মুক্তো রহস্য

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
430 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

~কলমে এলেবেলে দেবযানী ~

সেই প্রাচীনকাল থেকে ঝকঝকে সাদা গোলাকার একটি রত্ন সবাইকে আকর্ষণ করে চলেছে। হ্যাঁ, মুক্তো তার নাম! সাধারণ মানুষ থেকে রাজা-রানী, সবারই মুক্তোর প্রতি দুর্বলতা চিরকালীন। মহারানী ভিক্টোরিয়া, মহারানী গায়ত্রী দেবী, লেডি ডায়না— এঁদের মুক্তো শোভিত রূপে আমরা মুগ্ধ হয়েছি সকলে! কিন্তু আসলে কী এই মুক্তো? কীই বা তার প্রকৃতি, কেমন করে ঝিনুক একটু একটু করে তৈরি করে, কেনই বা তৈরি করে এই মুক্তো, জেনে নেওয়া যাক। 

মুক্তো এক ধরণের বিশেষ জেমস্টোন যা, জীবিত প্রাণীর অভ্যন্তরেই গঠিত হয়ে থাকে, অনেক দুর্লভ রত্ন মূলত মাটির নীচ থেকে পাওয়া যায়, কিন্তু মুক্তোর জন্ম হয় সমুদ্র বা জল থেকে। বিশেষ প্রজাতির ঝিনুক বা মুশেলস-ই (শক্ত দুই খোলস বিশিষ্ট মোলাস্কা পর্বের একপ্রকার ঝিনুক গোত্রীয় প্রাণীদের Mussels বলে) উপযুক্ত পরিবেশে কেবল মুক্তো তৈরি করতে পারে।

প্রথমেই জেনে নেওয়া যাক মুক্তো তৈরি হয় কীভাবে। কথায় আছে ঝিনুক থেকে মুক্তো তৈরি হয়, বাস্তবে সব ধরনের ঝিনুক থেকে কিন্তু মুক্তো হয়না। ঝিনুক বা ঝিনুক গোত্রীয় এই বিশেষ প্রজাতিরা মোলাস্কা পর্বের বাই ভাল্ভিয়া (Bivalvia) শ্রেণীর সদস্য।

ঝিনুক তৈরির কারণ এবং পদ্ধতিটিও খুব অদ্ভুত। মোলাস্কা পর্বের প্রাণীদের বাইরের খোলসটি হয় শক্ত ক্যালসিয়াম কার্বোনেট এর, আর দেহের তুলতুলে নরম অংশটি সুরক্ষিত থাকে তার ভিতরে। খাওয়ার সময় বা কোনো কারণে ঝিনুক যখন খোলা ফাঁকা করে, সেই সময় যদি বালির কণা বা অন্যান্য ছোটখাটো বস্তু তার দেহের মধ্যে খোলার ফাঁক দিয়ে ঢুকে যায়, তখন ঝিনুক প্রথমে চেষ্টা করে সেটিকে বের করে দেবার। যদি তা সত্ত্বেও সেটি বেরিয়ে না যায়, তখন এই কণাটির জন্য ঝিনুকের দেহে জ্বলনের সৃষ্টি হয়। ঝিনুক তখন নিজেকে প্রতিরক্ষার খাতিরে বাইরে থেকে আসা বস্তুটির চারপাশে এক প্রকার রস নিঃসৃত করে। বাইরে থেকে আসা পদার্থটিকে তখন বলা হয় নিউক্লিয়াস। সেই রস ধীরে ধীরে জমে গিয়ে শক্ত ন্যাকারের আস্তরণ তৈরি করে এবং দিনের পর দিন এই আস্তরণের পরত বাড়তে থাকে। স্তরে স্তরে তা জমাট বাঁধতে থাকে। জমাট বাঁধা সেই বস্তুটিই এক সময় হয়ে ওঠে মুক্তো। মুক্তোর আকার, আকৃতি মূলত নির্ভর করে নিউক্লিয়াসের আকার-আকৃতির উপরেই।

মুক্তোর রাসায়নিক উপাদান কনকায়োলিন ক্যালসাইট ও ক্যালসিয়াম কার্বোনেট। এদের ক্রিস্টাল গোলাকার পরতে পরতে জমে গিয়ে এটি তৈরি হয়। প্রাকৃতিক ভাবে, প্রায় দশ হাজার ঝিনুকের মধ্যে মাত্র একটি ঝিনুক থেকে মুক্তো পাওয়া যেতে পারে।

মুক্ত সংগ্রহের এই অনিশ্চয়তার জন্যে কৃত্রিমভাবে মুক্তোর চাষ করা হয়ে থাকে। মুক্তো চাষের জন্যে প্রথমে বিশেষ প্রজাতির ঝিনুক বা মুসেলস সংগ্রহ করা হয়। তারপর অতি সতর্কতার সাথে তাতে গ্রাফটিং করা হয়। একে প্রায় একটি ছোটখাটো সারজিকাল অপেরাশনই বলা যায়। মূলত উষ্ণ আবহাওয়া এড়াতে শীতকালে এটি করা হয়ে থাকে। এই অপারেশনের মাধ্যমে বাইরের কোন বিডস, গ্রহীতা ঝিনুকের ভিতরের নরম ম্যান্টেলের ভিতর পকেট করে তাতে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। সাধারণত, অন্য কোন ডোনার ঝিনুকের ম্যান্টেল থেকে ছোট ছোট টুকরো (২ মিমি x ২ মিমি) কেটে অপর ঝিনুকটির মধ্যে সেট করা হয়। 

