দূষণহীন বৈদ্যুতিক গাড়ী: দ্বিতীয় পর্ব

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
98 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

~ কলমে দেবাশিস দাশগুপ্ত ~

দূষণহীন বৈদ্যুতিক গাড়ী প্রসঙ্গে আমরা আগে আলোচনা করেছি অ্যালুমিনিয়াম-বায়ু ব্যাটারী প্রযুক্তি নিয়ে। আজকের আলোচনা হাইড্রোজেন জ্বালানী কোষ চালিত বৈদ্যুতিক যান নিয়ে। অন্য বৈদ্যুতিক যানের (EV) মতো জ্বালানী কোষ বা ফুয়েল সেল চালিত বৈদ্যুতিক যানও (FCEVs) বৈদ্যুতিক মোটর দ্বারা চালিত। অন্যান্য বৈদ্যুতিক গাড়িতে যেমন ব্যাটারি থেকে বিদ্যুৎ পাওয়া যায়, FCEV তে তেমনই হাইড্রোজেন দ্বারা চালিত জ্বালানী কোষ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। উপযুক্ত আকারের জ্বালানী কোষ এবং ব্যাটারির সংমিশ্রণ থেকে FCEV বৈদ্যুতিক শক্তি গ্রহণ করে। FCEV ডিজাইন করার সময় ব্যাটারি চার্জ করার জন্য প্লাগ-ইন ব্যবস্থার সংস্থান রাখা হয়। বেশিরভাগ FCEV তে ব্যাটারি ব্যবহার করা হয় regenerative braking অর্থাৎ মন্দন জনিত সৃষ্ট শক্তি পুনরুদ্ধার করার জন্য যা স্বল্প সময় ব্যাপী ত্বরণ কালে অতিরিক্ত শক্তি প্রদান করতে ব্যবহার করা হয়। এছাড়া এই ব্যাটারি থেকে প্রাপ্ত অতিরিক্ত শক্তি জ্বালানী কোষ থেকে সরবরাহ করা শক্তিকে নির্ধারিত মাত্রায় ধরে রাখতে সাহায্য করে। Idle running বা অলস চালনা এবং কম বিদ্যুতের প্রয়োজনের সময় জ্বালানী সেল বন্ধ করে এই ব্যাটারি থেকে শক্তি সংগ্রহ করা হয়। FCEVএর সঞ্চিত শক্তির পরিমাণ হাইড্রোজেন জ্বালানী ট্যাঙ্কের আকার দ্বারা নির্ধারিত হয়। এটি একটি সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক গাড়ি (all electric vehicle) থেকে আলাদা, যেখানে প্রাপ্ত শক্তি এবং তার পরিমাণ উভয়ই ব্যাটারির আকারের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। ফুয়েল সেল ইলেকট্রিক গাড়ির বিভিন্ন অংশগুলি সম্পর্কে এবারে আলোচনা করা যাক।

 হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল ইলেকট্রিক গাড়ির মূল উপাদানগুলি হল ট্র্যাকশন ব্যাটারি প্যাক, একটি সহায়ক ব্যাটারি, কনভার্টর মডিউল, ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন মোটর, ফুয়েল সেল স্ট্যাক, ফুয়েল ট্যাঙ্ক, পাওয়ার ইলেকট্রনিক্স কন্ট্রোলার, শীতলীকরণ ব্যবস্থা (cooling system) এবং ইলেকট্রিক ট্রান্সমিশন সিস্টেম।

