বহির্বিশ্বের রহস্য মোচন

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
85 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

~ কলমে এলেবেলে দেবদীপ ~

মহাকাশযান এবং টেলিস্কোপগুলি গত কয়েক দশকে আমাদের নিজের গ্রহের বাইরের বিশ্ব সম্পর্কে প্রচুর তথ্য প্রকাশ করেছে। গত শতকের মাঝামাঝি সময়ের ‘ঠান্ডা লড়াই’ (cold war)-র আবহে প্রথম স্পেস মিশন শুরুর পর থেকে বা এমনকি আরেকটু পরে ষাটের দশকের শেষে নভশ্চারীদের চাঁদে পদার্পণের পর থেকে বহির্বিশ্ব সম্পর্কে মানুষের কৌতূহল উত্তোরত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে— হাজার হাজার ‘এক্সোপ্ল্যানেট’ (আমাদের সৌরজগতের বাইরের কোনো নক্ষত্রকে ঘিরে প্রদক্ষিণ করে এমন গ্রহ) ও অনেক অজানা তথ্য আবিষ্কার হয়ে আসছে। 

এই সুবিশাল মহাবিশ্বের সামগ্রিক আকার বোঝা খুবই কঠিন, আর তা বিজ্ঞানীদের ধারণার চেয়েও দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে (universe is expanding)। যদিও মানুষ কখনই সমগ্র স্পেসের মানচিত্র তৈরি করে উঠতে পারবে না, কিন্তু তাই বলে সেটা আমাদের এটি অন্বেষণ করা থেকে বিরত রাখতে পারেনি।

পৃথিবীর বিভিন্ন সব বিখ্যাত মহাকাশ গবেষণা সংস্থা 

২০১৫ সালে, নিউ হরাইজনস প্রোব প্লুটোর খুব কাছ দিয়ে যাওয়ার সময়, বামন গ্রহ এবং তার উপগ্রহগুলিকে মানবসভ্যতার ইতিহাসে প্রথমবারের জন্য অতটা কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছিল। প্রোবটি প্লুটো এবং তার বৃহত্তম চাঁদ— স্যারনের ভূসংস্থানের (topography) প্রথম উচ্চ-রেজোলিউশন মানচিত্র তৈরি করে, যা ছিল সেই সময়ে ম্যাপ করা পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরবর্তী কোনো বস্তু। নিউ হরাইজনস-র পাওয়া তথ্য থেকেই জানতে পারা যায়, প্লুটোর ব্যাস ১,৪৭৩ মাইল— বিজ্ঞানীদের পূর্বের অনুমানের চেয়ে আদতে বড়। মহাকাশযানটি সেখানে আশ্চর্যজনকভাবে এক গতিশীল এবং সক্রিয় বিশ্বের সন্ধান পায়, যেখানে প্রায় ২০,০০০ ফুট পর্যন্ত উঁচু বরফের পর্বতসমূহ এবং স্থানপরিবর্তনশীল ভূপৃষ্ঠ বতমান, যাদের কোনোটিই ১ কোটি বছরের বেশি পুরানো নয়, অর্থাৎ ভূপ্রকৃতি ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়ে চলেছে৷ সূর্য থেকে গড়ে ৩.৭ বিলিয়ন মাইল দূরে (পৃথিবীর দূরত্বের প্রায় ৪০ গুণ) অবস্থিত হয়েও প্লুটোর এই ভূতাত্ত্বিকভাবে অতিসক্রিয়তা প্রমাণ করে যে, শীতল, দূরবর্তী বহির্বিশ্বও তাদের অভ্যন্তরীণ কাঠামো গরম করার জন্য পর্যাপ্ত শক্তি পেতে সক্ষম, যা সম্ভবত তাদের পৃষ্ঠতলের নীচে তরল জলকে আশ্রয় দেয় বা এমনকি হয়তো প্রাণের অস্তিতকেও সহায়তা করে থাকে।

