কোয়ান্টাম জগতের গলিঘুঁজি : নোবেল পুরস্কার ২০২২ (পদার্থবিদ্যা)

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
242 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

নোবেল প্রাইজের মঞ্চ থেকে যখন ঘোষণা হল, এবারের নোবেল প্রাইজ দেওয়া হচ্ছে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের বুনিয়াদি গবেষণা সম্পর্কে, তখনই বোঝা গিয়েছিল এবারের নোবেল প্রাপকদের মধ্যে একজন হবেন ইকোল পলিটেকনিকের এলেন আসপেক্ট। তাই হলো, এবারের নোবেল প্রাইজ পেলেন এলেন আসপেক্ট, জন ক্লাউসার এবং এন্টন জেলিঙ্গার। তাদের গবেষণার মূল বিষয়বস্তু হলো কোয়ান্টাম এন্ট্যাগেলমেন্ট। কোয়ান্টাম ইনফরমেশন সংক্রান্ত গবেষণার পথিকৃৎ এই তিন বিজ্ঞানী।

 

for experiments with entangled photons, establishing the violation of Bell inequalities and pioneering quantum information science

 

কিন্তু এনাদের এই গবেষণা এত গুরুত্বপুর্ণ কেন? তা আলোচনার জন্য আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে এক শতাব্দী, ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের ব্ল্যাকবডি রেডিয়েশন সংক্রান্ত গবেষণায় কোয়ান্টাম মেকানিক্সের পথ চলা শুরু, তারপর পদার্থবিজ্ঞানের এই শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অগণিত বিজ্ঞানীর নিরলস গবেষণার মাধ্যমে, কয়েকজন বিজ্ঞানীর নাম উল্লেখ এখানে না করলেই না, তাঁরা হলেন নীলস বোর, পল ডিরাক, আলবার্ট আইনস্টাইন, ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ, আরউইন শ্রোডিঙ্গার, রিচার্ড ফাইনম্যান এবং আরো অনেকে, সবার নাম উল্লেখ করতে গেলে সমস্ত দিন চলে যাবে। কোয়ান্টাম মেকানিক্স সেই সকল এক্সপেরিমেন্টের ফল ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হয় যা কিনা ক্ল্যাসিকাল ফিজিক্স এবং ইলেক্ট্রোডিনামিক্স দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছিল না এতদিন। বিগতদিনে প্রকৃতিকে যেভাবে বিজ্ঞান দেখে এসেছে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের দৃষ্টিকোণ তার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা  তাই অভূতপূর্ব  সাফল্য সত্ত্বেও বিজ্ঞানীরা কোয়ান্টাম মেকানিক্স নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। আইনস্টাইন, যিনি কোয়ান্টাম মেকানিক্সের যাত্রাপথে যার অবদান ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ, তিনি এই তত্ত্বকে বলেছিলেন অসম্পূর্ন।

