মানুষের উৎস সন্ধানে মানুষ: নোবেল পুরস্কার ২০২২- শারীরবিদ্যা অথবা ঔষধ

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
225 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

গতকাল ৩রা অক্টোবর, শারীরবিদ্যা/ ওষুধে এবছরের নোবেলজয়ী- সভান্তে পাবোর নাম ঘোষিত হয়েছে। জেনে নেওয়া যাক তাঁর আবিষ্কার নিয়ে।

মানুষ সর্বদাই তার উৎস নিয়ে জানতে আগ্রহী, মানে কোথা থেকে কিভাবে আমাদের উৎপত্তি, আমরা মানে হোমো সাপিয়েন্সরা (Homo sapiens) আর পাঁচটা মানব প্রজাতির থেকে কোথায় আলাদা।

প্রত্নতত্ত্ববিদ্যা এবং জীবাশ্মবিদ্যা, মানুষের বিবর্তন নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে বরাবরই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে। বিভিন্ন গবেষণায় এটা প্রমাণিত যে আধুনিক মানুষ অর্থাৎ হোমো সাপিয়েন্স এর শারীরবৃত্তীয় ভাবে উৎপত্তি আনুমানিক তিন লক্ষ বছর আগে আফ্রিকা মহাদেশে, নিয়ান্ডারথাল (Neanderthal) আফ্রিকার বাইরে বিকশিত হয় চার লক্ষ বছর আগে এবং তিন লক্ষ বছর আগে তারা বিলুপ্ত হয়ে যায়। প্রায় সত্তর হাজার বছর আগে হোমো সাপিয়েন্স এর একটি দল আফ্রিকা থেকে মধ্য প্রাচ্যে মাইগ্রেট করে এবং মধ্য প্রাচ্য থেকে সমস্ত বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। ইউরেশিয়ার একটা বড়ো অংশ জুড়ে হোমো সাপিয়েন্স এবং নিয়ান্ডারথালরা দশ হাজার বছর জুড়ে বসবাস করে। কিন্তু নিয়ান্ডারথালদের সাথে হোমো সাপিয়েন্স , মানে আমাদের সম্পর্ক নিয়ে আমরা কি কি তথ্য জানি? জিনোমিক তথ্য (genomic information) থেকে আমরা এই সূত্রগুলো সম্পর্কে জানতে পারি। ১৯৯০ সালের শেষদিকে প্রায় সমগ্র human genome এর sequencing করা হয়। বলাই বাহুল্য এই sequencing বিজ্ঞান জগতে এক দৃষ্টান্ত হয়ে যায়। হোমো সাপিয়েন্স এবং নিয়ান্ডারথালদের মধ্যে সম্পর্ক জানার জন্য, প্রত্নতাত্বিক নিদর্শনগুলোর genomic sequencing এর প্রয়োজন হয়ে পড়ে।
সভান্তে পাবো, তাঁর গবেষণা জীবনের একদম শুরুর দিকে নিয়ান্ডারথালদের DNA নিয়ে গবেষণার জন্য, বিভিন্ন আধুনিক জেনেটিক পদ্ধতি ব্যবহার করার সম্ভাবনা দেখে চমৎকৃত হন। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে DNA এর রাসায়নিকভাবে কিছু পরিবর্তন এবং তা ছোট ছোট অংশটে (fragment) পরিনত হওয়ার ফলস্বরূপ, খুব শীঘ্রই প্রযুক্তিগত কিছু প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হন তিনি। হাজার বছর পরে, অবশিষ্ট DNA এর পরিমাণ খুবই সামান্য হয় এবং তাও আবার বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়ার DNA এবং মানুষের দ্বারা দূষিত (contaminated) হয়ে পড়ে। অ্যালান উইলসন নামে পাবোর একজন পোস্টডক্টরাল ছাত্র, (যিনি জীববিদ্যার বিবর্তন সম্পর্কিত গবেষণায় একজন পথপ্রদর্শক) এনার সাথে নিয়ান্ডারথাল এর থেকে DNA নিয়ে পাবো গবেষণার পদ্ধতি তৈরি করতে শুরু করেন, এবং এই কাজ স্থায়ী হয় প্রায় বেশ কয়েক দশক।