এবার প্লুটোর তুলনায় আমাদের আরেকটু কাছে পিছিয়ে আসা যাক। যদি কেউ আমাদের নিজের পৃথিবী ছাড়া অন্য কোনো গ্রহকে আঁকতে বলে, তাহলে অনেকেই সম্ভবত শনিকে আঁকব, খুব ভুল নাহলে এটির কারণ তাকে ঘিরে থাকা সুন্দর ওই রিংয়ের অস্তিত্ব। কিন্তু মানবসভ্যতার ইতিহাসের একটা বড় সময় অবধি রিংগুলিকে প্রত্যক্ষ করা যায়নি। প্রাচীন ভারত, মিশর, ব্যাবিলন বা ইসলামিক বিশ্বের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা নন, টলেমি বা গ্রেকো-রোমানরাও নন (যারা তবুও বুঝতে পেরেছিলেন যে বুধ বা শুক্রের চেয়ে শনি আমাদের পৃথিবী থেকে অনেক দূরে রয়েছে); নিকোলাস কোপার্নিকাস নন (যিনি দেখিয়েছিলেন যে পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে ঠিক বাকি অন্য গ্রহগুলোর মতনই); এমনকি ড্যানিশ আলকেমিস্ট টাইকো ব্রাহেও নন (যিনি শনির ব্যাস গণনা করার চেষ্টা করেছিলেন)। গ্যালিলিও গ্যালিলিই প্রথম, যিনি সেখানে বাড়তি কিছুর উপস্থিতি দেখেছিলেন। ওনার সেই আদিম টেলিস্কোপ খালি চোখের চেয়ে সামান্য ভাল দৃশ্য দিতে সাহায্য করেছিল এবং ১৬১০ সালে তিনি প্রথম অনুমান করেন যে দুটি অনাবিষ্কৃত কিছু শনি গ্রহের দুপাশে তিনি একটি করে দেখছেন। তৎকালীন গ্র্যান্ড ডিউক অফ টাস্কানির একজন পরামর্শদাতাকে তিনি লিখেছিলেন, “শনি গ্রহ একা নয়, বরং তিনটি কিছু একটা নিয়ে অবস্থান করছে।”

সপ্তদশ শতকের পন্ডিতেরা নানান ধরণের তত্ত্ব নিয়ে এসেছিলেন: শনি হল উপবৃত্তাকার, বা বাষ্প দ্বারা বেষ্টিত, বা আসলে দুটি অন্ধকার প্যাচযুক্ত একটি গোলক, বা একটি করোনা যা গ্রহটির সাথে ঘুরে চলেছে ইত্যাদি। তারপর, ১৬৫৯ সালে, ডাচ জ্যোতির্বিজ্ঞানী ক্রিস্টিয়ান হিউজেনস প্রথম উপস্থাপনা করেন যে শনি গ্রহ একটি পাতলা, চ্যাপ্টা বলয় দ্বারা বেষ্টিত, যা তাকে কোথাও স্পর্শ করে নেই। ইতালীয়-ফরাসি জ্যোতির্বিজ্ঞানী জিওভানি ক্যাসিনি ১৬৭৫ সালে আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে বুঝতে পারেন রিংয়ের মাঝখানে এক অদ্ভুত পাতলা, অন্ধকার ফাঁক বর্তমান। ফলে যা কেবল একখানা রিং বলে মনে হয়ে আসছিল, তা আরও জটিল হয়ে উঠল। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বর্তমান যুগে জানেন যে এই ‘রিং’ আসলে আটটি প্রধান রিং এবং হাজার হাজার অন্যান্য রিংলেট এবং বিভাগ দ্বারা গঠিত।


