দূষণহীন বৈদ্যুতিক গাড়ী: তৃতীয় পর্ব

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
84 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

~ কলমে দেবাশিস দাশগুপ্ত ~

দূষণহীন বৈদ্যুতিক গাড়ী প্রসঙ্গে আমরা আগে আলোচনা করেছি অ্যালুমিনিয়াম–বায়ু ব্যাটারী এবং হাইড্রোজেন জ্বালানী কোষ চালিত বৈদ্যুতিক যান নিয়ে। আজকের প্রসঙ্গ সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক যান বা অল ইলেকট্রিক ভেহিকেল (AEV)— যাকে ব্যাটারি চালিত গাড়ীও বলা হয়। এই গাড়ীর প্রযুক্তি বর্তমানে যথেষ্ট পরিণত এবং সারা বিশ্বে তা যথেষ্ট জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। ক্রমবর্ধমান পরিবেশ দূষণ আমাদের বাধ্য করেছে জীবাষ্ম জ্বালানীর পরিবর্তে অন্য বিকল্পের খোঁজে নিরন্তর প্রয়াস চালাবার জন্য। যার ফলশ্রুতি সম্ভাবনাময় নতুন প্রযুক্তির সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক যানের আত্মপ্রকাশ। এই গাড়ীতে একটি ব্যাটারি প্যাকের মধ্যে বৈদ্যুতিক শক্তি সঞ্চয় করে রাখা হয় যা মোটরকে প্রয়োজনীয় শক্তি প্রদান করে। যদিও প্রচলিত বিদ্যুৎ উৎপাদন পদ্ধতি পরিবেশ দূষণ ঘটায়; কিন্তু সমস্ত বৈদ্যুতিক যানবাহনই শূন্য-নিঃসরণের যান হিসাবে বিবেচিত হয় কারণ তারা সরাসরি নিষ্কাশন বা টেলপাইপ নির্গমনের সৃষ্টি করে না। আজকের দিনে বৈদ্যুতিক যান একবার চার্জের মাধ্যমে যতটা দূরত্ব যেতে পারে তা সাধারণত তুলনামূলক ভাবে প্রচলিত যানবাহনের ট্যাঙ্ক ভর্তি পেট্রোল/ডিজেল ব্যবহার করে যত দূর পথ অতিক্রম করা যায় তার থেকে কিছুটা কম। যাই হোক, নতুন মডেলের ক্রমবর্ধমান দূরত্বের পরিসর এবং উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন উন্নত প্রযুক্তির চার্জিং সরঞ্জামের ব্যবহার এই ব্যবধানকে অনেকটাই হ্রাস করেছে। সম্পূর্ণ ব্যাটারি চালিত বৈদ্যুতিক যানে প্রচলিত গাড়ীর অভ্যন্তরীণ জ্বলন ইঞ্জিন বা ইন্টারনাল কম্বাশন ইঞ্জিনের পরিবর্তে একটি বৈদ্যুতিক মোটর থাকে যা গাড়ীকে চালিকা শক্তি প্রদান করে। বৈদ্যুতিক মোটরকে শক্তি দেবার জন্য একটি বড় ট্র্যাকশন ব্যাটারি প্যাক ব্যবহার করা হয় যা আবার একটি চার্জিং আউটলেট বা চার্জিং সরঞ্জামের সাথে সংযোগের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক শক্তি সংগ্রহ করে, যাকে ইলেকট্রিক ভেহিকেল সাপ্লাই ইক্যুপমেন্ট (EVSE) বা বৈদ্যুতিক যানের বিদ্যুৎ সরবরাহ সরঞ্জাম বলা হয়। যেহেতু এটি বিদ্যুতে চলে তাই এতে সাধারণ তরল জ্বালানী, জ্বালানী পাম্প, জ্বালানী লাইন বা জ্বালানী ট্যাঙ্ক এসব কিছুই থাকেনা এবং এটি একটি সম্পূর্ণ ভাবে দূষন মুক্ত গাড়ী। 