আইনস্টাইনের সন্দেহ জাগার কারণ কি ছিল? আসলে কোয়ান্টাম মেকানিক্স দিয়ে প্রধানত ক্ষুদ্র জগতের চলাফেরা কে বর্ণনা করার চেষ্টা করা হয়, এই জগতের কয়েকজন সদস্যরা হলেন, ইলেক্ট্রন, প্রোটন, পজিট্রন ইত্যাদি  অবপারমাণবিক কণা, যাদের চলাফেরা আমরা সরাসরি সনাতন পদার্থবিজ্ঞানের মাধ্যমে বর্ণনা করতে পারিনা, অর্থাৎ কেউ একটা ইলেকট্রনকে দেখলো A বিন্দুতে আছে, তার বেগ নির্ণয় করলো, তারপর বললো t সেকেন্ড পরে ইলেক্ট্রনটা B বিন্দুতে থাকবে, এবং এটি ১০০ শতাংশ নিশ্চিত! না, এই ধরণের বিবরণ কোয়ান্টাম মেকানিক্সে হয় না, কোন বস্তুর বেগ ও অবস্থান একই সাথে  নির্ণয় ১০০ শতাংশ নির্ভুল হতে পারে না।  যতটা নিখুঁত ভাবে অবস্থান নির্ণয় করা হবে, বস্তুটির বেগের বিবরণ ততটাই ঘেঁটে যাবে। এই আলোচনা আরো একটু বিস্তৃত করলে আসে এই সব কণার আরো বিভিন্ন ধর্ম (যেমন  স্পিন) সংক্রান্ত পরীক্ষা। কোন স্পিন ১/২ কণার z অক্ষ বরাবর স্পিনের মান হতে পারে +১/২ অথবা -১/২, কিন্তু সেই মান ততক্ষন জানা যাবে না  যতক্ষণ না সেটা মাপা হবে। তাহলে মাপার আগে কণাটির z অক্ষ বরাবর স্পিন কত ছিল? এর সরাসরি কোন উত্তর নেই, উত্তর আছে সম্ভাবনার শর্তে, বলা যাবে পরীক্ষা করার আগে কণাটির স্পিন +১/২ হওয়ার সম্ভাবনা কিছু একটা এবং -১/২ হওয়ার সম্ভাবনা কিছু একটা। স্বাভাবিক ভাবেই দুটি সম্ভাবনার একটি হবে বেশি অন্যটা হবে কম, তার মানে যদি একই প্রাথমিক শর্ত থেকে নির্মিত একই রকম কণার উপর বার বার একই পরীক্ষা করা হয়, তবে একটি ফল, অন্য ফলটির থেকে বেশি বার প্রাপ্ত হব। এখন এই “সম্ভাবনাময়” শর্তটিকে আইনস্টাইন সহজে মেনে নিতে পারেন নি তাই তিনি মনে করতেন কোয়ান্টাম মেকানিক্স অসম্পূর্ন তত্ত্ব, বস্তুত এই বিষয়ে নীলস বোরের সাথে তাঁর মতানৈক্য পদার্থবিজ্ঞানের জগতে বহুল চর্চিত। অপরদিকে শ্রোডিঙ্গার এই সম্ভাবনার বিশেষত্ত্বকে বলেন কোয়ান্টাম জগতের অন্যতম বিশেষত্ব।

EPR প্যারাডক্স বা আইনস্টাইন- পোডোলস্কি-রোসেন প্যারাডক্স। আইনস্টাইন একটি থট এক্সপেরিমেন্ট করেন, এক্ষেত্রে নোবেল ২০২২ এর প্রেস রিলিজের উদাহরণটা তুলে দেওয়া হল। ধরা যাক আমাদের কাছে একটা যন্ত্র আছে যা তার উত্তর আর দক্ষিণ, দুদিকে একই সময়ে দুটি বলকে ছুঁড়ে দেয়। মেশিনের মধ্যে কালো আর সাদা দুটি বল আছে, এখন কোন এক মুহূর্তে সেই মেশিনটি দুদিকে বল দুটি ছুঁড়ে দিলো। স্বাভাবিক ভাবেই উত্তর আর দক্ষিণে যদি দুজন দাঁড়িয়ে থাকে তাহলে একজন পাবে সাদা বল আর একজন পাবে কালো বল, কিন্তু এ তো সনাতনী পদার্থবিদ্যার জগতের কথা। কোয়ান্টাম জগতে, মেশিনের মধ্যে যখন বল দুটি আছে তখন কোনটা যে কি রঙের সেটা বাইরের পর্যবেক্ষক জানে না, সুতরাং সেই অবস্থায় মেশিনের মধ্যে বলগুলির রং না সাদা না কালো, বলগুলির রং ধূসর। এবার বলগুলি দুদিকে ছোঁড়া হলো, আর উত্তর আর দক্ষিণের দুজন পর্যবেক্ষক ধরলেন বলদুটিকে, এখনো তারা জানেন না যে তারা যে বলদুটি ধরেছেন তার রং কি।  এবার উত্তর দিকের পর্যবেক্ষক বলের রং নির্ণয় করার পরীক্ষা করলেন, আর পরীক্ষার রেজাল্ট এলো কালো, তিনি তৎক্ষণাৎ বুঝে গেলেন যে দক্ষিণের পর্যবেক্ষক তার মানে সাদা রঙের বল পেয়েছেন। এই জায়গাতেই ছিল আইনস্টাইনের আপত্তি, এই যে যখনই উত্তরের পর্যবেক্ষক বুঝলেন যে তার বল সাদা, মানে অপরজনের বল কালো, তার মানে কি তথ্য ওদিক থেকে এদিকে তাৎক্ষণিক ভাবে চলে এলো না, অথাৎ আলোর চেয়েও দ্রুত বেগে? কিন্তু আপেক্ষিকতাবাদ তো কোন তথ্যকেই আলোর চেয়ে বেশি বেগে পাঠাতে অনুমতি দেয না, তবে কি এমন কিছু আছে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের মধ্যে যাকে তখন অবধি আবিষ্কার করা যায় নি, কিন্তু যা আদতে নির্ধারণ করছে যে কোন পরীক্ষার ফল কি হবে? এই যে এমন কিছুর উল্লেখ করা হলো, এটা হিডেন ভেরিয়েবল বোঝানোর একটা সামান্য প্রচেষ্টা মাত্র। বস্তুত EPR প্যারাডক্স কে কিছুটা সহজে বোঝানোর জন্য এই বল আর মেশিনের উদাহরণটার সাহায্য নেওয়া হয়েছে। পরবর্তীকালে জন স্টুয়ার্ট বেল একটি তত্ত্ব দেন, যার মূল বক্তব্য অনেকটা এই রকম, যদি এই রকম হিডেন ভেরিয়েবল থাকে, তবে কোয়ান্টাম মেকানিক্স সঠিক না, আর কোয়ান্টাম মেকানিক্স সত্যি হলে হিডেন ভেরিয়েবল এর অস্তিত্ত্ব থাকতে পারে না।