রিংগুলির প্রথম সরাসরি পরিমাপ করতে আবার সেই ক্যাসিনি এবং হিউজেনসকেই লেগেছিল, যদিও এখানে বিজ্ঞানীদ্বয়কে বলা হচ্ছেনা, বরং ৪ বিলিয়ন ইউএস ডলারের নাসার পাঠানো Cassini-Huygens-র কথা হচ্ছে, যাকে ১৯৯৭ সালে প্রেরণ করা হয়েছিল এবং ২০১৭ সাল পর্যন্ত শনি এবং এর চাঁদকে প্রদক্ষিণ করে গেছে। এর পরের ঘোষিত মিশন ‘Dragonfly’ তৈরি হচ্ছে মূলতঃ শনির বৃহত্তম চাঁদ টাইটানের উদ্দেশ্যেকক্ষপথে হাবল টেলিস্কোপ [৮] পাড়ি দিতে। যাইহোক ক্যাসিনি-হিউজেনস নিশ্চিত করতে পেরেছে যে রিংগুলি বেশিরভাগই জলীয় বরফ দিয়ে তৈরি— সাব-মাইক্রোস্কোপিক কণা থেকে শুরু করে কয়েক ডজন ফুট চওড়া পাথর পর্যন্ত আয়তনের খণ্ডগুলো ওর মধ্যে রয়েছে। তারা শনির চারপাশে কক্ষপথে থাকে সেভাবেই, ঠিক যে কারণে চাঁদ পৃথিবীর চারপাশে থেকে কক্ষপথে ঘুরে চলেছে। বরফের কণাগুলি এক-একটি রিং আকারে দেখতে লাগে কারণ তাদের প্রতিটি আলাদাভাবে একই রকম কক্ষপথ অনুসরণ করে। ভিতরের বলয়ের কণাগুলি বাইরের বলয়ের তুলনায় দ্রুত গতিতে চলছে, কারণ তাদেরকে শনির অপেক্ষাকৃত বেশি শক্তিশালী মহাকর্ষীয় টানের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হচ্ছে। ক্যাসিনি মহাকাশযান সেই ২০০৪ সাল থেকে ১৩ বছর ধরে শনি গ্রহকে প্রদক্ষিণ করে আসছিল, ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তার অভিযান শেষ হলে নাসা উদ্দেশ্যমূলকভাবে মহাকাশযানটিকে শনির বায়ুমণ্ডলে নিমজ্জিত হতে দেয়, যাতে এটি জ্বালানি শেষ হয়ে গেলে গ্রহটিকে প্রদক্ষিণ করে না চলতে থাকে। তার মিশনের সময়কালে, ক্যাসিনি শনির বলয়গুলিকে টিকিয়ে রাখার প্রক্রিয়াগুলি আবিষ্কার করেছিল, পর্যবেক্ষণ করেছিল ওই গ্যাস দৈত্য-গ্রহটিকে ঘিরে এক ভুমন্ডলীয় ঝড় বর্তমান, শনির সর্ববৃহৎ চাঁদ টাইটানকে ম্যাপ করেছিল এবং এর দ্বিতীয় বৃহত্তম উপগ্রহ এনসেলাডাস থেকে বিস্ফোরিত বরফসদৃশ্য পদার্থের বাষ্পে প্রাণ সঞ্চারের কিছু উপাদানও খুঁজে পেয়েছিল। 

২০১৬ সালে, অর্থাৎ কিনা ক্যাসিনির অভিযান শেষ হওয়ার এক বছর আগে, জুনো মহাকাশযান বৃহস্পতিতে পৌঁছয়, যেখানে এটি সৌরজগতের বৃহত্তম গ্রহটির চৌম্বক ক্ষেত্র এবং বায়ুমণ্ডলীয় গতিশীলতা এখনও পরিমাপ করে চলেছে (খুব সম্ভবতঃ ২০২৫ অবধি কাজ করে যাবে), যা বিজ্ঞানীদের আরও বিশদে বুঝতে সাহায্য করবে কিভাবে বৃহস্পতি ও তার আশেপাশের অন্য সবকিছুর সৃষ্টি সূর্যকে কেন্দ্র করে মূলত হয়েছিল। 

এখন কয়েক বছর পিছিয়ে ২০১২ সালে যাওয়া যাক, যখন কিউরিওসিটি রোভার মঙ্গলের মাটিতে অবতরণ করেছিল, যেখানে এটি লাল গ্রহে অতীতের জলের অস্তিত্বের নতুন প্রমাণ, প্রাণ থাকার সাথে সম্পর্কিত হতে পারে এমন জৈব অণুর উপস্থিতি এবং মিথেন ও অক্সিজেনের রহস্যময় ঋতুচক্র সহ বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার করে। 