বৈদ্যুতিক যানের দক্ষতা এবং চালানোর পরিসীমা ড্রাইভিং অবস্থার উপর ভিত্তি করে উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়। জাতীয় সড়কে ভ্রমণের চেয়ে শহরের মধ্যে ড্রাইভিংয়ের সময়ে এই গাড়ীগুলি বেশি দক্ষতার পরিচয় দেয়। কারণ শহরের মধ্যে ড্রাইভিং এর সময় মাঝে মাঝে ব্রেকিংয়ের মাধ্যমে দাঁড়াতে হয় যা পুনরুজ্জীবনমূলক বা রিজেনারেটিভ ব্রেকিংয়ের সুবিধা গ্রহণ করে ব্যাটারীকে অধিক চার্জ জোগায়। আবার জাতীয় সড়ক বা হাইওয়ে ভ্রমণের ক্ষেত্রে সাধারণত উচ্চ গতিতে একটানা চালাতে বেশি শক্তির প্রয়োজন হয়। ধীরে ধীরে বর্ধিত ত্বরণের তুলনায় দ্রুত ত্বরণের প্রয়োজনীয়তা গাড়ির অতিক্রান্ত দূরত্বের পরিসরকে হ্রাস করে। ভারী বোঝা বহন করা বা উল্লেখযোগ্য চড়াই পথে গাড়ি চালানোর ফলে চার্জ প্রতি দূরত্ব সীমা কমারও সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। এই বৈদ্যুতিক গাড়িতে সহায়ক ব্যাটারির শক্তি গাড়ির আনুষঙ্গিক যন্ত্রাংশে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। গাড়ির চার্জিং পোর্ট ব্যবহার করে গাড়ির ট্র্যাকশন ব্যাটারি প্যাক একটি বাহ্যিক পাওয়ার সাপ্লাইয়ের সাথে সংযোজিত করা হয় চার্জ করার জন্য। DC/DC কনভার্টার ট্র্যাকশন ব্যাটারির উচ্চ-ভোল্টেজের DC পাওয়ারকে নিম্ন ভোল্টেজের DC পাওয়ারে রূপান্তর করে সহায়ক ব্যাটারি রিচার্জ করার জন্য ব্যবহৃত হয়। ট্র্যাকশন ব্যাটারি প্যাকে সঞ্চিত শক্তি ব্যবহার করে, বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন মোটর গাড়ির চাকা ঘোরায়। অনবোর্ড চার্জার চার্জ পোর্টের মাধ্যমে সরবরাহকৃত এসি বিদ্যুৎ গ্রহণ করে এবং ট্র্যাকশন ব্যাটারি চার্জ করার জন্য এটিকে ডিসি পাওয়ারে রূপান্তর করে। এটি চার্জিং সরঞ্জামের সাথেও যোগাযোগ রক্ষা করে এবং প্যাকটি চার্জ করার সময় ব্যাটারির বৈশিষ্ট্য যেমন ভোল্টেজ, কারেন্ট, তাপমাত্রা এবং চার্জের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে। পাওয়ার ইলেকট্রনিক্স কন্ট্রোলার ট্র্যাকশন ব্যাটারি দ্বারা সরবরাহ করা বৈদ্যুতিক শক্তির প্রবাহ পরিচালনা করে, বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন মোটরের গতি এবং এটি যে টর্ক তৈরি করে তা নিয়ন্ত্রণ করে। এছাড়া এর কুলিং সিস্টেম বৈদ্যুতিক মোটর, ট্রান্সমিশন ব্যবস্থা, পাওয়ার ইলেকট্রনিক্স এবং অন্যান্য উপাদানগুলির সঠিক তাপমাত্রা বজায় রাখে। ট্রান্সমিশন ব্যবস্থা বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন মোটর থেকে প্রাপ্ত যান্ত্রিক শক্তি চাকা ঘোরানোর জন্য ব্যবহার করে।