DC/DC converter module ডিভাইসটি ট্র্যাকশন ব্যাটারি প্যাক থেকে উপলব্ধ উচ্চ-ভোল্টেজের ডিসি পাওয়ারকে গাড়ির আনুষঙ্গিক সিস্টেমগুলি চালানোর জন্য এবং সহায়ক ব্যাটারি রিচার্জ করার জন্য প্রয়োজনীয় নিম্ন-ভোল্টেজ ডিসি পাওয়ারে রূপান্তরিত করে। ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন মোটর ফুয়েল সেল এবং ট্র্যাকশন ব্যাটারি প্যাক থেকে উৎপন্ন শক্তি ব্যবহার করে গাড়ির চাকা ঘোরায়। ফুয়েল সেল স্ট্যাক বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেন ব্যবহার করে। হাইড্রোজেন ফুয়েল ট্যাঙ্ক ফুয়েল সেলের জন্য প্রয়োজনীয় হাইড্রোজেন গ্যাস গাড়িতে সঞ্চয় করে রাখে। পাওয়ার ইলেকট্রনিক্স কন্ট্রোলার ফুয়েল সেল এবং ট্র্যাকশন ব্যাটারি দ্বারা প্রদত্ত বৈদ্যুতিক শক্তির প্রবাহকে পরিচালনা করে মোটরের গতি এবং টর্ক নিয়ন্ত্রণ করে। শীতলীকরণ ব্যবস্থার মাধ্যমে ফুয়েল সেল, বৈদ্যুতিক মোটর, পাওয়ার ইলেকট্রনিক্স এবং অন্যান্য উপাদানগুলির সঠিক তাপমাত্রা বজায় রাখা হয়। ট্রান্সমিশন সিস্টেম বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন মোটরের সাহায্যে বৈদ্যুতিক শক্তিকে যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তরিত করে চাকা ঘোরায়।

বৈদ্যুতিক গাড়ির মতোই এটি একটি প্রপালশন সিস্টেম বা পরিবহন পরিচালনা ব্যবস্থা যার মাধ্যমে হাইড্রোজেনের সঞ্চিত শক্তি জ্বালানী কোষ দ্বারা বিদ্যুতে রূপান্তরিত করে ব্যবহার করা হয়। স্বাভাবিক কারণে প্রচলিত অভ্যন্তরীণ দহন ইঞ্জিনের (internal combustion engine) নির্গম নলে (tail pipe) যে ক্ষতিকারক নির্গমন আমরা লক্ষ্য করে থাকি এখানে সেটা অনুপস্থিত। জ্বালানী কোষ দূষণহীন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এবং দক্ষতার সাথে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হাইড্রোজেন বা অন্যান্য জ্বালানির রাসায়নিক শক্তিকে ব্যবহার করে থাকে। হাইড্রোজেন জ্বালানীর ক্ষেত্রে এই বিক্রিয়ার ফলে তৈরি হয় বিদ্যুৎ, জল এবং তাপ। প্রচলিত দহন-ভিত্তিক প্রযুক্তির তুলনায় জ্বালানী কোষের বেশ কিছু সুবিধা রয়েছে যেমন জ্বালানী কোষগুলি অভ্যন্তরীণ দহন ইঞ্জিনের চেয়ে উচ্চ দক্ষতায় কাজ করতে পারে এবং জ্বালানীতে থাকা রাসায়নিক শক্তিকে সরাসরি বৈদ্যুতিক শক্তিতে রূপান্তর করতে পারে যার দক্ষতা ৬০% এর কাছাকাছি। হাইড্রোজেন জ্বালানী কোষে এই পুরো বিক্রিয়াটা হয় শূন্য নির্গমনের মাধ্যমে— কোনো কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন ছাড়া, শুধুমাত্র জল নির্গত হয়। 