মঙ্গলের নিরক্ষরেখার ঠিক দক্ষিণে, সেখানকার পশ্চিম গোলার্ধে, আনুমানিক ৩.৮ বিলিয়ন বছরের পুরানো একটি বিশাল গহ্বর গ্রহের শুষ্ক পৃষ্ঠ জুড়ে প্রায় ৯৬ মাইল ব্যাপী বিস্তৃত (Gale Crater)। উন্নত কিউরিওসিটি এক্সপ্লোরার সেই গ্যাল ক্রেটারের চারপাশের নমুনা সংগ্রহ করেছে এবং গর্তের উপাদানের গঠন বিশ্লেষণ করেছে। পূর্বে কিউরিওসিটি রোভারই প্রকাশ করেছিল যে গ্যাল ক্রেটার সম্ভবত এক সময় বেশ কিছু মাইল ব্যাপী এক বিশাল হ্রদ ছিল, হয়তো বা যে জল আমরা এমনকি পান করতেও পারতাম বলে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করেছিলেন লস আলামোস ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি এবং কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী জেনস ফ্রাইডেনভাং।

কিউরিওসিটি রোভার [৪]

এখন কিউরিওসিটি এই প্রমাণও পেয়েছে যে গ্যাল ক্রেটার কেবল অতীতেই জল ধারণ করে রাখেনি, হ্রদটি বাষ্পীভূত হয়ে যাওয়ার আরও কয়েক কোটি বছর পর অবধিও সেই জল অনেকটা সময় ধরে মাটির ভেতরে থেকে গিয়েছিল। গহ্বরটির পৃষ্ঠ বরাবর ‘হ্যালোস’ (halos) নামক ফ্যাকাশে ভূতাত্ত্বিক গঠনে সিলিকা জমা পাওয়া গেছে। এই সিলিকা আমানত সম্ভবত শিলার গভীর সঞ্চয় থেকে উৎপন্ন এবং তারপর ভূগর্ভস্থ জলের প্রবাহের মাধ্যমে ভূপৃষ্ঠ অবধি গিয়ে পৌঁছয়।

এছাড়া ২০১৮ সালে, ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সি ঘোষণা করে যে, তাদের মার্স এক্সপ্রেস মহাকাশযান থেকে ভূপৃষ্ঠ-বিদ্যারনকারী (ground-penetrating) রাডার ডেটা মঙ্গলগ্রহের দক্ষিণ মেরুর কাছে ভূগর্ভে জলের ভান্ডার থাকার অকাট্য প্রমাণ দিয়েছে। ভূপৃষ্ঠের মাইল খানেক নীচে, বরফ এবং পাথরের স্তরগুলির মধ্যে সন্ধান পাওয়া এই সাবগ্লেসিয়াল হ্রদটি প্রায় ২০ কিলোমিটার প্রশস্ত এবং সম্ভবত এক মিটারের বেশি গভীর নয়। এর আবিষ্কার হল সাম্প্রতিকতম প্রমাণ যা থেকে বোঝা যায় যে অতীতেই শুধু মঙ্গলে জল ছিল না, তা এমনকি আজও কিছু মাত্রায় প্রবাহিত হচ্ছে। সম্ভবত লাল গ্রহটিতে আমাদের অ্যান্টার্কটিকার মতোই ভূপৃষ্ঠের নীচে হ্রদের সমন্বয় রয়েছে।

২০০৪ সালে অপারচুনিটি রোভারের দ্বারা আবিষ্কৃত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গোলাকার আমানত এবং কিউরিওসিটি রোভার দ্বারা পরিচালিত ব্যাপক খনিজ-সংক্রান্ত বিশ্লেষণ থেকে বিজ্ঞানীদের ইতিমধ্যেই অল্প সন্দেহ ছিল যে কোনো এক সময়ে মঙ্গলে তরল জল অবশ্যই ছিল। প্রমাণগুলি থেকে অনুমান করা যায় যে কয়েক কোটি বছর আগে মঙ্গল গ্রহের পৃষ্ঠে ছিল বিস্তীর্ণ হ্রদ এবং নদীর আধিপত্য। ২০০৯ সালে ফিনিক্স ল্যান্ডার দ্বারা ঘনীভবন (কন্ডেন্সেশন) পরিমাপ করা হয়েছিল, সঙ্গে মঙ্গলের টিলাগুলিতে পাওয়া কালো রেখাগুলোও জলের প্রমাণ হতে পারে বলে সেসময়ে ধরা হয়েছিল (যদিও আরও পরে সাম্প্রতিক পরীক্ষা থেকে জানা যায় যে তারা শুকনো বালির ধ্বসের কারণেও হতে পারে)।