চিত্র ১

১৯৯০ সালে বিজ্ঞানী পাবোকে মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে নিযুক্ত করা হয়, সেখানে তিনি প্রাচীন (archaic) DNA নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যেতে থাকেন। তিনি স্থির করেন যে নিয়ান্ডারথাল এর মাইটোকন্ড্রিয়ার অবস্থিত DNA কে বিশ্লেষণ করবেন। মাইটোকন্ড্রিয়াল জিনোম বেশ ছোটো এবং এতে জিনগত তথ্যের অতি সামান্য পরিমাণ উপস্থিত থাকে, কিন্তু এর পরিমাণ কয়েক হাজার কপি হওয়ার দরুন এই গবেষণায় সফলতা পাওয়ার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়। এবং পাবো তার পরিমার্জিত গবেষণা পদ্ধতি ব্যবহার করে, চল্লিশ হাজার বছরের পুরোনো হাড়ের মাইটোকন্ড্রিয়াল DNA এর সিকোয়েন্সিং করতে সফল হন। সমসাময়িক অন্যান্য মানব প্রজাতি এবং শিম্পাঞ্জিদের DNA এর সাথে তুলনা করে জানা গেছে যে নিয়ান্ডারথালরা জিনগতভাবে স্বতন্ত্র ছিলো।

নিয়ান্ডারথালদের জিনোম সিকোয়েন্স

নিয়ান্ডারথালদের মাইটোকন্ড্রিয়াল জিনোম সিকোয়েন্স করে অতি সামান্য তথ্য পাওয়ার পর, পাবো নিয়ান্ডারথালদের নিউক্লিয়ার জিনোম সিকোয়েন্স করার চেষ্টা শুরু করেন। এই সময়ে, তাকে জার্মানির লিপজিগে একটি ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার সুযোগ দেওয়া হয়। নতুন প্রতিষ্ঠানে, পাবো এবং তাঁর দল প্রযুক্তিগত উন্নতিকে কাজে লাগিয়ে পুরোনো হাড় থেকে DNA আলাদা করার (isolate) এবং তা বিশ্লেষণ করার পদ্ধতির ক্রমোন্নতি ঘটান। আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব কাজটিকে পাবো সম্ভব করে দেখান এবং ২০১০ সালে সর্বপ্রথম, নিয়ান্ডারথালদের জিনোম ক্রম (genome sequence) প্রকাশ করেন। তুল্যমূল্য বিশ্লেষণে প্রমাণ হয় যে নিয়ান্ডারথাল এবং হোমো সাপিয়েন্স-দের সাধারণ এবং অতি সাম্প্রতিক পূর্বপুরুষ আট লক্ষ বছর আগে বসবাস করতেন।

চিত্র ২

পৃথিবীর বিভিন্ন অংশের নিয়ান্ডারথাল এবং হোমো সাপিয়েন্স এর জিনগত বিশ্লেষণ প্রমাণ করে যে নিয়ান্ডারথালদের DNA সিকোয়েন্স বা DNA ক্রমের সাথে, সমসাময়িক আফ্রিকায় উদ্ভুত মানুষদের তুলনায় সমসাময়িক ইউরোপ বা এশিয়ায় উদ্ভুত মানুষের মধ্যে বেশি মিল ছিল। অর্থাৎ নিয়ান্ডারথাল এবং হোমো সাপিয়েন্স, তাদের সহাবস্থানের সময়ে নিজেদের মধ্যে প্রজননে লিপ্ত হয়েছিল। আধুনিক যুগে এশীয় বা ইউরোপীয় বংশোদ্ভুত মানুষদের জিনোমের প্রায় ১-৪ শতাংশ নিয়ান্ডারথালদের থেকে উদ্ভুত।

ডেনিসোভা: এক চাঞ্চল্যকর আবিষ্কার

২০০৮ সালে সাইবেরিয়ার দক্ষিণ অংশে অবস্থিত ডেনিসোভা গুহায়, চল্লিশ হাজার বছরের পুরোনো আঙ্গুলের হাড়ের এক টুকরোর আবিষ্কার হয়। এই টুকরোটির মধ্যে খুব ভালোভাবে DNA সংরক্ষিত ছিলো, যা পাবো এবং তাঁর টিম ক্রমসাধন (sequence) করে। ফলাফল হয় এরকম : নিয়ান্ডারথালদের অন্যান্য প্রজাতি এবং আধুনিক মানুষের সাথে ওই হাড়ের টুকরোয় পাওয়া DNA এর জিনগত ক্রমের তুলনা করে দেখা যায় ওই হাড়ের DNA এর বিন্যাস একদমই আলাদা। ইতিপূর্বে পাবো অন্য আরেকটি মানব প্রজাতি (hominin) আবিস্কার করেছিলেন, যায় নাম দেওয়া হয়েছিল ডেনিসোভা। সমসাময়িক বিভিন্ন মানুষ এর জিনগত ক্রমের তুলনা করে দেখা যায় যে হোমো সাপিয়েন্স এবং ডেনিসোভার মধ্যেও জিনগত আদানপ্রদান ঘটেছে। এই সম্পর্ক প্রথম পরিলক্ষিত হয় মেলানেশিয়া এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য অংশের মানুষের মধ্যে, ওই অঞ্চলের বাসিন্দারা প্রায় ছয় শতাংশ অব্দি ডেনিসোভার জিন বহন করে থাকে।

