গণিত, অনিশ্চয়তা ও সম্ভাব্যতা

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
655 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

~ কলমে অভিষেক নাগ ~

কোথায় নেই গণিতের প্রয়োগ? সামান্য বাজারের হিসাব কষা থেকে আধুনিক মেশিন লার্নিং নির্ভর অ্যাপ বা ই-কমার্স পোর্টাল, সবেতেই এই বিষয়টির অবাধ বিচরণ। এর মধ্যেই সম্ভাবনা তত্ত্বটি খুবই বিশেষত্ব রাখে। আর সেখানেই যত জটিলতা। সত্যিই কি বিষয়টি এতটাই জটিল ? 

গণিত বিষয়টা বড়ো আশ্চর্যজনক। অনেকেই এটাকে তথাকথিত বিজ্ঞানের মাঝে রাখতে চাননা। সেই জন্যই হয়ত সরাসরি গণিতে কোনো নোবেল প্রাইজও দেওয়া হয়না। কিন্তু গণিত ব্যতিরেকে বিজ্ঞান চর্চা এক কথায় অসম্ভব। এটাকে তাই একপ্রকার বিজ্ঞান চর্চার শস্ত্র বা টুল হিসাবে ব্যবহার করা হয়। বিষয়টা এতটাই গভীর এবং এত তার শাখা প্রশাখা, তাই এর মাঝে হারিয়ে যাওয়া বা এর সম্পর্কে ভীষণ রকমের বিভীষিকা সৃষ্টি হওয়া খুবই স্বাভাবিক। ছাত্রজীবন থেকে গণিতের প্রতি এক প্রকার বিতৃষ্ণা অনেক ছাত্র ছাত্রীরই থাকে। এর জন্য আমাদের দেশের তথাকথিত শিক্ষা ব্যবস্থাটি বহুলাংশে দায়ী। গণিতের বিমূর্ত ধারণা বা ইংলিশে যাকে বলে অ্যাবস্ট্রাক্ট কনসেপ্ট অনেকেরই বোধগম্য হয়না। এটা উচ্চতর গণিতের পাঠক্রমের ক্ষেত্রে বেশি পরিমানে হয়ে থাক। এর মূল কারণ হল ব্যবহারিক দিকটা ভালো ভাবে না জেনে কোনভাবে বিষয়টাকে মুখস্ত করার চেষ্টা। এটা মারাত্মক একটা ভুল কাজ। যার ফলশ্রুতি হিসাবে বিষয়টা নিয়ে চিরকাল ধোয়াঁশা থেকে যায়। গণিতের প্রধান শাখাগুলোর এবং বিভিন্ন জটিল তত্ত্বগুলোর উৎপত্তি কিন্তু মূলত আমাদের চারপাশের রোজকার জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো ব্যাখ্যা করার জন্য অথবা কোন বাস্তব সমস্যা সমাধান করার জন্য হয়েছিল এবং আজও হয়ে চলেছে। সেই সমস্যাগুলো সমাধানের একটা মডেল তৈরির চেষ্টা গণিতের মোটামুটি সব শাখাগুলোতেই দেখা যায়। মুশকিলটা হল যে ওই মূলঘটনা“, “সমস্যাবা প্রব্লেমটা সম্পর্কে না জেনে যদি গণিত চর্চা কেউ করে তাহলে সে পরীক্ষায় হয়ত পাস করে যাবে কিন্তু গণিত বিশেষজ্ঞ হবে না কোনদিনও। গণিতের অন্যতম শাখা হল সম্ভাবনা তত্ত্ব। এই ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা প্রযোজ্য। সাধারণ মানুষের কথা ছাড়ুন, অনেক ভালো ছাত্র ছাত্রী ও গবেষকদেরও চূড়ান্ত রকমের বিভ্রান্তি থাকে এই গণিতের এই বিষয়টাতে। এই নিবন্ধে মূলত সম্ভাবনা তত্ত্বর ব্যবহারিক দিকটা তুলে ধরার চেষ্টা করব এবং এই সংক্রান্ত কয়েকটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করব যেগুলো গণিতের উপশাখা হিসাবে ধরা যেতে পারে। আপনার যদি উচ্চতর গণিত সম্পর্কে তেমন ধারণা নাও থাকে তাহলেও আশা করি আমাদের পারিপার্শ্বিকের উদাহরণগুলো থেকে বিষয়টা বুঝতে খুব একটা অসুবিধা হবে না।

