অতিপরিবাহিতার ১..২..৩

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
530 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

 

~ কলমে এলেবেলে ঋত্বিক ~

 আধুনিক বিজ্ঞানের ইতিহাসে বহুবার এমন হয়েছে যেখানে আসল লক্ষ্য ছিল এক, কিন্তু একদম অন্যরকম কিছু ফলাফল সামনে এসেছে, যার জন্য অন্য রকম একটি বিষয় তৈরি হয়ে গিয়েছে গবেষণার জন্য। আর পদার্থবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এরকম একটি আবিষ্কার ছিল সুপারকন্ডাক্টিভিটি বা অতিপরিবাহিতা আবিষ্কার। এটির সময়কাল ১৯১১ সাল, আবিষ্কর্তা ক্যামারলিং ওনস, তিনি তখন ছিলেন নেদারল্যান্ডের লেইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। তিনি মূলত গবেষণা করতেন গ্যাসের তরলীকরণ, এবং অতি নিম্ন উষ্ণতা সংক্রান্ত বিষয়ে। তিনি যে সময়ে গবেষণা করতেন সেই সময়ে প্রযুক্তি একেবারেই প্রথমযুগের, সেই সময়ে দাঁড়িয়ে তিনি প্রথমে অক্সিজেন এবং হাইড্রোজেন তরলীকৃত করতে সমর্থ হন। এ দুটি যে আগে হয়নি তা নয়, তবে তিনি যে গবেষণাগারে এটি করতে পেরেছিলেন, তা ছিল তার হাতে তৈরি, এবং সেটা তৈরি হয়েছিল একদম শূন্য থেকে। এরপর তিনি হিলিয়াম গ্যাসকে তরলীকৃত করেন, এবং এটি ছিল ক্রায়োজেনিক্স বা নিম্ন তাপমাত্রা সংক্রান্ত গবেষণার একটি সোপান, কারণ হিলিয়াম একটি নিষ্ক্রিয় গ্যাস, অন্য সব গ্যাসের থেকে এর হিমাঙ্ক সবার নিচে, সাধারণ চাপে ৪.২ কেলভিন, তাই একে তরল করা একটি ভীষণ চ্যালেঞ্জের ব্যাপার।

এখন হিলিয়াম তরলীকরণের উপায় বের হওয়ার পর তিনি, সেই নিম্ন তাপমাত্রায় বিভিন্ন বস্তুর বিভিন্ন ধর্ম কেমন আচরণ করে সেটা জানার জন্য গবেষণা শুরু করেন। যেমন উদাহরণ রূপে বলা যায় যে, বিভিন্ন ধাতুর তড়িৎ পরিবাহিতা সেই নিম্ন উষ্ণতায় কেমন ব্যবহার করে। এখন কেন তড়িৎ পরিবাহিতা নিয়ে তিনি আগ্রহী ছিলেন তা বোঝার আগে একটু তড়িৎ পরিবাহিতা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।

যেকোন ধাতু তড়িৎ পরিবহণে সক্ষম। কোন ধাতুর তারের দুই প্রান্ত ব্যাটারির দুই প্রান্তে লাগালে সেই তারে তড়িৎ প্রবাহ শুরু হয়, এবং এই তড়িৎ প্রবাহের সাথে যেটি যুক্ত থাকে সেটি হল রেসিস্টেন্স বা রোধ। এই রোধ হল সেই পদার্থের মধ্যে দিয়ে তড়িৎ প্রবাহকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা। কে করে? সেই পদার্থ বা ধাতুই করে; তাই রোধ হল পদার্থের নিজস্ব ধর্ম। খুব সাধারণ ভাবে অথচ খুব ক্ষুদ্র দৈর্ঘ্য সীমায় দেখলে, এই তড়িৎ প্রবাহ ঘটে ধাতুর মধ্যে থাকা মুক্ত ইলেক্ট্রনগুলির চলাচলের জন্য। এই ইলেক্ট্রনগুলি চলতে চলতে পদার্থের নিজস্ব গঠনের সাথে অর্থাৎ পদার্থের কেলাসে অবস্থিত ভারী নিউক্লিয়াসের বা পরমাণু কেন্দ্রকের সাথে ধাক্কা খেয়ে দিক হারিয়ে ফেলে কিছু সময়ের জন্য। এই ঘটনা মূলত রোধ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে বড় দৈর্ঘ্য সীমায়। এখন পদার্থের মধ্যে যদি অশুদ্ধি বেশি থাকে, তবে এই ধরণের ধাক্কা খেয়ে দিক হারানোর ঘটনা আরও বাড়ে, যার ফলে অশুদ্ধ ধাতুর রোধ, শুদ্ধ ধাতুর থেকে বেশি হয় সাধারণত।