বৈদ্যুতিক যানের জন্য চার্জিং ইনফ্রাস্ট্রাকচার বা পরিকাঠামো এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যার উপর নির্ভর করছে তার ব্যবসায়িক সাফল্য। ওপেন চার্জ পয়েন্ট ইন্টারফেস (OCPI) প্রোটোকলের মাধ্যমে চার্জিং স্টেশনগুলির অবস্থান, বৈদ্যুতিক যান সরবরাহ সরঞ্জাম (EVSE) এবং সংযোগব্যবস্থা বা কানেক্টর সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান লাভ সম্ভব। চার্জিং স্টেশন অবস্থান হল এমন একটি সাইট যেখানে একই ঠিকানায় এক বা একাধিক EVSE পোর্ট রয়েছে; যেমন একটি পার্কিং গ্যারেজ বা একটি শপিং মলের পার্কিং লট। একটি EVSE পোর্টের মাধ্যমে যে কোন সময়ে শুধুমাত্র একটি গাড়িই চার্জ করা সম্ভব যদিও এতে একাধিক কানেক্টর থাকতে পারে। যে ইউনিটে EVSE পোর্ট থাকে তাকে চার্জিং পোস্ট বলা হয়, সেখানে এক বা একাধিক EVSE পোর্ট থাকতে পারে। কানেক্টর গাড়িতে প্লাগ করে চার্জ করা হয়। প্লাগ-ইন বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য চার্জিং সরঞ্জামগুলি ব্যাটারিকে যে হারে চার্জ করা হবে তার উপর নির্ভর করে বিভিন্ন শ্রেণীতে ভাগ করা হয়। ব্যাটারি কতটা ক্ষয় হয়েছে, কতটা শক্তি সঞ্চিত আছে, ব্যাটারির ধরন এবং চার্জিং সরঞ্জামের ধরন (চার্জিং লেভেল এবং পাওয়ার আউটপুট) এর উপর ভিত্তি করে চার্জ করার সময় পরিবর্তিত হয়। এই বিষয়গুলির উপর নির্ভর করে চার্জিং এর সময়সীমা ২০ মিনিট থেকে ২০ ঘন্টা বা তারও বেশি হতে পারে৷ ক্রমবর্ধমান সংখ্যক বৈদ্যুতিক গাড়ির কথা মাথায় রেখে চার্জ স্টেশনগুলির একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক প্রয়োজন।

 

সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক যান বা অল ইলেকট্রিক ভেহিকেল (AEV) শুধুমাত্র বিদ্যুতে চলে। এক বা একাধিক বৈদ্যুতিক মোটর দ্বারা চালিত এগুলি রিচার্জেবল ব্যাটারি প্যাক দ্বারা চালিত হয়। প্রচলিত যানবাহনের তুলনায় ইভির কিছু সুবিধা রয়েছে যেমন পরিবেশগত ভাবে নিরাপদ, তুলনামূলক ভাবে দক্ষ ও কর্মক্ষমতা জনিত সুবিধা। বৈদ্যুতিক যানে ৭৭% এর বেশি গ্রিডের বৈদ্যুতিক শক্তিকে সরাসরি চাকার শক্তিতে রূপান্তরিত করা হয়। প্রচলিত পেট্রোল, ডিজেল চালিত যানবাহনগুলি কেবলমাত্র জ্বালানীর সঞ্চিত শক্তির প্রায় ১২–৩০% চাকার শক্তিতে রূপান্তর করে। বৈদ্যুতিক মোটর শান্ত ও মসৃণ ভাবে চলে এবং শক্তিশালী ত্বরণ প্রদান করে এবং অভ্যন্তরীণ দহন ইঞ্জিনের (ICEs) তুলনায় কম রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন হয়। 