স্পেস-ক্র্যাফ্টগুলোর পাশাপাশি টেলিস্কোপও মহাবিশ্বের অনেক রহস্য আমাদের সামনে খুলে দিয়েছে। মধ্যযুগ থেকে টেলিস্কোপগুলি দেখিয়েছিল যে পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয়, যেমনটি আগে বিশ্বাস করা হত, সঙ্গে তারা আমাদের কাছের চাঁদের পৃষ্ঠের পাহাড় এবং নানা গহ্বরও দেখতে সাহায্য করেছিল। পরবর্তীকালের নতুন টেলিস্কোপগুলি ধীরে ধীরে আমাদের সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহগুলির ভূগোল এবং সংক্রান্ত আবহাওয়া প্রকাশ করেছে, এছাড়া তারা নতুন গ্রহ এবং গ্রহাণুও আবিষ্কার করেছে। বলা বাহুল্য, এই যন্ত্রগুলিই আবার আমাদের আলোর গতির প্রথম বৈধ পরিমাপে সাহায্য করেছিল। আধুনিক টেলিস্কোপগুলির দ্বারাই আমরা মহাকর্ষ এবং পদার্থবিজ্ঞানের বিবিধ মৌলিক নিয়মগুলি বুঝতে পেরেছি।

স্পেস টেলিস্কোপের প্রথম প্রেরিত তথ্যই ২০০ টিরও বেশি সম্ভাব্য গ্রহকে ইঙ্গিত করেছিল বলে জানা যায়, যাদের মধ্যে কয়েকটি রয়েছে আমাদের থেকে মাত্র ৫০ আলোকবর্ষ দূরে (অর্থাৎ ৫০ বছরে আলো যে দূরত্ব অতিক্রম করবে। ‘মাত্র’, তার কারণ হল— শুনতে অবাক লাগলেও, মহাকাশের যা ব্যাপ্তি, তাতে এটি খুবই স্বল্প দূরত্ব হিসেবে চিহ্নিত!)। ইতিমধ্যে, দুটি স্পেস-টেলিস্কোপ, কেপলার এবং টিইএসএস (Transiting Exoplanet Survey Satellite) বিভিন্ন নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণকারী হাজার হাজার গ্রহ আবিষ্কার করে ফেলেছে। কেপলার ২০০৯ সালে চালু হয়ে এর কাজ শেষ করে ২০১৮-তে, এই সময় ব্যবধানে রহস্যময় এবং সুদূরবর্তী অনেক গ্রহসমূহের সন্ধান দিয়েছে প্রতিফলিত আলোর তারতম্য পরিমাপ ক’রে, যখন তারা তাদের নিকটবর্তী তারাগুলোর সামনে দিয়ে অতিক্রম করে। এই গ্রহগুলির মধ্যে রয়েছে উত্তপ্ত বৃহস্পতি-সদৃশ গ্রহ, যারা তাদের নক্ষত্রকে মাত্র কয়েকদিন বা ঘন্টার মধ্যে প্রদক্ষিণ করে; রয়েছে ক্ষুদ্র নেপচুন সদৃশ গ্রহসমূহ, যারা আকারে পৃথিবী এবং আমাদের নেপচুনের মধ্যে এবং গ্যাস, তরল, কঠিন বা কিছু সংমিশ্রণ দিয়ে তৈরী, এমনকি রয়েছে সুবিশাল পাথুরে সুপার-আর্থও, যা জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা অধ্যয়ন করার আশা রাখেন প্রাণের সঙ্কেত খুঁজে পেতে ৷ অন্যদিকে টিইএসএস ২০১৮ সাল থেকে এর মিশন শুরু করে কেপলারের উত্তরসূরি হিসাবে অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে ৷ কেপলার যখন মহাকাশের অল্প কিছু স্থানে অনেক গভীরভাবে নিশানা করেছিল, টিইএসএস তার দুই বছরের প্রথম পর্যায়ের মিশনে আকাশের সম্পূর্ণ ৩৬০-ডিগ্রি বিস্তৃতি কভার করতে চেষ্টা করেছে। প্রাথমিক মিশনটি ৪ঠা জুলাই, ২০২০-তে শেষ হয় এবং এখন এটি একটি দীর্ঘায়িত মিশনে রয়েছে। টিইএসএস ছোট, পাথুরে জগত থেকে শুরু করে বিশালাকৃতির গ্রহ পর্যন্ত খুঁজে বের ক’রে আমাদের কাছে গ্যালাক্সিতে গ্রহের বৈচিত্র্য প্রদর্শনশালা খুলে দিয়েছে। 