জ্বালানী কোষগুলি ব্যাটারির মতো কাজ করে, তবে সেগুলি শেষ হয় না বা রিচার্জ করার প্রয়োজন হয় না। যতক্ষণ জ্বালানি সরবরাহ করা হয় ততক্ষণ তারা বিদ্যুৎ এবং তাপ উৎপাদন করে। একটি জ্বালানী কোষে দুটি ইলেক্ট্রোড থাকে— একটি অ্যানোড এবং একটি ক্যাথোড আর তার মধ্যে থাকে ইলেক্ট্রোলাইট। জ্বালানী কোষে যা ঘটে তা হচ্ছে ইলেক্ট্রোকেমিক্যাল বা বৈদ্যুতিক-রাসায়নিক বিক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় দুটি রাসায়নিক বস্তু ক্রিয়াশীল, কিন্তু সেই সেইসঙ্গে এটি একটি বৈদ্যুতিক বিক্রিয়াও বটে কারণ বিক্রিয়াটি চলার সাথে সাথে বিদ্যুৎও উৎপন্ন হয়। ফুয়েল সেলে একটি ব্যাটারির মতো তিনটি মূল অংশ থাকে। একটি পজিটিভ বা ধনাত্মক চার্জযুক্ত টার্মিনাল (লাল রঙে দেখানো হয়েছে), একটি নেগেটিভ বা ঋণাত্মক চার্জযুক্ত টার্মিনাল (নীলরঙে দেখানো হয়েছে) এবং এই দুটির মধ্যে রয়েছে ইলেক্ট্রোলাইট নামক একটি রাসায়নিক (হলুদ রঙে দেখানো হয়েছে), যা তাদের আলাদা করে রাখে। পুরো জিনিসটিকে একটি স্যান্ডউইচের মতন। 


একটি জ্বালানী কোষ কিভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে তা এখানে বর্ণনা করা হয়েছে

১) ট্যাঙ্ক থেকে হাইড্রোজেন গ্যাস (মেরুন রঙের বিন্দু হিসাবে দেখানো হয়েছে) একটি পাইপের মাধ্যমে পজিটিভ টার্মিনালে প্রেরণ করা হয়। হাইড্রোজেন দাহ্য এবং বিস্ফোরণ প্রবণ, তাই ট্যাঙ্কটি অত্যন্ত শক্তিশালী হতে হবে।

২) বাতাস থেকে অক্সিজেন ( আকাশী রঙের বিন্দু হিসাবে দেখানো হয়েছে) দ্বিতীয় একটি পাইপের মাধ্যমে নেগেটিভ টার্মিনালে পাঠানো হয়।

৩) পজিটিভ টার্মিনাল মূল্যবান ধাতু প্ল্যাটিনাম দিয়ে তৈরি। এটি একটি অনুঘটক যার কাজ জ্বালানী কোষে ঘটে যাওয়া রাসায়নিক বিক্রিয়ার গতি ত্বরাণ্বিত করা। যখন হাইড্রোজেন গ্যাসের পরমাণুগুলি অনুঘটকের কাছে পৌঁছায়, তখন তারা হাইড্রোজেন আয়ন (প্রোটন) এবং ইলেকট্রনে (ছোট কালো বিন্দু হিসেবে দেখানো হয়েছে) বিভক্ত হয়ে যায়। হাইড্রোজেন আয়নগুলি হচ্ছে ইলেকট্রন মুক্ত হাইড্রোজেন পরমাণু। যেহেতু তাদের একটি প্রোটন এবং একটি ইলেক্ট্রন ছিল তাই একটি হাইড্রোজেন আয়নকে আমরা একটি প্রোটনের মতোই ভাবতে পারি।

৪) প্রোটনগুলি পজিটিভ চার্জযুক্ত যা নেগেটিভ টার্মিনালের প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং ইলেক্ট্রোলাইটের মধ্য দিয়ে তার দিকে অগ্রসর হয়। ইলেক্ট্রোলাইট হল একটি বিশেষ পলিমার (প্লাস্টিক) দিয়ে তৈরি একটি পাতলা ঝিল্লি যার মধ্য দিয়ে শুধুমাত্র প্রোটনগুলি যেতে পারে।

৫) ইলেক্ট্রনগুলি বাইরের সার্কিট বা বর্তনীর (এ ক্ষেত্রে মোটর যা কমলা রঙে দেখানো হয়েছে) মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে নেগেটিভ টার্মিনালে পৌঁছয়। 

৬) বিদ্যুৎ প্রবাহের ফলে বৈদ্যুতিক মোটর শক্তি লাভ করে গাড়ির চাকা ঘোরায়।

৭) নেগেটিভ টার্মিনালে প্রোটন এবং ইলেকট্রনগুলি বায়ু থেকে প্রাপ্ত অক্সিজেনের সাথে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় মিলিত হয়ে জল উৎপন্ন করে।