অন্য দিকে পেট্রোল যানের তুলনায় বৈদ্যুতিক যানের কিছু সমস্যা রয়েছে যেমন ড্রাইভিং পরিসীমা, রিচার্জের সময় ও ব্যয়বহুল ব্যাটারি। বেশিরভাগ প্রচলিত যানবাহনের তুলনায় বৈদ্যুতিক যানের ড্রাইভিং পরিসীমা কম, যদিও এর ড্রাইভিং রেঞ্জ ক্রমশঃ উন্নত হচ্ছে। বেশিরভাগ বৈদ্যুতিক যান প্রতি চার্জে নূন্যতম ১৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত যেতে পারে এবং কিছু মডেলের গাড়ি ৩০০ থেকে প্রায় ৪৮০ কিলোমিটারের পর্যন্ত যেতে পারে। ব্যাটারি প্যাকটি সম্পূর্ণভাবে রিচার্জ করতে ৩ থেকে প্রায় ১২ ঘন্টা পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তবে “দ্রুত চার্জ” থেকে ৮০% ক্ষমতা অর্জনের জন্য কমপক্ষে ৩০ মিনিট সময় লাগবে। বৈদ্যুতিক যানের জন্য ব্যবহৃত বর্তমান ব্যাটারিগুলি বর্ধিত জীবনের জন্য ডিজাইন করা হয়েছে এবং এই ব্যাটারিগুলি মাঝারি জলবায়ুতে ১২ থেকে ১৫ বছর এবং চরম জলবায়ুতে ৮ থেকে ১২ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। তবে পুরনো ব্যাটারি পাল্টে নতুন ব্যাটারি লাগানো একটি ব্যয়বহুল ব্যাপার। বৈদ্যুতিক গাড়ির চলার দূরত্বের পরিমাপ একটি সাধারণ পরিবারের দৈনন্দিন ভ্রমণের জন্য পর্যাপ্ত যা প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৮০ কিলোমিটার। আগেই বলেছি যে বর্তমানে অনেক ব্যাটারি চালিত গাড়িই সম্পূর্ণ চার্জ করা অবস্থায় প্রায় ৪৮০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে সক্ষম এবং গাড়ী প্রস্তুতকারী সংস্থারা আগামী বছরগুলিতে আরও দীর্ঘ-পরিসরের মডেলগুলি বাজারে আনবে বলে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বর্তমানে পাবলিক চার্জিং স্টেশনের সংখ্যাও ক্রমশঃ বাড়ছে— এই স্টেশনগুলি সাধারণতঃ হাইওয়ে বরাবর, শপিং মলের পাশে এবং পাবলিক গ্যারেজে পাওয়া যাবে। 

EVSE-এর চার্জিং প্রয়োজনীয়তার উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন পাওয়ার রেটিং নির্ধারণ করা হয়। থ্রি-ফেজ এসি চার্জার, বড় অন বোর্ড চার্জার সহ বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য প্রয়োজন। বিদ্যুতের প্রয়োজনীয়তা অনুসারে এগুলিকে দুই শ্রেণীতে ভাগ করা হয়, সাধারণ পাওয়ার চার্জিং (২২ কিলোওয়াট পর্যন্ত) এবং উচ্চ পাওয়ার চার্জিং (২০০ কিলোওয়াট পর্যন্ত)৷ সিঙ্গল-ফেজ এসি চার্জার, যার সর্বোচ্চ পাওয়ার রেটিং ৭ কিলোওয়াট পর্যন্ত, হাল্কা বৈদ্যুতিক যান এবং সিঙ্গেল ফেজ অন-বোর্ড চার্জার সহ গাড়ির জন্য পর্যাপ্ত। হাইব্রিড এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের জন্য (Faster Adoption and Manufacturing of Electric Vehicles) (FAME) স্কিমের অধীনে ২০২২ সালে (১লা মার্চ পর্যন্ত) ৪৯১টি চার্জিং স্টেশন বসানো হয়েছে। ভারতে ইভি চার্জিং স্টেশন একটি অ্যাপের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত করার পরিকল্পনা আছে যার সাহায্যে অনলাইন রিমোট মনিটরিং এবং একটি স্বয়ংক্রিয় পেমেন্ট গেটওয়ে পরিচালনা করা সম্ভব। এর ফলে সাইটে চার্জারগুলির দেখাশোনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিচালনা করার জন্য কোন স্টেশন ইনচার্জের প্রয়োজন নেই ৷ ভারতে বর্তমানে ২০২১ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত প্রায় ১৬,২০০ টি বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য ১,৮০০টি চার্জিং স্টেশন বসানো হয়েছে ৷ COP21 প্যারিস শীর্ষ সম্মেলনে ২০০৫ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে নির্গমনের পরিমান ৩৩–৩৫ শতাংশ কমানোর লক্ষ্যে ভারত সরকারের প্রতিশ্রুতির পরিপ্রেক্ষিতে, ভারতের দ্রুত অর্থনৈতিক বৃদ্ধি, ক্রমবর্ধমান নগরায়ন, অধিকতর পরিবহনের প্রয়োজনীয়তা এবং শক্তি নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে বিকল্প পরিবহন পদ্ধতি চালু করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চার্জিং পরিকাঠামো হল ইভি বা বৈদ্যুতিক গাড়ির গতিশীলতার মেরুদণ্ড, কিন্তু বর্তমানে এটির সীমিত অস্তিত্ব এবং দীর্ঘ চার্জিং সময়ের কারণে ভারতে ইভির গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে এটি অন্যতম প্রধান বাধা।