খুব সাধারণ একটা উদাহরণ দিয়ে আলোচনা শুরু করব। ধরুন, আপনি টস করছেন। সবাই জানে যে টসের রেজাল্ট দুই রকম হয়: হেড অথবা টেল। কিন্তু আপনার টসের রেজাল্ট কি হবে তা কি আপনি নিশ্চিত করে বলতে পারবেন? না, পারবেন না। কারণটা হল এর মধ্যে থাকা অজানা তথ্য এবং অনিশ্চয়তা। এখন প্রশ্ন হল কোন তথ্য অজানা? আপনি কি জানেন যে বাতাসের গতি কত ছিল সেই সময়? কতটা জোরে আপনি কয়েনটা উপরে ছুড়েছেন তার কোন পরিমাপ আছে? যেখানে কয়েনটা পড়ল সে জায়গাটার মসৃণতা কত ছিল? আরও বড় কথা হল যেগুলো বললাম সেইগুলো কি টসের রেজাল্টকে প্রভাবিত করে আদৌ? নাকি অন্য কিছু আছে এর ভিতরে? এই সব তথ্য যদি জানা থাকে তাহলে কোন একটা গাণিতিক সূত্রের মাধ্যমে হয়ত সব কিছুকে একত্রিত করে বলা সম্ভব: হেড আসবে না টেল আসবে। এইগুলো জানা থাকলে সেই ব্যবস্থাকে গণিতের ভাষায় “ডিটারমিনিস্টিক সিস্টেম” বা নির্ধারক ব্যবস্থা বলে। কিন্তু মুশকিলটা হল এগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে অজানা থাকে এবং সিস্টেমটি “নন-ডিটারমিনিস্টিক” বা অ-নির্ধারক হয়ে যায়। আর এখানেই “প্রোবাবিলিটি থিয়োরী” বা সম্ভাব্যতা তত্ত্বের আগমন। এখানে কতগুলো পরীক্ষার মাধ্যমে হেড বা টেল আসার সম্ভাবনা পরিমাপ করা হয়। সাধারণভাবে প্রোবাবিলিটি থিয়োরীতে কোন কিছুর মান নির্ধারণের আগে সেটিকে একটি ঘটনা বা ইভেন্ট-এর রূপ দেওয়া হয়। সেখান থেকে সেই ইভেন্টের প্রোবাবিলিটি বা সম্ভাবনা এবং গড় পরিমাপ করা যায়। খুব সহজ ভাবে বললে প্রোবাবিলিটি হল দুটি সংখ্যার অনুপাত। এটিকে শতাংশ হিসাবেও প্রকাশ করা যায়। যদি আপনি ৭০ বার টস করেন এবং তাতে ৩৫ বার হেড আসে তাহলে হেড আসার প্রোবাবিলিটি হল ৩৫/৭০ বা ৫০ শতাংশ। যদিও এটা সঠিক হিসাব নয় এবং এর মধ্যে অনেক শর্ত আছে। আপনার বোঝার সুবিধার্থে সে গাণিতিক জটিলতায় আর গেলাম না। যা হোক, এখানে অনিশ্চয়তা কতটা আছে সেটাও বলা যায়। কারণ ওই যে বললাম আগে, সিস্টেম টা নন-ডিটারমিনিস্টিক এক্ষেত্রে। ক্ষেত্রটা যখন অজানা তখন অনিশ্চয়তা থাকাটা স্বাভাবিক। প্রোবাবিলিটি থিওরির প্রয়োগ গণিতের উপর নির্ভরশীল বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম। সে অর্থনীতি, সমাজনীতি, রাশিবিজ্ঞান, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, ভূতত্ত্ব বা যেকনো ইঞ্জিনিয়ারিং বিদ্যা যাই হোক না কেন। ভাবলে আশ্চর্য হবেন যে বঙ্গোপসাগরে যদি ঝড় ওঠে তাহলে ঝড়ের গতিমুখ কি হবে সেটার একটা ধারণা দেওয়া যেতে পারে এর মাধ্যমে। “স্টোকাস্টিক প্রসেস” বলে একটা বিষয় আছে প্রোবাবিলিটি থিওরিতে। সেখানে এটা ধরা হয় যে অনেকগুলো ইভেন্ট একটা স্রোতের মত আসতে পারে। ঝড়ের গতিবেগ নির্ধারণের মত সমস্যাগুলোর মডেলিং-এ এটা কাজে লাগে। 