বিজ্ঞানী পাবোর আবিষ্কার, মানুষের বিবর্তন সম্পর্কে নতুন দিকের সন্ধান দেয়। ঠিক যে সময়ে হোমো সাপিয়েন্স আফ্রিকা থেকে মাইগ্রেট করে, ঠিক সেই সময়ে অধুনালুপ্ত অন্তত দুটো হোমিনিন জনগোষ্ঠী ইউরেশিয়ায় বসবাসরত ছিলো। নিয়ান্ডারথালরা ইউরেশিয়ার পশ্চিম অংশে থাকতো এবং ডেনিসোভানরা থাকতো ইউরেশিয়ারই পূর্ব অংশে। আফ্রিকার বাইরে হোমো সাপিয়েন্সদের বেড়ে ওঠার সময়ে এবং সেখান থেকে পূর্ব অংশে যাওয়ার সময়ে, হোমো সাপিয়েন্সরা নিয়ান্ডারথালদের পাশাপাশি ডেনিসোভানদের সাথেও তাদের সাক্ষাত ও প্রজনন ঘটে।

প্যালিওজেনোমিক্স (Paleogenomics) এবং এর প্রাসঙ্গিকতা-

বিজ্ঞানী পাবো তাঁর যুগান্তকারী গবেষণার সাহায্যে বিজ্ঞান জগতে সম্পূর্ণ নতুন একটা শাখার সৃষ্টি করেন – প্যালিওজেনোমিক্স। পাবোর এই আবিষ্কার মানুষের বিবর্তন এবং মাইগ্রেশনকে বুঝতে খুব ভালোভাবে সাহায্য করে। জিনোম ক্রম বিশ্লেষণের নতুন এবং আরও শক্তিশালী পদ্ধতিগুলো ব্যবহার করে জন্য যায় যে প্রাচীন হোমিনিনগুলি, আফ্রিকার হোমো সাপিয়েন্সের সাথে মিশে যেতে পারে। গ্রীষ্মপ্রধান জলবায়ুতে DNA এর ক্রমাবনতির কারণে আফ্রিকার বিলুপ্ত হোমিনিনগুলির জিনোমের ক্রম নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।
বিজ্ঞানী পাবোর আবিষ্কারকে অনেক অনেক ধন্যবাদ, এই আবিষ্কারের কারণেই আমরা এখন বুঝতে সক্ষম যে আমাদের নিকটাত্মীয়ের থেকে পাওয়া প্রত্নতাত্ত্বিক জিন ক্রম কিভাবে বর্তমান যুগের আধুনিক মানুষের শরীরবিদ্যাকে প্রভাবিত করছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় EPAS1 জিনের কথা। এই EPAS1 জিনের ডেনিসোভান সংস্করণ, আজকের দিনের তিব্বতিদের মধ্যে বর্তমান, যা তাদের অধিক উচ্চতায় বেঁচে থাকতে সাহায্য করে। অন্যান্য উদাহরণ বলতে বোঝা যায় নিয়ান্ডারথাল জিনগুলোর কথা, যেগুলো আমাদের শরীরে বিভিন্ন রকম সংক্রমণের বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিরোধ ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে থাকে।

কোন জিনিস আমাদের মানুষ করে তোলে?

হোমো সাপিয়েন্সকে চিহ্নিত করা যায় তাদের জটিল সংস্কৃতি, উন্নত উদ্ভাবনী ক্ষমতা, figurative art, জলের প্রবাহ অতিক্রম করার ক্ষমতা এবং পৃথিবীর সমস্ত অংশে ছড়িয়ে পড়ার কারনে। নিয়ান্ডারথালরাও দলবদ্ধভাবেই বসবাস করতো এবং তাদের মস্তিষ্কের আয়তনও ছিলো বড়ো। তাদের মধ্যে বিভিন্ন সরঞ্জাম ব্যবহারের চল থাকলেও সেগুলি বিকশিত হয়েছিলো খুবই কম। বিজ্ঞানী পাবোর গবেষণার মাধ্যমেই হোমো সাপিয়েন্স এবং নিয়ান্ডারথালদের মধ্যে জিনগত তফাৎ শনাক্ত করা সম্ভব হয়। বর্তমান সময়ে এই জিনগত তফাতগুলির কার্যগত পার্থক্য বিশ্লেষণের গবেষণা চলছে যাতে আমরা বুঝতে পারি যে ঠিক কি কারণ আজকে আমাদের মানুষে পরিনত করেছে।

~কলমে এলেবেলে দেবারুন; চিত্রাঙ্কন এলেবেলে দিশানী

Uddalak Biswas

Senior Research Fellow, Department of Earth Sciences, IIEST, Shibpur, Howrah-711103

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।