ইভি চার্জিং স্টেশন স্থাপনের জন্য বিশেষ প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা প্রয়োজন। ভোল্টেজ ও ফ্রিকোয়েন্সির ওঠানামা, ওভার-কারেন্ট এবং গ্রাউন্ড-ফল্ট প্রধান উদ্বেগের বিষয়। পরিষেবা অঞ্চলগুলির সর্বোচ্চ লোড বৃদ্ধির সমস্যাটির সমাধানের জন্য নেটওয়ার্ক আপ-গ্রেডেশন এবং বিদ্যুৎ সংগ্রহে আরও বেশি বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ সরবরাহ সংস্থাগুলির জন্য বিশেষ লাভজনক হবে না। গ্রাহকদের বিভিন্ন স্থানে এবং বিভিন্ন সময়ের জন্য তাদের যানবাহন চার্জ করার কারণে অপ্রত্যাশিত বিদ্যুতের চাহিদা দেখা দেবে। এর ফলে বিদ্যুতের মানের অবনমন গ্রিডকে ভীষণ ভাবে প্রভাবিত করবে। ইভির আরও ব্যাপক ব্যবহারের ফলে বিদ্যুতের চাহিদার প্রকৃতি পরিবর্তিত হবে যার ফলে ট্রান্সফরমার ওভারলোড, ভোল্টেজ ড্রপ এবং ভোল্টেজের ভারসাম্যহীনতা সহ হারমোনিক্স ইনজেকশনের সমস্যাগুলি সৃষ্টি হবে। এগুলির দিকে নজর না দিলে দামী যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। চার্জিং স্টেশনের অবস্থানের সঙ্গে সঙ্গে সঠিক চার্জিং স্লট খুঁজে পাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর জন্য প্রয়োজনীয় সফ্টওয়্যার তৈরি করা খুবই জরুরী যা জীবনকে সহজ করে তোলে এবং সময় বাঁচায়। এছাড়া এই সফ্টওয়্যার চার্জ শুরু ও বন্ধ, পেমেন্ট পরিচালনা, চার্জের হিসেব রাখা, ডিজিটাল রসিদ তৈরি ইত্যাদি এবং গ্রাহক সহায়তার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে সক্ষম।