“অপ্টিমাইজেশন” বলে গণিতে একটি বিশেষ পদ্ধতি আছে যেখানে কোন কিছুর সর্বোচ্চ বা সর্বনিম্ন মান নির্ণয়ের চেষ্টা করা হয়। সব সময় যে এই মান পুরো সঠিক হয় তা নয়, তবু একটা মোটামুটি আভাস পাওয়া যেতে পারে। ধরুন, কলকাতা থেকে চেন্নাই আপনি সড়ক পথে যেতে চান, কোন রাস্তায় গেলে সব থেকে তাড়াতাড়ি পৌঁছতে পারবেন, তার একটা হিসাব কিন্তু এই পদ্ধতিতে আপনি পেতে পারেন। এখানে পেট্রল খরচ, ট্রাফিক জ্যাম, সব কিছু মাথায় রেখেই গণনাটা করা যেতে পারে। এখানেই ওই “অপ্টিমাইজেশন” পদ্ধতি লাগে আর এটাতেও প্রোবাবিলিটি থিওরির প্রয়োগ আছে। আর এটার একটা খুব আশ্চর্য রকমের প্রয়োগ আছে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যে। এমনিতেই এই খননকার্য খুব ব্যয়সাপেক্ষ এবং সহজে বোঝা সম্ভবও নয় যে কোথায় খুঁড়লে সর্বাধিক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া যেতে পারে। এই একই কথা প্রযোজ্য পেট্রোলিয়াম সম্পদ খোঁজার ব্যাপারেও। তো এখানে “বেইসিয়ান অপ্টিমাইজেশন” বলে একটি বহুল প্রচলিত পদ্ধতি আছে যেটার মূল ভিত্তি হল প্রোবাবিলিটি থিওরির “বেইস থিওরেম” এবং “গাউসিয়ান প্রসেস”। এটার মাধ্যমে কোন পদ্ধতি যদি খুব ব্যয়সাপেক্ষ হয় তাহলে খুব কম বার সেটা প্রয়োগ করে সেটার থেকে কি করে সর্বোচ্চ লাভ পাওয়া যেতে পারে তার একটা দিকনির্দেশ পাওয়া যায়। খননকার্যে সেটাই তো মূল উদ্দেশ্য, তাই না? কম খোঁড়াখুড়ি করে বেশি সম্পদ খুঁজে বার করা। এখানে অনিশ্চয়তার প্রয়োগটা খুব উল্লেখযোগ্য। প্রথমে কয়েক বার এই আলোচ্য ব্যয়সাপেক্ষ “পদ্ধতি”কে চালিয়ে ব্যাপারটাকে বোঝার চেষ্টা করা হয়। এটাকে “বেইস থিওরেম”-এর ভাষায় “প্রায়োর” বা “পূর্ববর্তী ধারণা” বলে। এই ধারণাটাকে পরের ধাপে আরো উন্নত করা হয় এবং সেটাকে “পোষ্টেরিওর” বা “পরবর্তী ধারণা” বলে। অনিশ্চয়তার পরিমাপ থেকেই এই “পোষ্টেরিওর” বের করা হয়। আর হ্যাঁ, আলোচ্য “পদ্ধতিটার” একটা গাণিতিক মডেল “গাউসিয়ান প্রসেস” দিয়ে অনুকরণ করা হয় যাতে করে সেটি নকল হিসাবে কাজ করতে পারে আর ব্যয়সাপেক্ষ “পদ্ধতি” টাকে বার বার চালাতে না হয়। শুনতে অবাক লাগলেও  পুরো ব্যাপারটাই একটা ম্যাজিকের মতো কাজ করে।