এখন যদি তাপমাত্রা ক্রমাগত কমানো হয়, কি হতে পারে? তাপমাত্রা ক্রমাগত কমাতে থাকলে পদার্থের কেলাসে অবস্থিত নিউক্লিয়াসের কম্পন আস্তে আস্তে কমতে থাকবে, যার ফলে তাদের সাথে তড়িৎ পরিবাহী ইলেক্ট্রনের ধাক্কা খাওয়ার সম্ভাবনা কমতে থাকবে, ফলস্বরূপ রোধ কমবে, কিন্তু পরম শূন্য তাপমাত্রা বা তার খুব কাছাকাছি এলে ইলেক্ট্রনগুলি গতিশক্তিহীন হয়ে যাবে, ফলে পদার্থের রোধ হয়ে যাবে অসীম। তাহলে ঘটনাটা কি দাঁড়ালো, তাপমাত্রা কমার সাথে সাথে পদার্থের রোধ কমবে, এবং একটি সর্বনিম্ন মানে পৌঁছাবে এবং তারপর আরও তাপমাত্রা কমালে রোধ বাড়বে এবং পরমশূন্য উষ্ণতায় রোধ হয়ে যাবে অসীম। অন্তত তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটিই ছিল লর্ড কেলভিনের ধারণা (১৯০২ সাল), আর এটিকে গবেষণাগারে পরীক্ষা করে দেখা সম্ভব হল তখনই যখন পরম শূন্য উষ্ণতার মাত্র ৪.২ ডিগ্রি উপরে পৌঁছানো গেলো তরলীকৃত হিলিয়ামের সাহায্যে। 

ওনস প্রথম পরীক্ষা করলেন প্ল্যাটিনাম এবং সোনার তারের উপর। পরীক্ষার সময়কাল ১৯১১। দেখলেন যে রোধ লর্ড কেলভিন প্রস্তাবিত মডেলের মত আচরণ করছে না, বরং তাদের রোধ একটি সর্বনিম্ন রোধে পৌঁছে saturate করে যাচ্ছে। এবং এই সর্বনিম্ন রোধের মান নির্ভর করছে ব্যবহৃত ধাতু কতটা শুদ্ধ তার উপর। তিনি ঠিক করলেন আরও বেশি শুদ্ধ কোন ধাতু নিয়ে পরীক্ষা করবেন। সেই ধাতু হল পারদ। এখন সবার মনে প্রশ্ন জাগবে পারদ তো সাধারণ উষ্ণতায় তরল, তা দিয়ে তার তৈরি হবে কেমন করে? এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে আমরা এখন বিবেচনা করছি খুব কম উষ্ণতার জগৎকে, ৪.২ কেলভিন বা -২৬৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি। সেখানে পারদের গলনাঙ্ক -৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস, সুতরাং পরীক্ষা সংক্রান্ত ক্ষেত্রে সেটি কঠিন, আর এছাড়া সেই সময় ওনস-এর গবেষণাগারে পারদ খুবই উচ্চ মাত্রায় পরিশুদ্ধ করা সম্ভব ছিল। 

পরীক্ষার ফল এলো মারাত্মক, মোটামুটি ৪.৩ কেলভিনের কাছাকাছি এসে পারদের রোধ হয়ে যাচ্ছে “প্র্যাকটিক্যালি” শূন্য।

পরীক্ষার ফল এলো মারাত্মক, মোটামুটি ৪.৩ কেলভিনের কাছাকাছি এসে পারদের রোধ হয়ে যাচ্ছে “প্র্যাকটিক্যালি” শূন্য। এই ফল বিশ্বাস করা ছিল কঠিন, হতে পারে সার্কিট শর্ট হয়ে গিয়েছিল, অথবা পাঠ নেওয়া যথেষ্ট তাড়াতাড়ি হয়নি (মনে রাখতে হবে সেই সময়টা ১৯১১, কোন ল্যাবভিউ সফটওয়্যার নেই, কোন কম্পিউটার নেই, ডিজিটাল মেজারমেন্ট আসতে তখনও ৬০–৭০ বছর, ফলে সেই শূন্য রোধ বিশ্বাস করা কঠিন ছিল বইকি!)

বহুবার পরীক্ষা করে শেষে বোঝা গেল যে এক্সপেরিমেন্টে কোন ভুল নেই, ক্যামারলিং ওনস গবেষণাগারে পদার্থের একটা নতুন অবস্থা খুঁজে পেয়েছেন। যা হল অতিপরিবাহী দশা বা superconductivity, পরে তিনি পারদের অশুদ্ধতা পরিবর্তন করেও এই অতিপরিবাহী দশা পেয়েছিলেন, এবং টিন ও সীসাতেও এই superconductivity পাওয়া গিয়েছিল। ক্যামারলিং ওনস নোবেল পান ১৯১৩ সালে, নিম্ন উষ্ণতা সংক্রান্ত গবেষণা ও তরল হিলিয়াম তৈরি করতে পারার সুবাদে।

ওনস-এর এই গবেষনা ছিল যুগান্তকারী, কারণ যদি সাধারণ তাপমাত্রায় সুপার কন্ডাক্টার তৈরি করা যায় তবে বর্তমান যুগের শক্তি অপচয়, যা একটা বিশাল সমস্যা, তা এক লহমায় হয়ে যাবে শূন্য। সেই কাজে বিজ্ঞানীরা এখনো মেতে আছেন, কিন্তু সাধারণ অবস্থায় সুপারকন্ডাক্টার এখনও আছে অধরাই। এই গবেষণার পর প্রায় ৪০ বছর লেগেছিল অতিপরিবাহী দশার তাত্ত্বিক বিবরণ পেতে, কারণটা স্বাভাবিক, সেই সময়ে কোয়ান্টাম থিওরি জন্মলগ্নে, তার প্রাপ্তবয়স্ক হতে বেশ কিছুটা সময় বাকি। কি সেই তত্ত্ব, সেটা নিয়ে না হয় পরে একদিন আলোচনা করা যাবে।

তথ্যসূত্র: 

১. https://history.aip.org/exhibits/mod/superconductivity/01.html

২. https://www.ias.ac.in/article/fulltext/reso/022/05/0461-0473

৩. https://physicstoday.scitation.org/doi/10.1063/1.3490499


Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।