 আর একটি বিকল্প ব্যাটারি রিচার্জিং পদ্ধতি হল ব্যাটারি পরিবর্তন, যেখানে একটি ডিসচার্জ হয়ে যাওয়া ব্যাটারি গাড়ি থেকে খুলে নিয়ে সম্পূর্ণ চার্জযুক্ত একটি ব্যাটারি দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়। প্রযুক্তিটি ছোট গাড়ির জন্য বিশেষ ভাবে ফলপ্রসূ। যেখানে অটোম্যাটিক ব্যাটারি সোয়াপিং বা ব্যাটারি পরিবর্তন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ভাবে স্বয়ংক্রিয় সেখানে এই ধরণের সোয়াপিং স্টেশনগুলিতে একটি রোবোটিক হাত ব্যবহার করা হয়। ভারতের সড়ক পরিবহন ও মহা সড়ক মন্ত্রণালয় ব্যাটারি ছাড়াই ইভি বিক্রি এবং রেজিস্ট্রেশনের অনুমতি দিয়েছে, যা ব্যাটারি পরিবর্তন বিকল্প ব্যবস্থার জন্য এক বিরাট রাস্তা খুলে দিয়েছে। এর ফলে ব্যাটারি সোয়াপিং আগামী বছরগুলিতে ভারতে ইভি চার্জিং নেটওয়ার্কগুলির একটি স্বতন্ত্র অংশ হিসাবে পরিগনিত হবে৷ ব্যাটারিগুলি সোয়াপিং পয়েন্ট থেকে দূরে চার্জ করা যেতে পারে, যা প্রতিস্থাপন ব্যবস্থার পক্ষে যথেষ্ট সুবিধাজনক। এর ফলে একজন ইভির মালিক ব্যাটারিটি পর্যাপ্ত পরিমাণ চার্জ হওয়ার জন্য অপেক্ষা না করে সম্পূর্ণভাবে চার্জ করা একটি ব্যাটারি তার ডিসচার্জ ব্যাটারির সঙ্গে বিনিময় করতে পারেন। এর ফলে চালকের সময়ের অনেক সাশ্রয় হবে। ভবিষ্যতে ইভি নির্মাতারা স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী অপসারণযোগ্য (ডিসপোজেবল) ব্যাটারি দিয়ে ইভি তৈরি করবে যার ফলে ইভির সবচেয়ে ব্যয়বহুল উপাদান অর্থাৎ কিনা একটি নতুন ব্যাটারি ছাড়াই ইভির মালিকানার খরচ কমিয়ে দেবে। 

রিচার্জেবল লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি আবিষ্কৃত হয় নব্বইয়ের দশকে। তারপর থেকে আকর্ষণীয় সুবিধার কারণে অনেক শিল্পে এর ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারিগুলি হালকা, কারণ লিথিয়াম হল হালকা ধাতু, খুব শক্তিশালী এবং টেকসই। বিশ্ব জুড়ে লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে গাড়ি নির্মাতারা বৈদ্যুতিক যানবাহনের বিশাল বৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখছে। ইউরোপীয় কমিশন আজ এবং ভবিষ্যতের উপর ভিত্তি করে বৈদ্যুতিক যানবাহনের জন্য লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারির বিশ্বব্যাপী সরবরাহ এবং চাহিদার উপর নীচের পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে।


লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি অনেক সুবিধা জনক তাদের উচ্চতর ব্যবহারযোগ্য ক্ষমতা আছে, তাদের দ্রুত চার্জ করা সম্ভব, তারা কমপ্যাক্ট এবং হাল্কা ওজনের এবং দীর্ঘ দিন ধরে কর্মক্ষম থাকে। লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি আমাদের জীবনকে আরও আরামদায়ক এবং নির্ভরযোগ্য করে তোলার জন্য আদর্শ সমাধান বলে মনে করা হয়। তবে লিথিয়াম ব্যাটারির বেশ কতগুলি অসুবিধাও আছে।

যদি এই ব্যাটারিতে শর্ট-সার্কিট হয় তবে তারা অতিরিক্ত গরম হতে পারে এবং একটি চেইন বিক্রিয়া তৈরি করতে পারে যা “থার্মাল রানঅ্যাওয়ে” নামে পরিচিত। এর ক্রমবৃদ্ধিমান প্রভাবে ব্যাটারিগুলি দ্রুত খুব উচ্চ তাপমাত্রায় পৌঁছায় এবং ধোঁয়া এবং বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হয় এবং আগুন বা বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে, বিশেষ করে যদি তারা অন্যান্য লিথিয়াম ব্যাটারির সাথে শক্তভাবে যুক্ত থাকে। ইভির ব্যাটারি সিস্টেমগুলিতে ৩০০ থেকে ৪০০ ভোল্টেজ রেটিং সহ অনেকগুলি ঘনিষ্ঠভাবে প্যাক করা লিথিয়াম ব্যাটারি কোষ রয়েছে যা প্রায় ৩০০ অ্যাম্পিয়ার কারেন্ট সরবরাহ করে থাকে। তাই কোনো ভারসাম্যহীনতা বা অব্যবস্থাপনার ফলে ব্যাটারিতে আগুন ধরে যেতে পারে বা বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। এই থার্মাল রানঅ্যাওয়ের মুখ্য কারণ গুলি হল নিম্ন মানের ডিজাইন এবং উৎপাদন ত্রুটি, বাহ্যিক তাপ, ওভার চার্জিং, ওভার ডিসচার্জিং, উচ্চ কারেন্ট দ্বারা চার্জিং, কাঠামোগত ত্রুটি ইত্যাদি।

