। যেহেতু ক্যাথোডটি আশেপাশের বাতাস থেকে সংগৃহীত অক্সিজেন তাই প্রচলিত ব্যাটারির মতো অন্য পদার্থের ওজন বহন করার প্রয়োজন নেই এবং এর ফলে এটি যথেষ্ট হালকা। এটি অত্যন্ত নিরাপদ এবং নিঃশব্দে জ্বালানি শেষ না হওয়া পর্যন্ত ক্রমাগত শক্তি সরবরাহ করে চলে। অপর পক্ষে একটি প্রি-চার্জড ব্যাটারি যখন ডিসচার্জ হতে থাকে সেই সাথে ক্রমশঃ ভোল্টেজ (এবং সেই সঙ্গে শক্তি) হারাতে থাকে।

বর্তমানে সমগ্র বিশ্ব জলবায়ু লক্ষ্য অর্জনের উপায় হিসাবে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি চালিত বৈদ্যুতিক গাড়ির উপর নির্ভর করে আছে। গত ২০২০ সালে মহামারীর বছর, ইউরোপে প্রায় ১৪ লক্ষ ব্যাটারি চালিত বৈদ্যুতিক যানবাহন রেজিস্ট্রি করা হয়েছিল যা ২০১৯ সালের তুলনায় ১৩৭% বেশি। বৈদ্যুতিক গাড়ীর প্রমাণিত সুবিধা থাকা সত্ত্বেও লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি সম্বন্ধে কয়েকটি সতর্কতা আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে। প্রথমতঃ একটি ব্যাটারির আয়ু পাঁচ থেকে আট বছরের মত ধরা হয় এবং শক্তি ঘনত্ব কম হওয়ার কারনে তুলনামূলকভাবে এই ব্যাটারির ওজন বেশি; দ্বিতীয়তঃ এই ব্যাটারি পুনর্ব্যবহার করা যথেষ্ট কঠিন (বর্তমানে পুনর্ব্যবহারযোগ্যতার হার ৫% এর কম); তৃতীয়তঃ বিদ্যুৎ উৎস দূষণহীন নাও হতে পারে, কারণ চারজিং স্টেশনের বিদ্যুৎ দূষণকারী বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র থেকে সাপ্লাই হতে পারে। সর্বশেষে এই ব্যাটারির জন্য প্রয়োজনীয় রেয়ার আর্থ খনিজ অর্থাৎ লিথিয়াম সাপ্লাই চেইন জনিত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে যেহেতু তা বিদেশ থেকে রপ্তানী করতে হয়।

২০২০ সালে ইউরোপীয় কমিশন কর্তৃক প্রকাশিত বিকল্প জ্বালানী চালিত যানবাহনের পরিবেশগত প্রভাবের উপর একটি প্রতিবেদনের উপসংহারে বলা হয়েছে যে বৈদ্যুতিক গাড়ীর পরিবেশগত প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কম তবে, সেই প্রভাব মূলত আঞ্চলিক পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে, কারণ দেশ থেকে দেশে শক্তির (দূষণ যুক্ত প্রচলিত এবং দূষণহীন অপ্রচলিত) মিশ্রণ ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়। তদুপরি বৈদ্যুতিক গাড়ীতে তামা এবং ইলেকট্রনিক উপাদানের বহুল ব্যবহার পরিবেশের জন্য একটি চ্যালেঞ্জের কারণ। অন্যদিকে অ্যালুমিনিয়াম-বায়ু ব্যাটারির প্রযুক্তি স্থায়িত্ব, পুনর্ব্যবহারযোগ্যতা এবং সহজলভ্যতার দিকগুলির কথা মাথায় রেখে এই সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে তা এক গ্রহণযোগ্য বিকল্প বলে বিবেচিত হতে পারে।

২০১৮ সালের হার্ভার্ডের একটি সমীক্ষার পরামর্শ অনুযায়ী বৈদ্যুতিক গাড়ীর বাণিজ্যিক সাফল্য নিশ্চিত করার জন্য আরও সহজলভ্য, ব্যবহারে সহজ এবং অপেক্ষাকৃত সস্তা চার্জিং পরিকাঠামো প্রয়োজন। লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারির ক্ষেত্রে ভারী ব্যাটারিগুলি সুনির্দিষ্টভাবে লাগানোর জন্য একদিকে যেমন একটি উপযুক্ত ব্যাটারি হ্যান্ডলিং সিস্টেমের প্রয়োজন অপরদিক একটি নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থাও রাখতে হবে। তবে বর্তমান পেট্রল পাম্পগুলিকে  সুষ্ঠ ভাবে এই পরিকাঠামো প্রদানের ব্যাপারে কাজে লাগানো যেতে পারে।

অ্যালুমিনিয়াম-বায়ু ব্যাটারির জন্য, পরিকাঠামোগত প্রয়োজনীয়তা তুলনামুলক ভাবে কম এবং শুধুমাত্র ব্যাটারি পরিবর্তন গাড়ীর চালকের অপেক্ষার সময়কে ব্যাপকভাবে হ্রাস করতে পারে— যা বর্তমানের পেট্রল ভরার সময়ের থেকে সামান্য কিছু বেশি।  ৫ কেজির কম মডিউলের ক্ষেত্রে কোন বিদ্যুৎচালিত এবং স্বয়ংক্রিয় সোয়াপ মেশিন বা ব্যাটারি পরিবর্তন মেশিন না হলেও চলে। এমনকি কেউ যদি স্বয়ংক্রিয় একটি মেশিনের ব্যবস্থার কথাও ভাবে তা হলেও তা চালানোর জন্য সাধারণ পাওয়ার সাপ্লাই যথেষ্ট। 

আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা বা IEA-এর নেট জিরো রোডম্যাপ অনুসারে, ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গমন হ্রাসের অর্ধেক আসবে উন্নত প্রযুক্তিগুলি থেকে যা আজ প্রোটোটাইপ বা পরীক্ষা নিরিক্ষার পর্যায়ে রয়েছে। এর অর্থ হল অ্যালুমিনিয়াম-বায়ু ব্যাটারির মত প্রতিশ্রুতিময় প্রযুক্তিগুলির বাণিজ্যিকীকরণ দরকার। কিন্তু এখনও পর্যন্ত অ্যালুমিনিয়াম-বায়ু ব্যাটারির প্রযুক্তিগত সমস্যার সমাধানের ক্ষেত্রে কোন সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা পরিলক্ষিত হয়নি। সাধারণভাবে বিকল্প শক্তিগুলির সংজ্ঞায় ‘ব্যাটারি’ অন্তর্ভুক্ত নয়, যার ফলে এই প্রকল্পে অর্থনৈতিক সহায়তাপ্রাপ্তির দিক থেকে সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ ‘সাস্টেনেবল এবং স্মার্ট মোবিলিটি স্ট্র্যাটেজি’ হিসেবে ইউরোপীয় কমিশন (২০২০) তার ‘রিচার্জ এবং রিফুয়েল’ ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্পের লক্ষ্য হিসাবে বৈদ্যুতিক গাড়ীগুলির জন্য রিচার্জিং পয়েন্টের পাশাপাশি হাইড্রোজেন চালিত গাড়ীর হাইড্রোজেনের রিফিলিং পয়েন্টের নামও উল্লেখ করেছে, কিন্তু ব্যাটারি প্রতিস্থাপন করার জন্য বর্তমানে কোনও লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়নি। যার ফলে অ্যালুমিনিয়াম-বায়ু ব্যাটারি প্রযুক্তির জন্য এই মুহূর্তে কোন সহায়তা প্রদান করা সম্ভব হচ্ছেনা। অ্যালুমিনিয়াম-বায়ু ব্যাটারির জন্য নীতি সমর্থনের অভাবে গাড়ি নির্মাতারা লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির নিরাপদ পছন্দের দিকে ঝুঁকবে এটাই স্বাভাবিক যা আগামী বেশ কয়েক বছরের জন্য বাজারকে চালিত করবে।

জলবায়ু সংকট মোকাবিলা করার জন্য বিভিন্ন সমাধানের প্রয়োজন। পরিবহন খাতে উত্তরোত্তর বৈদ্যুতিক গাড়ীর ব্যবহার একটি আশাব্যঞ্জক অগ্রগতির ইঙ্গিত দিচ্ছে । তবুও ডিকার্বনাইজেশন প্রচেষ্টা আরও কার্যকর হতে পারে যদি  হাইড্রোজেন ফুয়েল এবং বৈদ্যুতিক গাড়ীর প্রচলিত ব্যটারি প্রযুক্তির সঙ্গে অ্যালুমিনিয়াম-বায়ু ব্যাটারির বিকল্প প্রযুক্তি এই সদ্য শুরু হওয়া পরিবর্তনকে আরো ত্বরান্বিত করতে পারে। কেজি প্রতি ৮.১ কিলোওয়াট আওয়ার এর মত বৃহৎ শক্তি ঘনত্ব অ্যালুমিনিয়াম-বায়ু ব্যাটারির প্রযুক্তিকে তার সম্ভাবনায় লক্ষে পৌঁছে দিতে পারে— কিন্তু তার জন্য চাই উপযুক্ত আর্থিক সহায়তা এবং ব্যবসায়িক আগ্রহ। গ্লাসগোতে COP26 জলবায়ু সম্মেলনে বেশ কিছু দেশের সরকার এবং গাড়ী নির্মাতারা ২০৪০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে বেশির ভাগ উন্নত দেশগুলির বাজারে ১০০ শতাংশ শূন্য-নির্গমন নতুন গাড়ি বিক্রয়ের জন্য একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে৷ গাড়ী শিল্পকে ডিকার্বনাইজ করার লক্ষ্যে এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসাবে স্বাগত জানানো হয়েছে। যদিও ২০১৫ সালে প্যারিস চুক্তিতে ধনী দেশগুলির দেওয়া অনুরূপ প্রতিশ্রুতি এখনও পূরণ করা হয়নি। এবারেও বিশ্বের কিছু উন্নত দেশ সহ বৃহত্তম গাড়ির বাজারগুলি এই অঙ্গীকার থেকে বিরত ছিল। 

———————

লেখক পরিচিতি: এলেবেলের অতিথি দেবাশিস দাশগুপ্ত একজন অবসরপ্রাপ্ত পরামর্শদাতা প্রযুক্তিবিদ (Retired Consulting Engineer)

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।