এন্টেঙ্গেলমেন্ট কি? খুব সহজে বলতে গেলে একটি দশা একাধিক কণার মধ্যে ভাগ হয়ে গেলে সেই কণাগুলিকে বলা হবে entangled পার্টিকল, যদি একটি কণার কোন অবস্থা জানতে পারলে অপর  কণার অনুরূপ অবস্থা নির্ণয় করা যায়। উদাহরণস্বরূপ আগের থট এক্সপেরিমেন্টের কথা ভাবা যায়, সাদা আর কালো বল দুটি যখন মেশিনের মধ্যে ছিল, তারা ধূসর বর্ণের, মেশিন থেকে নিক্ষিপ্ত হওয়ার পরে পর্যবেক্ষক কর্তৃক পৰ্যবেক্ষিত হওয়ার পরে জানা গেলো একটি সাদা রঙের বল, আর অন্যটি কালো রঙের। বলদুটির দশা একটা অপরটার সাথে এমন ভাবে মিশ্রিত হয়ে আছে, যে মুহূর্তে একজন   জানবে যে তিনি বলটি ধরেছেন সেটি সাদা, সাথে সাথে তিনি এই সিদ্ধান্তে আসবেন যে  অন্য পর্যবেক্ষকএর কাছে থাকা বলটি কালো, আলাদা আর কোন পরীক্ষার দরকারই পড়বে না।

জন ক্লাউসার এবং এলেন এসপেক্ট:

জন ক্লাউসার বেলের তত্ত্বকে ঠিক নিতে পারেননি, এবং ফোটন অর্থাৎ তড়িৎচুম্বকীয় ক্ষেত্রের বাহক কণা কে নিয়ে গবেষণা শুরু করেন, তবে তার এক্সপেরিমেন্ট প্রমাণ করে যে আদতে বেলের তত্ত্ব সঠিক, কোয়ান্টাম মেকানিক্স সঠিক, যদিও পরবর্তীকালে তাঁরা তাদের পরীক্ষার পদ্ধতিতে কিছু সীমাবদ্ধতা খুঁজে পান। সেই সীমাবদ্ধতাকে দূর করে অন্য রকম প্রক্রিয়ায় ফোটন নিয়েই এই ধরণের গবেষণা করেন এলেন এসপেক্ট এবং তিনিও একই রকম ফল পান। এলেন এসপেক্ট এর ভাষায় কোয়ান্টাম মেকানিক্স বার বার বিভিন্ন আঘাত কে সহ্য করে এবং সসম্মানে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়।