লিথিয়াম-আয়ন কোষগুলিতে “থার্মাল রানঅ্যাওয়ে” প্রক্রিয়ার ফলে আগুন লাগার আগে তার তাপমাত্রা অন্ততঃ কয়েকশ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছতে হবে। বেশিরভাগ আধুনিক ব্যাটারি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ৪৫–৫৫° সেলসিয়াস তাপমাত্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি যদি এই তাপ-ভিত্তিক নিরাপত্তা সতর্কতাগুলি কাজ নাও করে তাহলেও আগুন লাগবেনা না কারণ ব্যাটারিগুলির স্বাভাবিক ক্রিয়াকলাপ চলাকালীন তার তাপমাত্রা কখনই কয়েকশ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছোতে পারে না। ব্যাটারী উৎপাদকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী এমনকি একটি নিম্ন মানের তাপীয় ডিজাইন সহ তৈরি একটি গাড়ির ব্যাটারিতে আশেপাশের পরিবেশের চেয়ে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা বৃদ্ধি ঘটতে পারে তার বেশি নয়। অতি সম্প্রতি বৈদ্যুতিক যানবাহনে অগ্নিকাণ্ডের কয়েকটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ইভি উৎপাদকদের অগ্নি নিরাপত্তা মান পর্যালোচনা করতে এবং মানব জীবনের ঝুঁকি কমানোর জন্য নেওয়া পদক্ষেপগুলি পুনর্বিবেচনা করতে আদেশ জারি করেছে৷ ব্যাটারি মনিটরিং সিস্টেম বা বিএমএস এই ঝুঁকি কমাতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে।এই কারণে বিএমএস ইভির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ কারণ এটি ব্যাটারির নিরাপত্তার তদারকী করে এবং এটিকে ওভারচার্জ বা সম্পূর্ণরূপে ডিসচার্জ হতে দেয় না, যার ফলে এর আয়ুষ্কাল এবং ক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যাটারিতে আগুন ধরার সম্ভাবনাও কমে যায়। ব্যাটারির তাপমাত্রা নির্ধারিত মাত্রার উপরে গেলে বিএমএস স্বয়ংক্রিয়ভাবে শীতলীকরণ প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে এবং ঝুঁকি কমাতে অন্যান্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা সক্রিয় করতে উদ্যোগী হয়।

 

প্রতিটি লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারিতে দুটি ইলেক্ট্রোড থাকে— পজিটিভ বা ধনাত্মক চার্জযুক্ত ক্যাথোড এবং নেগেটিভ বা ঋণাত্মক চার্জযুক্ত অ্যানোড। মাইক্রো ছিদ্রযুক্ত প্লাস্টিকের একটি পাতলা স্তর দ্বারা তাদের একে অপরের থেকে পৃথক করে রাখা হয়। ব্যাটারি চার্জ করার সময়, লিথিয়াম আয়ন ক্যাথোড থেকে বিভাজকের ক্ষুদ্র ছিদ্রগুলি দিয়ে বৈদ্যুতিক পরিবাহী তরলের মধ্য দিয়ে অ্যানোডে চলে যায়। যখন ব্যাটারি ডিসচার্জ হয় তখন বিপরীত প্রক্রিয়াটি ঘটে এবং এই প্রতিক্রিয়ার ফলে বৈদ্যুতিক ডিভাইসটিকে এক্ষেত্রে ইলেকট্রিক মোটরটিকে শক্তি সরবরাহ করা হয়। 