তারপর গ্রাফটেড ঝিনুকগুলিকে ১০–১১ দিনের জন্যে পোস্ট অপারেটিভ কেয়ারে রাখা হয়, অ্যান্টিবায়োটিক ট্রিটমেন্ট দেওয়া হয়। এই সময়, অনেক গ্রহীতা ঝিনু্ক বাইরের অংশটিকে শরীর থেকে বের করে দেবার লড়াইয়েই মারা যায়। যারা ১১/১২ দিন পরেও বেঁচে থাকে, ধরে নেওয়া হয় বাইরে থেকে গ্রাফট করা বস্তুটিকে তারা গ্রহণ করেছে, সুতরাং তার ওপর ন্যাকারের প্রলেপ লাগানো তারা শুরু করবে।

তারপরে সুস্থ ঝিনুকগুলোকে বিশেষ ধরনের নাইলন নেট ব্যাগে রেখে পুকুরের ১ মিটার গভীরে রাখা হয়। নিয়মিত সমস্ত খুঁটিনাটি লক্ষ রাখা হয় যাতে ঝিনুকগুলো ভালোভাবে বাঁচার সমস্ত শর্ত পেতে পারে। সাধারনত ১২ থেকে ১৮ মাসের হয় এই কালচার পিরিয়ড। এরা পুকুরের ছোট ছোট জলজ জীবজন্তু (Plankton) খেয়েই বেঁচে থাকে, তাই বাইরের কোন বিশেষ খাবারের দরকার হয়না, শুধু সময়ে সময়ে সার দিলেই হয়। কিন্তু এরা সামান্য তাপমাত্রার হেরফের বা পরিবেশ দূষণেই মারা যেতে পারে।

এরপর সাবধানতার সাথে ভিতরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বিশেষ কোন ক্ষতি না করে সেই মুক্ত সংগ্রহ করা হয়। তারপর সংগৃহীত মুক্তোর আকার, আকৃতি, উজ্জ্বলতা, ন্যাকার এর মান এর ভিত্তিতে এদের বাজার মূল্য নির্ধারিত হয়।

বলা হয়ে থাকে, প্রশান্ত মহাসাগরের সাউথ সি পার্লের দাম, এর আকার এবং উজ্জ্বলতার জন্যে এর মূল্য অনেক বেশি হয়ে থাকে। এছাড়াও পারস্য উপসাগরের বসরা অঞ্চলের ঝিনুক থেকে যে মুক্তো জন্মায় তাকে বসরা মুক্তো বা বসরাই মুক্তো বলে। সেটিও অন্যতম শ্রেষ্ঠ, দামী মুক্তো। মায়ানমারে ইরাবতী নদী থেকে পাওয়া যায় বার্মিজ মুক্তো, সেগুলিরও মান যথেষ্ট ভালো। 

চতুর্দশ শতকে বিখ্যাত পর্যটক ইবন বতুতা আরব সাগরে ডুবুরীদের কোমরে মুক্তো রাখার কাহিনীর কথা বর্ণনা করেন। এর মাধ্যমেই সারা বিশ্ব  মুক্তো সম্পর্কে জানতে পারে।

মুক্তো সংগ্রহের ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায় হাজার হাজার বছর আগে সমুদ্র বা নদী থেকে প্রাকৃতিক মুক্তো ভারত মহাসাগর, পারস্য উপসাগর, লোহিত সাগর এবং মান্নার উপসাগর থেকে সংগৃহীত হত। হ্যান রাজবংশ (খ্রিস্টপূর্ব ২০৬–২২০ খ্রিস্টাব্দ) ব্যাপকভাবে দক্ষিণ চীন সাগর থেকে মুক্তো সংগ্রহ করত। চতুর্দশ শতকে বিখ্যাত পর্যটক ইবন বতুতা আরব সাগরে ডুবুরীদের কোমরে মুক্তো রাখার কাহিনীর কথা বর্ণনা করেন। এর মাধ্যমেই সারা বিশ্ব  মুক্তো সম্পর্কে জানতে পারে। সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজা-রানীদের মধ্যে প্রবল জনপ্রিয়তা পায় এই মুক্তো; যদিও উনবিংশ শতকে হিরে আবিষ্কারের পর এই জনপ্রিয়তা বেশ অনেকটাই কমে যায়।

১৮৯৩ সালে কৃত্রিম মুক্তো চাষ প্রথম আবিষ্কার করেন জাপানি এক মুক্তো মুক্তো-চাষী ককিচি মিকিমটো।

১৮৯৩ সালে কৃত্রিম মুক্তো চাষ প্রথম আবিষ্কার করেন জাপানি এক মুক্তো মুক্তো-চাষী ককিচি মিকিমটো। শোনা যায়, তিনি নাকি প্রতিদিন মুক্তো খেতেনও, স্বাস্থ্যবান থাকার তাগিদে। চীনদেশেও মুক্তোকে ওষুধের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়৷ ব্রিটিশ বায়োলজিস্ট উইলিয়াম স্যাভিল – কেন্ট কৃত্রিমভাবে মুক্তো তৈরির পদ্ধতি প্রথম বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেন।

ভারতের বাজারের বেশির ভাগ মুক্তোই বাইরের দেশ থেকে আমদানি করা হয়। যদিও এই মুক্তো উৎপাদন সময় সাপেক্ষ এবং বেশ ঝুঁকিপূর্ণ, তা সত্ত্বেও মুক্ত চাষে খুব কম বিনিয়োগেই বেশ ভাল রোজগার করা যায়। স্বাভাবিকভাবেই তাই আমাদের দেশে ক্রমেই জনপ্রিয় হচ্ছে এই মুক্তো চাষ।


এলেবেলে দলবল 

 

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।