“মেশিন লার্নিং” নিয়ে আজকাল প্রচুর কথা শোনা যায়। এই বিষয়টা আসলে কম্পিউটার সায়েন্স এবং গণিতের মূলত তিনটি শাখা (বা উপশাখাও বলা যেতে পারে) লিনিয়ার আলজেব্রা, প্রোবাবিলিটি থিয়োরী ও অপ্টিমাইজেশনের এক সংমিশ্রণ। “মেশিন লার্নিং” এর প্রতি ছত্রে প্রোবাবিলিটি থিয়োরী জড়িয়ে আছে। এই বিষয়টার লক্ষ্যই হল কোন শ্রমসাধ্য এবং পুনরাবৃত্তিমূলক কাজকে গাণিতিক মডেলের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় করে তোলা যাতে সেখানে আর মানবশ্রমের প্রয়োজন না পড়ে। মেশিন বা কম্পিউটার তখন সেই কাজটা একজন মানুষের মতোই সম্পন্ন করতে পারে। এর জন্য প্রচুর তথ্য বিশ্লেষণের দরকার পরে। এগুলোকে “হিস্টরিকাল ডেটা” বলা হয়। যখন আপনি কোনো ই-কমার্স পোর্টালে গিয়ে জিনিস কেনার জন্য অথবা গুগলের পেজে গিয়ে কোনো কিছু জানার জন্য কোনো শব্দবন্ধ বা বাক্য দিয়ে “সার্চ” করেন, তখন জানেন কি পেছনে কি কাজ করে? কীভাবে সমস্ত তথ্য আপনার চোখের সামনে ফুটে ওঠে? এই সবের পেছনে “মেশিন লার্নিং”-এর কেরামতি আছে। “অটোনমাস কার” বা “চালকবিহীন গাড়ি” সংক্রান্ত অনেক গবেষণা আজকাল হচ্ছে এবং টেসলার মত বহুজাতিক কোম্পানি বানিয়েও ফেলেছে তা। এটাও সম্ভব হয়েছে “মেশিন লার্নিং” এর জন্য। আরও একটা সহজবোদ্ধ উদাহরণ আছে হাতের কাছেই। কোনো ব্যাঙ্ক কাউকে লোন দেওয়ার আগে সে সেটা পরিশোধ করতে পারবে কিনা তা যাচাই করে নেয়। অনেক ক্ষেত্রেই আধুনিক ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থায় এটা নিখুঁত ভাবে করার জন্য “মেশিন লার্নিং” এর সাহায্য নেওয়া হয়। খুব সাধারণ ভাবে বলা যায়, যেখানেই স্বয়ংক্রিয়তা এবং কোনো প্রকার পূর্বাভাসের প্রয়োজন সেখানেই “মেশিন লার্নিং” এর প্রয়োগের সুযোগ থাকে। অবশ্য এর জন্য পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের প্রয়োজন আছে এবং তারপরেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

আপনি স্টক মার্কেটে ইনভেস্ট করতে চান, কিন্তু বুঝতে পারছেন না কোন স্টক কিনবেন আর আগে থেকে কেনা কোনটা বেচবেন।