 ৮) উৎপন্ন জল জলীয় বাষ্প হিসাবে নির্গম নল দিয়ে বেরিয়ে যায়।

 জ্বালানী কোষগুলির শ্রেণীবিভাগ করা হয় প্রাথমিকভাবে তারা যে ধরণের ইলেক্ট্রোলাইট ব্যবহার করে তার দ্বারা। এই শ্রেণিবিন্যাসটি কোষে কি ধরনের ইলেক্ট্রো-রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটবে, কি ধরনের অনুঘটক প্রয়োজন, তাপমাত্রার পরিসর কতটা, প্রয়োজনীয় জ্বালানি ইত্যাদি নির্ধারণ করে স্থির করা হয়। বর্তমানে বিভিন্ন ধরণের জ্বালানী কোষ রয়েছে যার প্রতিটির নিজস্ব সুবিধা, সীমাবদ্ধতা এবং সম্ভাব্য প্রয়োগ রয়েছে। 

পলিমার ইলেক্ট্রোলাইট মেমব্রেন অথবা প্রোটন এক্সচেঞ্জ মেমব্রেন (PEM) ফুয়েল সেল বর্তমানে যানবাহনকে চালনার জন্য একটি প্রচলিত শক্তির উৎস। PEM ফুয়েল সেলের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে উচ্চ শক্তি ঘনত্ব, অন্যান্য জ্বালানী কোষের তুলনায় কম ওজন এবং আয়তন। PEM জ্বালানী কোষে কঠিন পলিমার ইলেক্ট্রোলাইট এবং প্ল্যাটিনাম বা প্ল্যাটিনামজাত সঙ্কর ধাতুর অনুঘটক ধারণকারী ছিদ্রযুক্ত কার্বন ইলেক্ট্রোড ব্যবহার করা হয়। তাদের কাজ করার জন্য প্রয়োজন শুধুমাত্র হাইড্রোজেন, বাতাস থেকে সংগৃহীত অক্সিজেন এবং জল। সাধারণত স্টোরেজ ট্যাঙ্ক থেকে সরবরাহ করা বিশুদ্ধ হাইড্রোজেন জ্বালানী হিসেবে ব্যবহৃত হয়। PEM ফুয়েল সেলগুলি তুলনামূলক ভাবে কম তাপমাত্রায় প্রায় ৮০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেডে কাজ করে। কম তাপমাত্রার জন্য এই ফুয়েল সেলগুলি দ্রুত কাজ শুরু করতে পারে এবং কম ক্ষয়ের কারণে ভাল স্থায়িত্ব পাওয়া যায়। PEM ফুয়েল সেলগুলি গাড়ি, বাস এবং হেভি-ডিউটি ​​ট্রাকের মতো যানবাহনে ব্যবহারের জন্য বিশেষভাবে উপযুক্ত৷ 

PEM জ্বালানী কোষের প্রধান অংশ হল মেমব্রেন ইলেক্ট্রোড অ্যাসেম্বলি (MEA), যার মধ্যে মেমব্রেন বা ঝিল্লি, ক্যাটালিস্ট লেয়ার বা অনুঘটক স্তর (অ্যানোড এবং ক্যাথোড) এবং গ্যাস ডিফিউশন লেয়ার (GDL) অন্তর্ভুক্ত থাকে। GDL অনুঘটক স্তরগুলির বাইরে অবস্থিত এবং অনুঘটক স্তরে বিক্রিয়াকারীদের পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি উৎপন্ন জল বাইরে নিয়ে আসায় সাহায্য করে। যতক্ষণ হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেনের সরবরাহ থাকবে ততক্ষণ ফুয়েল সেলটি চলতে থাকবে। যেহেতু বাতাসে সবসময় প্রচুর অক্সিজেন থাকে তাই ট্যাঙ্কে কতটা হাইড্রোজেন আছে তাই একমাত্র নির্ণয় করবে কতক্ষণ ফুয়েল সেলটি ক্রিয়াশীল থাকবে।

