অতিপরিবাহিতার ১..২..৩ (দ্বিতীয় পর্ব)

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
113 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

~ কলমে এলেবেলে ঋত্বিক ~

প্রথম পর্বে আলোচনা করা হয়েছিল, পরীক্ষাগারে অতিপরিবাহিতা কীভাবে আবিষ্কৃত হল, এবং অতিপরিবাহীর তড়িৎ সম্পর্কিত ধর্ম (electric property) নিয়ে। এই পর্বে যা নিয়ে আলোচনা হবে, তা হলো অতিপরিবাহীর চৌম্বকীয় ধর্ম (magnetic property)। 

সবার আগে আপনারা একবার এলেবেলে থেকে প্রকাশিত “চুম্বক তবে চুম্বক হল কেন” এই লেখাটি পড়ে আসতেই পারেন। এখানে চুম্বক সম্পর্কে সংক্ষেপে দুটি জিনিস সম্পর্কে বলে রাখা যাক; 

এক, চৌম্বক বলরেখা(Magnetic Flux): কিছু দিকনির্দেশক কাল্পনিক রেখা(ছবি দ্রষ্টব্য) একটি দন্ডচুম্বকের দুই প্রান্ত যুক্ত করেছে। চুম্বকের কার্যকারিতা এই রেখা দিয়ে নির্ধারিত হয়। বলা ভালো, চৌম্বকক্ষেত্রকে এই কাল্পনিক রেখাগুলির সাহায্যে উপলব্ধি বা visualise করা হয়। পদার্থবিদ্যার প্রচলিত পন্থা(convention) অনুযায়ী এই রেখা উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরুর দিকে আঁকা হয়। আর চৌম্বক বলরেখার সজ্জা, কোন স্থানে চৌম্বকক্ষেত্র কতটা শক্তিশালী তা নির্দেশ করে। কোন স্থানের মধ্যে দিয়ে যদি বেশি সংখ্যক চৌম্বক বলরেখা চলে যায়, তবে সেই স্থানে চৌম্বক ক্ষেত্র খুব বেশি শক্তিশালী, বা সেখানে চৌম্বকক্ষেত্র প্রাবল্যর মান খুব বেশি।

দুই, তীরশ্চুম্বকীয়তা (Diamagnetic property): লোহা চুম্বকের কাছে আনলে আকর্ষিত হয়। এর বিপরীত ধর্ম, অর্থাৎ কোন পদার্থকে চুম্বকের কাছে আনলে যদি বিকর্ষিত হয়, তবে বলা হবে সেই পদার্থটি তীরশ্চুম্বকীয় বা Diamagnetic। কোন Diamagnetic বস্তুর মধ্যে চৌম্বক বলরেখা প্রবেশ করতে পারে না। 

যখন শুধু তাপমাত্রা কমিয়ে অতিপরিবাহিতা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিলো, তখন একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রার কম তাপমাত্রায় কিছু পদার্থ, অতিপরিবাহীতা প্রদর্শন করছিলো। এর পরের পরীক্ষানিরীক্ষায় দেখা গেলো, শুধু তাপমাত্রা নয়, চৌম্বকক্ষেত্র একটি গুরুত্ত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এক্ষেত্রে। কোন বস্তুকে যদি তাপমাত্রা কমিয়ে সাধারণ অবস্থা থেকে অতিপরিবাহীতে রূপান্তরিত করা হয় এবং তারপর সেটিকে চৌম্বকক্ষেত্রের মধ্যে রাখা হয়, তবে চৌম্বক বলরেখাগুলি, সেই অতিপরিবাহীর মধ্যে প্রবেশ করতে পারে না। আবার সাধারণ অবস্থায়(যখন তার মধ্যে দিয়ে চৌম্বক বলরেখা যেতে পারে), সেই অবস্থা থেকে যদি তাপমাত্রা কমানো শুরু হয়, তবে ক্রিটিক্যাল তাপমাত্রাতে(যে তাপমাত্রায় সাধারণ অবস্থা থেকে কোন কোন বস্তু অতিপরিবাহী হয়,Tc) পৌঁছালে, বস্তুটি নিজের মধ্যে থেকে চৌম্বক বলরেখাগুলিকে বের করে দেয়!(ছবি দেখতে পারেন)

এই ঘটনাটি মেইসনার এফেক্ট নাম পরিচিত। 

১৯৩৩ সালে এই ঘটনাটি আবিষ্কার করেন, বিজ্ঞানী মেইসনার এবং ওসেনফেল্ড। আগে শুধু দেখা যাচ্ছিল, যে একটা ক্রিটিক্যাল তাপমাত্রা(Tc) আছে যার নিচে গেলে কোন বস্তুর সাধারণ অবস্থা থেকে অতিপরিবাহী হয়, অথবা সেই তাপমাত্রা থেকে বেশি তাপমাত্রায় সেটির অতিপরিবাহী দশা ধ্বংস হয়, বস্তুটি সাধারণ অবস্থায় ফিরে আসে। এখন মেইসনার এফেক্ট আবিষ্কারের ফলে জানা গেলো যে একটি ক্রিটিক্যাল চৌম্বকক্ষেত্র(Hc)-ও আছে, কোন অতিপরিবাহীকে তার বেশি মানের চৌম্বক ক্ষেত্রে রাখলে, তার অতিপরিবাহিতা নষ্ট হয়ে যাবে।