ফিনান্স এবং শেয়ার মার্কেটে স্টক ট্রেডিং নিয়ে সবার আজকাল অল্প বিস্তর ধারণা আছে। জানেন কি এই ব্যাপারে আস্ত একটি বিষয় আছে যার নাম “ম্যাথেমেটিক্যাল ফিনান্স” বা “কম্পিউটেশনাল ফিনান্স”? এর পুরোটাই বিভিন্ন গাণিতিক মডেলের উপর দাঁড়িয়ে আছে। ধরুন আপনি স্টক মার্কেটে ইনভেস্ট করতে চান, কিন্তু বুঝতে পারছেন না কোন স্টক কিনবেন আর আগে থেকে কেনা কোনটা বেচবেন। “ইনভেস্টমেন্ট পোর্টফোলিও” বলে একটি শব্দজোড়া ব্যবহৃত হয় খুব আজকাল। আপনার সমস্যা হল যে সেই পোর্টফোলিওটিকে সঠিকভাবে সাজানো যাতে করে আপনি সব থেকে বেশি রিটার্ন পান। এখানেই ম্যাথেমেটিক্যাল ফিন্যান্সের কেরামতি। একটা পোর্টফোলিওর গড় রিটার্ন কত হতে পারে সেটা মোটামুটি বলা যায় এর মাধ্যমে। আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার আছে। শুধু রিটার্ন দেখলেই হবেনা। ঝুঁকি বা রিস্ক কতটা আছে সেটাও দেখতে হবে। রিস্ক এর অর্থ হল সম্ভাব্য ক্ষতি। কোন শেয়ার বেশি রিটার্ন দিলেও দেখতে হবে সেখানে শেয়ার মানের কোন হঠাৎ পরিবর্তন হচ্ছে কিনা। এই পরিবর্তন কিন্তু উপর বা নিচ দুই দিকেই হতে পারে। সেই মত রিস্কের মানও পরিবর্তন হতে থাকে। বেশি রিটার্ন চাইলে অনেক সময় রিস্কও বেশি থাকে। সেই বুঝে ইনভেস্ট করতে হয়। “ম্যাথেমেটিক্যাল ফিন্যান্সে” স্টকের মানকে প্রোবাবিলিটি থিয়োরী এবং স্টোকাস্টিক প্রসেসের (আগে বলেছি এই ব্যাপারে) সাহায্যে মডেলিং করা যায়। এখান থেকে রিস্ক ও রিটার্ণও বের করা যায়। এবার আসা যাক স্টক মার্কেটের অপশন ট্রেডিং এর কথায়। যদিও অপশন ট্রেডিং আমাদের দেশে নিষিদ্ধ কিন্তু বিদেশে এর বহুল প্রচলন আছে। ধরুন, আপনি কোন একটি স্টক কিনতে বা বেচতে চান। হিসাবমত আপনি মার্কেটে ওই শেয়ারের যা দাম সেই অনুসারে কিনতে বা বেচতে বাধ্য। আর সেখানেই অপশন ট্রেডিং এর মজাটা লুকিয়ে আছে। এখানে সামান্য কিছু প্রিমিয়াম যদি আপনি অপর পার্টিকে (মানে ওটা যার শেয়ার তাকে) দেন অগ্রিম হিসাবে, তাহলে সে আপনাকে ওই শেয়ারটা মার্কেটের থেকে কম বা বেশি দামে কিনতে বা বেচতে দেবে। এক্ষেত্রে আপনাকে অনেক বেশি লাভের জন্য সামান্য কিছু খরচ করতে হবে প্রিমিয়ামের জন্য। এই প্রিমিয়ামের সঠিক মূল্য কত হবে সেটি নির্ণয় করার জন্য জটিল গাণিতিক মডেল রয়েছে। সেটাও ওই প্রোবাবিলিটি ও স্টোকাস্টিক প্রসেসের ওপর নির্ভরশীল এবং “ম্যাথেমেটিক্যাল ফিন্যান্সের” অন্যতম আলোচ্য বিষয়।

“মৃত্যু”কে একটা ইভেন্ট বা ঘটনা হিসাবে চিহ্নিত করে সময়ের সঙ্গে মৃত্যু না ঘটার বা বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কত আছে সেটি বিভিন্ন গাণিতিক মডেলের মাধ্যমে পরিমাপ করা যায়।