ডিজাইন ও উৎপাদন ত্রুটি বা বিভিন্ন বাহ্যিক অপব্যবহারের কারণ এই সেপারেটর বা বিভাজক অকেজো হয়ে যেতে পারে। যখন এটি ঘটবে তখন অ্যানোড এবং ক্যাথোড সরাসরি সংযুক্ত হয়ে ব্যাটারি অতিরিক্ত গরম হতে শুরু করবে। ব্যাটারি থেকে হিস হিস শব্দ শোনা যাবে, ব্যাটারি ফুলে যাবে এবং ফুটো হয়ে ইলেক্ট্রোলাইট বেরিয়ে আসতে শুরু করবে। অতিরিক্ত উত্তাপ বৈদ্যুতিক শক্তির একটি অনিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে ধোঁয়া, দাহ্য গ্যাস, তাপ (৬০০° থেকে ১০০০° সেলসিয়াস পর্যন্ত), আগুন ও বিস্ফোরণের সৃষ্টি করবে যার ফলে দাহ্য ইলেক্ট্রোলাইট ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসবে। ব্যাটারি জ্বলে যাওয়ার আগে একটি শিখা উদ্ভূত হয়ে শক্তি নির্গত হবে যা সঞ্চিত শক্তির পরিমাণ এবং কোন প্রকারের ব্যাটারি তার উপর নির্ভর করে।

বৈদ্যুতিক যানবাহন ভারতের রাস্তায় সমস্ত পেট্রোল বা ডিজেল চালিত যানবাহনকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিস্থাপন করবে না এবং যেকোনো সভ্য সমাজের পক্ষে রাতারাতি এটিকে ব্যাপকভাবে পরিবর্তন করা সম্ভবও নয়। ভারতের পরিবহন ব্যবস্থায় পর্যায়ক্রমে তেল-জ্বালানি চালিত যানবাহনের সংখ্যা ক্রমাগত হ্রাস পাবে এবং আশা করা যায় যে ২০৩০ সালের মধ্যে, ভারতে ৩০ শতাংশ ব্যক্তিগত গাড়ি, ৭০ শতাংশ বাণিজ্যিক যান, ৪০ শতাংশ বাস, এবং ৮০ শতাংশ দ্বি-চাকার গাড়ি এবং তিন চাকার গাড়ি বৈদ্যুতিক যানে পরিবর্তিত হবে৷ সেজন্য গাড়ি শিল্পের উদ্যোগপতিরা বৈদ্যুতিক গাড়িকে একটি প্রতিশ্রুতিশীল বিকল্প হিসাবে বিবেচনা করছে। বৈদ্যুতিক যানের ব্যাপক ব্যবহার শূন্য কার্বন নির্গমন সহ একটি কার্বন-নিরপেক্ষ বিশ্বের দিকে অগ্রগতির প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবায়িত করবে।বৈদ্যুতিক যানবাহনগুলি সাধারণত জ্বালানি চালিত গাড়ির তুলনায় গাড়ি চালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে ৭৫৮০ শতাংশ কম ব্যয়বহুল, যার ফলে যাদের গাড়ি বেশি ব্যবহার হয় তাদের পক্ষে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং লাভজনক বিকল্প। একটি প্রচলিত গাড়ির তরল জ্বালানী ট্যাঙ্ক ভর্তি করার তুলনায় একটি গাড়ির ব্যাটারি চার্জ করা অপেক্ষাকৃত ভাবে সস্তা।

সুসংবাদ হল কেন্দ্রীয় সরকার এবং রাজ্য সরকারগুলি ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতকে ১০০% বৈদ্যুতিক গাড়ির দেশ হিসাবে গড়ে তোলার জন্য অনেকগুলি পদক্ষেপ নিচ্ছে। এই ধরনের প্রতিশ্রুতিবদ্ধ পদক্ষেপগুলি এবং প্রধান অটোমোবাইল উৎপাদকদের দ্বারা গৃহীত কার্য্যপন্থাগুলির মাধ্যমে আমরা আশা করতে পারি যে আগামী বছরগুলিতে আমাদের যানবাহন এবং পরিবহণ ব্যবস্থায় দ্রুত পরিবর্তন আসতে চলেছে।

——————————

লেখক পরিচিতি: এলেবেলের অতিথি দেবাশিস দাশগুপ্ত একজন অবসরপ্রাপ্ত পরামর্শদাতা প্রযুক্তিবিদ (Retired Consulting Engineer)

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।