আর যখন স্পেস-টেলিস্কোপের কথা হচ্ছেই তখন হাবল এবং জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের কথা না বললেই নয়। ১৯৯০ সাল থেকে ভূপৃষ্ঠের প্রায় ৬০০ কিমি ওপরে থেকে পৃথিবীকে ঘিরে প্রদক্ষিণ করতে করতে জ্যোতির্বিজ্ঞানী এডুইন হাবল-র নামাঙ্কিত এই টেলিস্কোপ আমাদের সৌরজগতের নানান গ্রহের আবহাওয়া থেকে শুরু করে অন্যান্য নক্ষত্রের চারপাশে প্রদক্ষিণরত গ্রহসমূহর জন্ম পর্যন্ত সবকিছু পরীক্ষা করতে সাহায্য করেছে। আগে যাদেরকে ধুলো ও গ্যাসের মেঘ বলে মনে করা হত এবং নীহারিকা হিসাবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়েছিল তা আসলে হাবলের মাধ্যমেই জানা যায় যে- আদতে আমাদের মিল্কিওয়ের বাইরের বিভিন্ন গ্যালাক্সি। হাবল স্পেস টেলিস্কোপের মতো আধুনিক টেলিস্কোপ লক্ষ লক্ষ গ্যালাক্সির প্রমাণ দিয়েছে, যাদের প্রতিটিতে আমাদের সূর্যের মতো অজস্র তারা রয়েছে।

জেমস ওয়েব হল হাবলের যোগ্য ও অত্যাধুনিক উত্তরসূরি; হাবলের চেয়ে যার আয়নাটি অনেক বড়, আর তার ফলে এই বৃহত্তর আলো সংগ্রহের ক্ষেত্রটির অর্থ হল ওয়েব হাবলের চেয়ে অনেক বেশি অতীতে পৌঁছে যেতে সক্ষম। উপরন্তু, এর ক্ষমতা অনুযায়ী, ওয়েব টেলিস্কোপ ইনফ্রারেড আলো সনাক্ত করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে, যা অনন্য এবং অত্যাশ্চর্য চিত্রের দিকে আমাদের পরিচালিত করবে বলেই আশা। 

কিছু কিছু নতুন টেলিস্কোপগুলি আমাদেরকে মহাবিশ্বের বিভিন্ন অবজেক্ট অধ্যয়নে সাহায্য করে তাদের থেকে নির্গত তাপ বা রেডিও তরঙ্গ বা এক্স-রে নির্ণয়ের মাধ্যমে। গবেষকদের আশা— ভবিষ্যতের টেলিস্কোপগুলি “আমরা কি মহাবিশ্বে একা?” এই মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটির উত্তর দিতে হয়তো সমর্থ হবে। 

কক্ষপথে হাবল টেলিস্কোপ [৮]

 

তথ্যসূত্র:

[১] sciencedirect-pluto

[২] https://www.sciencedirect.com/topics/earth-and-planetary-sciences/charon

[৩] Saturn’s ring

[৪] curiosity-rover-evidence-of-groundwater-mars

[৫] mars-express-esa

[৬] https://stacker.com/stories/1610/space-discoveries-will-blow-your-mind

[৭] https://www.nasa.gov/centers/jpl/education/telescopes-20100405.html

[৮] hubble-image


Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।