একটি একক ফুয়েল সেল একটি একক ড্রাই-সেল ব্যাটারির সমান বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। এই কারণেই যানবাহনের জন্য ব্যবহৃত জ্বালানী কোষগুলি পরপর একসাথে সংযুক্ত থাকে যাকে ফুয়েল স্ট্যাক বা জ্বালানী কোষগুলির স্তুপ বলা হয়। তারা যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে তা প্রতিটি কোষদ্বারা উৎপন্ন শক্তির দ্বারা গুণিত কোষের সংখ্যার সমান। বিভিন্ন ধরনের ব্যাটারির মত অনেক ধরণের জ্বালানী কোষও আছে, প্রতিটিতে বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়া ব্যবহার করা হয়। উদাহরণ স্বরূপ ক্ষারীয় জ্বালানী কোষ বা Alkaline Fuel Cell (AFC), সলিড-অক্সাইড ফুয়েল সেল (SOFC) বা মাইক্রোবিয়াল ফুয়েল সেলগুলির উল্লেখ করা যেতে পারে। 

হাইড্রোজেন প্রাকৃতিক গ্যাস, বায়োমাস বা জৈবপদার্থ সামগ্রী থেকে অথবা জল থেকে ইলেক্ট্রোলাইসিস পদ্ধতির মাধ্যমে উৎপাদিত হয়। হাইড্রোজেন যান ব্যবহারের প্রধান সুবিধা হল যে এর থেকে গ্রীনহাউস গ্যাস এবং ওজোন স্তর ক্ষয় কারী গ্যাসের নির্গমন হয় না। ২০১৪ সালের হিসাবে অনুযায়ী ৯৫% হাইড্রোজেন মিথেন থেকে তৈরি হয়। জলকে হাইড্রোজেনে রূপান্তরিত করার জন্য নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ইলেক্ট্রোলাইসিস প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হাইড্রোজেন উৎপন্ন করা হয়। কি করে কম খরচে প্রথাগত শক্তির উৎসের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে যথেষ্ট পরিমাণে হাইড্রোজেন উৎপন্ন করা যায় সেই লক্ষ্যে উপযুক্ত প্রযুক্তির নিরন্তর অন্বেষণ এবং গবেষণা চলছে। আশা করা যায় অদূর ভবিষ্যতে পুনর্নবীকরণযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদিত শক্তি বৈদ্যুতিক যানবাহনের জন্য আরও দক্ষতার সাথে ব্যবহার করা হবে। কয়েকটি দেশে ইতিমধ্যেই শক্তি এবং হাইড্রোজেন উৎপাদন করতে পুনর্নবীকরণযোগ্য উৎসগুলি আরও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ আইসল্যান্ড হাইড্রোজেন উৎপাদনের জন্য ভূ-তাপীয় শক্তি এবং ডেনমার্ক বায়ু শক্তি ব্যবহার করছে।

আরেকটি সম্ভাবনা হল ছাদে সৌর প্যানেল যুক্ত একটি যান – যা ইলেক্ট্রোলাইজার দিয়ে সৌর বিদ্যুৎ ব্যবহার করে জলকে হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেন গ্যাসে বিভক্ত করে এবং পরবর্তী কালে এই গ্যাসগুলি আবার জ্বালানী কোষে সংযুক্ত করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। সূর্যের শক্তি সরাসরি ব্যবহার না করে এইভাবে কাজ করার সুবিধা হল যে সূর্যালোকিত দিনে হাইড্রোজেন উৎপাদন এবং সংরক্ষণ করে মেঘলা দিনে বা রাতের বেলায় জ্বালানী কোষ চালানোর জন্য এটি ব্যবহার করা যাবে। ইলেক্ট্রোলাইজার হল ইলেক্ট্রোলাইসিস করার জন্য এমন এক ধরনের ইলেক্ট্রোকেমিক্যাল যান্ত্রিক ব্যবস্থা যার সাহায্যে একটি দ্রবণের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত করে তাকে তার মৌলিক উপাদানগুলির পরমাণুতে বিভাজিত করা হয়।