এন্টন জেলিঙ্গার:

জেলিঙ্গার এবং তার গবেষক দল যে বিষয়টা নিয়ে ১৯৯৭ সালে অসাধারণ একটি গবেষণা করেন, তার নাম হল কোয়ান্টাম টেলিপোর্টেশান। ধরা যাক এক জোড়া এন্ট্যাঙ্গেল্ড কণা আছে, A:B, এবার সেই দুটিকে ছেড়ে দেওয়া হল পরস্পরের বিপরীত দিকে। কোন এক সময়ে B অন্য একটি কণা C এর সাথে এমন কিছু ইন্টারঅ্যাকশন করল যে, B :C এন্ট্যাঙ্গেল্ড হয়ে গেলো।এখন এই নতুন জোড়ার মধ্যে C কণাটি তার পূর্ববর্তী কোয়ান্টাম অবস্থার সমস্ত তথ্য হারিয়ে ফেলল, কারণ সে এখন নতুন দশা ভাগ করে নিচ্ছে B এর সাথে, কিন্তু ” ফুরায় যা তা ফুরায় শুধু চোখে”, C র কোয়ান্টাম অবস্থা সম্পর্কিত সমস্ত তথ্য চলে এল A র কাছে। এই যে তথ্য আদানপ্রদান হয়ে গেলো A আর C র মধ্যে,  এটিই কোয়ান্টাম টেলিপোর্টেশান এবং এটি পরীক্ষামূলক ভাবে দেখান জেলিঙ্গার এবং তার দল।

এই ত্রয়ীর গবেষণা গুরুত্ত্বপূর্ন কারণ এনারা কোয়ান্টাম মেকানিক্সের বুনিয়াদি দর্শণকে এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। তাত্ত্বিক আলোচনা শুধু নয়, পদার্থবিজ্ঞানে শেষ কথা বলে এক্সপেরিমেন্ট, রিচার্ড ফাইনম্যানের মতে, যে কোন তত্ত্ব যত বুদ্ধিদীপ্ত, যত সুন্দরই হোক না কেন, এক্সপেরিমেন্টের টেবিলে যদি তা প্রমাণিত না হয়, তবে তা না থাকার সমান। এই বৈজ্ঞানিক ত্রয়ীর গবেষণা কোয়ান্টাম মেকানিক্স যে কতটা শক্তিশালী একটি থিওরি সেটা প্রমান করেছে। শেষ অবধি আবার ফিরে আসা যাক নীলস বোর আর আইনস্টাইনের দ্বন্দে। বেলের তত্ত্ব এবং তার এক্সপেরিমেন্টাল রেজাল্ট নিঃসন্দেহে নীলস বোরকে বিজয়ী ঘোষণা করে, কিন্তু আইনস্টাইন? এলেন এস্পেক্টের ভাষায় আইনস্টাইন একটি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছিলেন, যা কিনা পরবর্তীকালে এন্ট্যাঙ্গেলমেন্ট সংক্রান্ত গবেষণার দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়। সঠিক প্রশ্ন কি ভাবে দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে পারে EPR প্যারাডক্স তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তাই নীলস বোর জিতলেও আইনস্টাইন হারেন নি!


~কলমে এলেবেলে ঋত্বিক

তথ্যসূত্র:

১. প্রেস রিলিজ : The Nobel Prize in Physics 2022

২. Popular Science Background: The Nobel Prize in Physics 2022

৩. Interview(Youtube): Alain Aspect: “The conclusion is, yes, quantum mechanics resists all possible attacks!”

৪. Interview(Youtube): John Clauser: “What a waste of time, now start doing some real physics!”

৫. Introduction to Quantum Mechanics Paperback by David J. Griffiths

৬. Quantum Computation and Quantum Information:  by Michael A. Nielsen and Isaac L. Chuang

Uddalak Biswas

Senior Research Fellow, Department of Earth Sciences, IIEST, Shibpur, Howrah-711103

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।