অতিপরিবাহীর দশা-চিত্র: নীল অংশটি অতিপরিবাহী দশা, আর তার বাইরের অংশ সাধারণ দশা। A অতিপরিবাহী(সসীম তাপমাত্রা এবং সসীম চৌম্বক ক্ষেত্রপ্রাবল্যে), আর B এবং C সাধারণ। A থেকে সাধারণ দশা C তে যাওয়া যায়, তাপমাত্রা বাড়িয়ে। আবার তাপমাত্রা অপরিবর্তিত রেখে চৌম্বক ক্ষেত্র প্রাবল্য বৃদ্ধি করলেও সাধারণ দশায় যাওয়া যায়, সেটা দেখাচ্ছে A থেকে B বিন্দু সংযোগকারী রেখা।

অতিপরিবাহী প্রকৃতপক্ষে আদর্শ তীরশ্চুম্বকীয়তা(perfect diamagnetism) দেখায়, কারণ চৌম্বক বলরেখা তার মধ্যে প্রবেশ করতে পারে না। অতিপরিবাহী চৌম্বকক্ষেত্র দ্বারা বিকর্ষিত হয়(Hc-র থেকে কম), তাই যদি কোন অতিপরিবাহীর উপর একটা ছোট চুম্বক রাখা হয়, তাহলে দেখা যাবে সেটি হাওয়ায় ভাসছে, কারণ, অতিপরিবাহীর বিকর্ষণ বল সেই চুম্বকটির ওজনের বিরুদ্ধে কাজ করে তাকে হাওয়ায় ভাসিয়ে রাখতে সক্ষম হচ্ছে। 

এই ঘটনাকে ম্যাগনেটিক লেভিটেশান বলা হয়। 

চৌম্বকীয় ধর্ম এতো কেন গুরুত্ত্বপূর্ণ অতিপরিবাহিতার ক্ষেত্রে? কারণ এই দৃষ্টিকোণ থেকেই গবেষণাগারে প্রাপ্ত অতিপরিবাহীকে দুই শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়। এই দুটি শ্রেণী হল টাইপ I(ওয়ান) অতিপরিবাহী এবং টাইপ II(টু) অতিপরিবাহী।

এদের মধ্যে সাধারণ পার্থক্য কি? 

টাইপ I(ওয়ান) অতিপরিবাহীর ক্ষেত্রে একটিমাত্র ক্রিটিক্যাল চৌম্বকক্ষেত্র প্রাবল্যের মান (Hc) বর্তমান। চৌম্বক ক্ষেত্রপ্রাবল্যের মান Hc এর কম হলে সব সময় অতিপরিবাহিতা বর্তমান থাকবে। যেই মাত্র চৌম্বকক্ষেত্র প্রাবল্যের মান Hc কে অতিক্রম করবে, সাথে সাথে অতিপরিবাহিতা নষ্ট হয়ে যাবে, পদার্থটি সাধারণ অবস্থায় চলে আসবে। 

টাইপ II (টু) অতিপরিবাহী আবার একটু আলাদা এবং জটিল। এর দুটি ক্রিটিক্যাল চৌম্বকক্ষেত্র প্রাবল্য বর্তমান, Hc1আর Hc2। যতক্ষণ চৌম্বকক্ষেত্রের মান Hc1 এর নিচে আছে, টাইপ I(ওয়ান) আর টাইপ II(টু) এর মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। কিন্তু যেই Hc1 অতিক্রম হবে, সুপার কন্ডাক্টিভিটি কিছুটা হ্রাস পাবে, কিন্তু সাধারণ অবস্থায় আসবে না। চৌম্বক ক্ষেত্রপ্রাবল্য আরও বাড়িয়ে Hc2 অবধি গেলে তবেই অতিপরিবাহীটি সম্পূর্ণ সাধারণ অবস্থায় আসবে। 

টাইপ I সুপার কন্ডাক্টরকে soft সুপারকন্ডাক্টর বলা হয়। টাইপ II সুপার কন্ডাক্টরকে বলা হয় Hard সুপারকন্ডাক্টর, যেহেতু এরা একটু বেশি পাল্লার চৌম্বকক্ষেত্রকে সহ্য করতে পারে।

কয়েকটা উদাহরণ, 

টাইপ I সুপার কন্ডাক্টর: পারদ, টিন, লেড নায়োবিয়াম। 

টাইপ II সুপার কন্ডাক্টর: কিছু ধাতু সংকর (NbTi, Nb3Sn),ধাতব অক্সাইড এবং সেরামিক পদার্থ(YbBa2Cu3O7)

এই দুই পর্বে আলোচিত হল, অতিপরিবাহিতা কীভাবে আবিষ্কার হয়, এবং পদার্থের সাধারণ ধর্ম থেকে তা কীভাবে আলাদা। 

এর পর যে প্রশ্ন আসে তা হল, অতিপরিবাহিতা কেন?

 কম তাপমাত্রায় কি হয় যার জন্য, একটি পদার্থ সাধারণ অবস্থা থেকে অতিপরিবাহী হয়?

 কি বা এমন ঘটে চৌম্বকক্ষেত্র বাড়ালে যে অতিপরিবাহিতা ধর্মটি আবার ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়? 

এই প্রশ্নগুলির উত্তর দিয়ে গিয়েছেন বিজ্ঞানী বার্ডিন, কুপার এবং শ্রীফার এবং তাদের বিখ্যাত BCS তত্ত্ব। তবে BCS তত্ত্ব টাইপ I অতিপরিবাহী এবং কিছু টাইপ II অতিপরিবাহীর ধর্মকে ব্যাখ্যা করলেও, কিছু টাইপ II ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হয়নি। 

পরের পর্বে আলোচনা করার চেষ্টা হবে এই BCS তত্ত্ব নিয়ে, যতটা সম্ভব কম সমীকরণের অবতারণা করে… 

তথ্যসূত্র: 

  1. https://www.ias.ac.in/describe/article/reso/022/05/0461-0473 
  2. Introduction to Superconductivity, Michael Tinkham
  3. Introduction to Solid State Physics, Charles Kittel

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।