এখানে একটি খুব সাধারণ ইলেক্ট্রোলাইজার কীভাবে জল থেকে হাইড্রোজেন গ্যাস তৈরি করে তা দেখানো হয়েছে। একটি পাত্রে রাখা দ্রবণের মধ্যে দুটি টার্মিনাল নিমজ্জিত করে একটি ব্যাটারি সংযুক্ত করে বিদ্যুৎ প্রেরণ করা হলে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে এবং দ্রবণটি তার মৌলিক অনুগুলিতে বিভক্ত হয়ে যায়। এই দ্রবণটি যদি বিশুদ্ধ জল (H2O) হয়, তাহলে দেখা যাবে এটি দ্রুত হাইড্রোজেন গ্যাস (নেগেটিভ ইলেক্ট্রোড থেকে নির্গত) এবং অক্সিজেন গ্যাসে (পজিটিভ ইলেক্ট্রোড থেকে নির্গত) বিভক্ত হয়ে যাবে। ভবিষ্যতে ব্যবহারের জন্য এই গ্যাসগুলি সংগ্রহ এবং সংরক্ষণ করা তুলনামূলকভাবে সহজ।

খরচ, কর্মক্ষমতা, এবং স্থায়িত্ব এখনও ফুয়েল সেল উৎপাদনের মূল চ্যালেঞ্জ। কম খরচে ফুয়েল সেল স্ট্যাক এবং অন্যান্য উপাদানগুলি তৈরি করা এবং উন্নত উচ্চ ক্ষমতার উৎপাদন পদ্ধতির দিকে নজর দিয়ে সামগ্রিক উৎপাদন খরচ কমাতে সচেষ্ট হতে হবে। প্ল্যাটিনাম হাইড্রোজেন ফুয়েলযুক্ত পলিমার ইলেক্ট্রোলাইট মেমব্রেন ফুয়েল সেলের সবচেয়ে দামী উপাদানগুলির মধ্যে একটি। তাই এমন পদ্ধতির উপর জোর দিতে হবে যাতে প্ল্যাটিনাম গ্রুপ মেটাল (PGM) এবং PGM-অ্যালয় ক্যাটালিস্টের প্রয়োজন কমানো যায়। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী প্রয়োগের জন্য PGM-মুক্ত অনুঘটক পদ্ধতি উদ্ভাবনের দিকে সচেষ্ট হতে হবে। ফুয়েল সেল অ্যাপ্লিকেশনের জন্য সাধারণত পর্যাপ্ত কর্মক্ষমতা দীর্ঘ সময় ধরে বজায় রাখার প্রয়োজন হয়। ফুয়েল সেল সিস্টেমের জীবন কালের চূড়ান্ত লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে হালকা গাড়ির জন্য ৮০০০ ঘন্টা, ভারী ট্রাকের জন্য ৩০০০০ ঘন্টা। হাইড্রোজেন স্টোরেজ সিস্টেম প্রায় ৫০০ কিলোমিটার ড্রাইভিং পরিসীমা দেবার জন্য খরচ, নিরাপত্তা, কর্মক্ষমতা এবং প্রয়োজনীয়তা মেটানোর কথা মাথায় রেখে তৈরি করা হয়। যে কোনো জ্বালানির তুলনায় ভর প্রতি শক্তি হাইড্রোজেনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ। কিন্তু এর আয়তন প্রতি শক্তি কম তাই উন্নত স্টোরেজ সিস্টেম বা সঞ্চয় পদ্ধতির উদ্ভাবন প্রয়োজন যাতে উচ্চ শক্তি ঘনত্ব অর্জন করা সম্ভব হয়। হাইড্রোজেনকে গ্যাস অথবা তরল হিসাবে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। গ্যাস হিসাবে হাইড্রোজেন সংরক্ষণের জন্য সাধারণত উচ্চ-চাপের ট্যাঙ্কের প্রয়োজন হয় (৩৫০–৭০০ বার চাপ বিশিষ্ট ট্যাঙ্ক)। তরল হিসাবে হাইড্রোজেন সংরক্ষণের জন্য ক্রায়োজেনিক তাপমাত্রা প্রয়োজন কারণ স্বাভাবিক বায়ুমণ্ডলের চাপে হাইড্রোজেনের স্ফুটনাঙ্ক হল (-) ২৫২.৮ ডিগ্রী সেলসিয়াস।