আর একটা বিষয়ের কথা না বললে পুরো আলোচনাটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে বলে আমি মনে করি। অতিমারীর কারণে সারা বিশ্বেই এখন ত্রস্ত অবস্থা। সেই জন্য বিভিন্ন রকমের জীবনদায়ী ওষুধ নিয়ে ব্যাপক গবেষণা চলছে সব জায়গায়। এই ওষুধগুলি ঠিকঠাক ভাবে মানব শরীরে কাজ করছে কিনা বা মৃত্যুকে প্রতিহত করতে পারছে কিনা তার একটা গাণিতিক পরিমাপের প্রয়োজন আছে ভীষণ রকমভাবে। এই ধারণার উপর ভিত্তি করেই “সারভাইভাল আনালিসিস” নামক গণিতের একটা শাখার উৎপত্তি। এটাও সম্পূর্ণভাবে প্রোবাবিলিটি থিওরির উপর নির্ভরশীল। এখানে “মৃত্যু”কে একটা ইভেন্ট বা ঘটনা হিসাবে চিহ্নিত করে সময়ের সঙ্গে মৃত্যু না ঘটার বা বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কত আছে সেটি বিভিন্ন গাণিতিক মডেলের মাধ্যমে পরিমাপ করা যায়। সেই জন্যেই বিষয়টির নামে “সারভাইভাল” শব্দটি আছে যার বাংলা অর্থ “বেঁচে থাকা”। তাহলে ভাবুন, কোন ড্রাগ মানুষ কে বাঁচাতে পারছে কিনা অর্থাৎ বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়াতে পারছে কিনা সেটা জানতে পারলে কতটা সুবিধা হয় গবেষণায়। এখানে সময় একটা গুরুত্বপূর্ণ কারক হিসাবে কাজ করে এবং সময়ের সাপেক্ষেই “বেঁচে থাকার” সম্ভাবনা পরিমাপ করা হয়। ব্যাপারটা এই রকম, ধরুন কেউ কোন দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত এবং তার চিকিৎসা চলছে কোন একটি বিশেষ ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে। তাহলে, আগামী ৬ মাস বা ১ বছর পর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কত? এটা “সারভাইভাল আনালিসিস” বলতে পারে কিছু বিশেষ তথ্য বিশ্লেষণের পর। দুটো ড্রাগের তুলনামূলক পরীক্ষাও করা যেতে পারে। বেঁচে থাকার সম্ভাবনা যেটা বেশি বাড়িয়ে তুলতে পারে স্বাভাবিক ভাবে সেই ড্রাগটা বেশি কার্যকর। অবশ্য শুধু “মৃত্যু” কেন? যে কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগকেও মডেলিং করা যেতে পারে এই পদ্ধতিতে। এক্ষেত্রে ঘটনা বা ইভেন্ট হতে পারে বন্যা, ভূমিকম্প ইত্যাদি। এই সব ঘটনা ঘটার একটা সম্ভাবনা এবং কি কারণে ঘটতে পারে তার একটা ইঙ্গিত “সারভাইভাল আনালিসিস” দিতে পারে। জানলে অবাক হবেন, আপনার জীবন বীমার প্রিমিয়াম কত হতে পারে সেটিরও একটা আভাস পাওয়া যেতে পারে এর মাধ্যমে। 

পরিশেষে এটাই বলব যে এই প্রোবাবিলিটি থিওরি গণিতের এক আশ্চর্য উদ্ধাবন। অনিশ্চয়তাকে জানার এর থেকে ভালো উপায় বোধকরি আর নেই। তাই ব্যবহারিক দিকটা বুঝে এগোলে ব্যাপারটা অনেক সহজবোধ্য হয় আর গণিতচর্চার ভীতিটাও দূর হয়।

——————————–

লেখক পরিচিতি: লেখক পেশায় একজন ডেটা সায়েন্টিস্ট ও মেশিন লার্নিং বিশারদ। কাজ করেছেন বিভিন্ন বহুজাতিক সংস্থায়। গণিতের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে চর্চাও করেন।  লিখেছেন মেশিন লার্নিং এবং অ্যাপ্লায়েড প্রোবাবিলিটির উপর দুটি বইও।

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।