 এই ধরনের গাড়ী রাস্তায় বের করার আগে হাইড্রোজেন পরিকাঠামো হিসেবে হাইড্রোজেন ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থা তৈরি রাখতে হবে। এ ব্যাপারে অনেক বিশেষজ্ঞর মত এই যে হাইড্রোজেন গাড়ির ব্যাপক ব্যবহার বাস্তবায়নে প্রযুক্তিগত এবং অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলি অতিক্রম করতে কয়েক দশক সময় পেরিয়ে যাবে। দূষণহীন গাড়ী ব্যবহারের প্রাথমিক শর্ত হল সবুজ শক্তির ব্যবহার। কিন্তু স্বল্প দক্ষতা বিশিষ্ট হাইড্রোজেনে রূপান্তর প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপেই শক্তির প্রায় ৪০ শতাংশ ক্ষয় হবে। তারপরে সেই হাইড্রোজেনকে অধিক চাপে সংকুচিত করে উচ্চ চাপ যুক্ত ট্যাঙ্কগুলিতে সংরক্ষণ করতে আরও শক্তির ব্যবহার হবে। এরপর জ্বালানী কোষে হাইড্রোজেনকে আবার বিদ্যুতে রূপান্তরিত করতে হবে এবং সেখানেও দক্ষতা হ্রাস হবে। ১০০ শতাংশ বৈদ্যুতিক শক্তি থেকে শেষ পর্যন্ত দেখা যাবে যে শুধুমাত্র ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বিদ্যুৎই কেবল পাওয়া যাবে। কাজেই আজকের দিনে স্বাভাবিক ভাবেই এই প্রযুক্তির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। 

ফুয়েল সেল যান এখনও পর্যন্ত যানবাহন এবং জ্বালানীর উচ্চ খরচ এবং জ্বালানী-সরবরাহের পরিকাঠামোর অভাব কাটিয়ে উঠতে পারেনি। স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি এবং মিউনিখের টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীদের দ্বারা প্রকাশিত ২০১৬ সালের একটি সমীক্ষা অনুযায়ী তুলনামূলক ভাবে কম খরচ এবং উল্লেখযোগ্যভাবে উচ্চ শক্তি দক্ষতার কারণে ফুয়েল সেল চালিত গাড়ির তুলনায় বৈদ্যুতিক ব্যাটারি চালিত যানবাহনে বিনিয়োগ করা বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে একটি অধিক লাভজনক বিকল্প। হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল গাড়ি যা নিয়ে এখানে আলোচনা হল এবং আল্যুমিনিয়াম -বায়ু ব্যাটারী চালিত গাড়ির প্রযুক্তি (যা নিয়ে আগে আলোচনা করা হয়েছে)— এই দুটোই emerging technology বা আগামী দিনের জন্য সম্ভাব্য প্রযুক্তি। সেই লক্ষ্যে পৌঁছতে এখনও হয়তো কিছু সময় বাকি। কিন্তু আমাদের তো থেমে থাকলে চলবেনা। জীবাশ্ম জ্বালানী চালিত গাড়ীর দূষণের সমস্যা থেকে অচিরেই মুক্তি পেতে আমাদের লক্ষ্য এখন হওয়া উচিত বৈদ্যুতিক গাড়ির উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার, যা বর্তমানে সম্যকরূপে উপলব্ধ। এই নিয়ে আমরা বিশদে আলোচনা করব পরবর্তী পর্যায়ে।

——————————

লেখক পরিচিতি: এলেবেলের অতিথি দেবাশিস দাশগুপ্ত একজন অবসরপ্রাপ্ত পরামর্শদাতা প্রযুক্তিবিদ (Retired Consulting Engineer)

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।